নিদ নেই বেগমসাহেবা?
সারাদিন সারারাত অবসর যেখানে, সেখানে ঘুমিয়ে সময় নষ্ট করে লাভ কী! ঘুমোবার জন্যে তো আল্লা রাত পয়দা করেনি। রাত তো ফুর্তি করবার জন্যে। দুনিয়ার মালিক যাদের অটুট যৌবন দিয়েছে, অফুরন্ত অবসর দিয়েছে, তাদের ঘুমোবার দরকার কী! কিন্তু তবু পিরালি খাঁ-কে সমীহ করে চলতে হয় সকলের। কার কখন কী দরকার পড়ে কে বলতে পারে। পিরালিই তো চেহেল্-সুতুনের জাগ্রত আল্লা!
পিরালির যারা শাগরেদ তারা বেগমসাহেবাদের কাছ থেকে মোহর নেয়, টাকা নেয়, তার বদলে তাদের অনেক বেআইনি কাজ করে দেয়। বাইরের লোককে সুড়ঙ্গ দিয়ে লুকিয়ে ভেতরে আনতে হবে, তাতে বেশি কিছু করতে হবে না। বরকত আলি কি নজর মহম্মদের বাঁহাতে একটা কিছু গুঁজে দিলেই চলবে। সঙ্গে সঙ্গে রাত গম্ভীর হয়ে আসবার পরই ঘরের ভেতর এসে হাজির হবে মুর্শিদাবাদের নতুন কোনও উঠতি জওয়ান। সারারাত এ চেহেলসূতুনে কাটিয়ে আবার ভোর হবার আগেই সে নিঃশব্দে সুড়ঙ্গ পথে বাইরে চলে যাবে। হারেমের টিকটিকি আরশোলা কিংবা মাছিটা পর্যন্ত তা টের পাবে না। এখানে যত কড়াকড়ি তত ফসকা গেরো। এখানে বসে যদি কেউ বাইরের জগতের সঙ্গে কারবার করতে চায় তো তাতেও কিছু আটকাবে না। এখানে বসেই বেগমসাহেবারা পূর্ণিয়া থেকে সোরা কিনবে, গন্ধক কিনবে, এখান থেকেই সেই কেনার টাকা যাবে। আবার সেই সোরা সেই গন্ধক কলকাতায় বেভারিজ সাহেবের গদিতে বিক্রি হয়ে যাবে। সেই বিক্রির টাকা আবার যথাস্থান দিয়ে বেগমসাহেবার হাতে এসে পৌঁছোবে। নবাবের বাবারও সাধ্যি নেই তা টের পায়। এখান থেকে টাকা যায় জগৎশেঠজির বাড়িতে সুদে খাটাবার জন্যে, এখান থেকে হিরে-মুক্তো-পান্নার গয়না যায় শেঠবাড়িতে বন্ধক রাখবার জন্যে। সেই বন্ধকি মাল আবার ছাড়ান পেয়ে চলে আসবে সকলের চোখের আড়ালে। জানলে শুধু জানবে পিরালি কি বরকত আলি কিনজর মহম্মদ, কি তাদের মধ্যে কয়েকজন।
কিন্তু সেই পিরালিই যখন আবার নানিবেগমের মহলে আসে তখন সে অন্য মানুষ। তখন তাকে দেখলে আর চেনা যায় না। যদি দেখে নানিবেগম কোরান পড়ছে, সকলকে গিয়ে সাবধান করে দেয়। বলে চিল্লাও মাত, চিল্লাও মাত, চিল্লাচিল্লি কোরো না কেউ
ওমহলের সারেঙ্গির শব্দ এ-মহলে এলে গিয়ে জোর করে থামিয়ে দেয়। বলে আভি বন্ধ কিজিয়ে, বেগমসাহেবা কোরান পড়ছে।
বিধবা হবার পর থেকেই নানিবেগমের যেন কোরান পড়ার হিড়িক পড়ে গেছে। সারাজীবন নবাবের সঙ্গে কাটিয়ে এসে এখন এই বয়েসে চেহেল্-সুতুনের দুরবস্থা দেখে কোনও প্রতিকার করতে পারে না। নিজের মেয়েরা কী করে, কী ভাবে জীবন কাটায় সব জানতে পারে। জেনেও যখন তার কথা কেউ শোনে না, তখন বোধহয় খোদাতালার দরবারে নিজের আর্জি পেশ করে মনটার মধ্যে শান্তি খোঁজে।
পিরালি বুড়ো হয়ে গেছে এসব দেখতে দেখতে। কিন্তু তার কাছে কোরানও যা, মোহরও তাই। তাকে একটা মোহর দাও সে তোমাকে যা চাইবে তাই-ই দেবে। আবার কোরান ছুঁয়েও যদি প্রতিজ্ঞা করে যে তোমার কথা কাউকে বলবেনা, একটা মোহর পেলে আবার সেই কথাই সে পাচার করে দেবে তোমার দুশমনের কাছে।
নানিবেগম বলত–মেহেরুন্নিসার মহলটা দেখছিস তো ভাল করে?
দেখছি বেগমসাহেবা, কড়া নজর রাখছি!
শুধু কড়া নজর রাখা নয়, মির্জার হুকুম ছিল ঘসেটি বেগমের সঙ্গে কেউ যেন মুলাকাত না করে। সে যে-মহলে আছে সেখানে যেন জনপ্রাণীটি না যেতে পারে।
কেউ আসে না তো তার মহলে?
না, বেগমসাহেবা!
দেখিস, নইলে মির্জা বড় গোঁসা করবে।
না বেগমসাহেবা, আমি কোরান ছুঁয়ে বলতে পারি কেউ আসে না সেখানে।
হুঁ, দেখিস, খুব হুঁশিয়ার।
কিন্তু যখন অনেক রাত হয় তখন রাজা রাজবল্লভ কতদিন পিরালির হাতে মোহর গুঁজে দিয়ে ঘসেটি বেগমের ঘরে ঢুকেছে। দিনের পর দিন এক ঘরে বসে এক ডিবেতে পান খেয়েছে, এক গড়গড়ায় তামাকু খেয়েছে, তারপর যখন নেশা হয়েছে এক বিছানায় শুয়ে গড়াগড়ি দিয়েছে। তবু কেউ জানতে পারেনি। মোহরের এমনই মোহ যে পিরালি মহলের দরজায় জেঁকের মতো বসে বসে পাহারা দিয়েছে।
কিন্তু মেহেদি নেসারের কথা আলাদা। তাকে মোহর দিতে হয় না। মেহেদি নেসার চেহেল্-সুতুনে এলেই পিরালি খাঁ সসম্ভ্রমে তাকে আদাব দেয়। বলে-বন্দেগি জনাব
মেহেদি নেসার সেদিন আবার এল। এসেই পিরালিকে ডাকলে।
একটা কাজ করতে পারবে পিরালি?
বান্দা জনাবের কোন কাজ করেনি?
না পিরালি, আগেকার জমানার কথা গুলি মারো, এখন জমানা বদলে গিয়েছে। কেউ যেন জানতে পারে, নানিবেগমও যেন টের না পায়–
বলুন জনাব, কেউ জানতে পারবে না। জান থাকতে বান্দা কাউকে বলবে না, বলেন তো কোরান ছুঁয়ে জবান দিতে পারি
না না, তোমাকে আমি চিনি, কোরান ছুঁতে হবে না, একজন রানিবিবি আসবে চেহেল্-সুতুনে, তোমার কোনও নতুন মহল খালি আছে?
পিরালি বললে–জনাব, ক’টা খালি মহল বলুন না, ক’টা রানিবিবি আনবেন?
ক’টা নয়, একটা। কাফের রানিবিবি
পিরালি বললে–কাফের হোক আর মুসলমান হোক, আমার কাছে জনাব সব বিলকুল সমান–বান্দা তামাম দুনিয়ার নোকর
কোন মহলটা দেবে তাকে?
কেন জনাব, কাশিমবাজার কোঠির মেমসাহেবদের যে-মহলে রেখেছিলাম, সেই মহলে রাখব। ওয়াট মেমসাহেব, কলেট মেমসাহেব সবাই তো ওই মহলেই ছিল জনাব–। মহলটার পেছন দিয়ে গুপ্তি সড়ক আছে, বাইরে যাবার
