কথাটা কানে যেতেই লুৎফুন্নিসা নানিবেগমের কোল থেকে উঠে নিজের মহলের দিকে দৌড়ে পালিয়ে গেল।
ওই মির্জা আসছে, ওকেই আমি চিঠিটা দেখাচ্ছি, তুমি এখন যাও বাবা এখান থেকে যাও তুমি
মেহেদি নেসার আ-ভূমি মাথা ঠেকিয়ে ঠিক আগেকার মতোই কুর্নিশ করতে করতে পেছনে হটে অন্য দিক দিয়ে চলে গেল। চলে গিয়ে যেন বাঁচল সে। হাতিয়াগড়ের বউরানি খত্ লিখেছে? এত বড় বেড়েছে কাফেরের বাঁদি?
*
শুনছেন! শুনছেন!
তখন সকাল হয়ে গেছে বেশ! বদরগঞ্জ পেরিয়ে মিরপুরে এসে ডিহিদারের বজরা থামবে। সেখানেই সব ব্যবস্থা করা আছে। পুরনো সেপাই ছেড়ে দিয়ে নতুন দু’জন সেপাই এসে উঠবে। রানিবিবির দরজা তখনও খোলেনি। দরজায় ঠেলা দিতেও সংকোচ হতে লাগল। রাত্তিরে একফোঁটা ঘুম হয়নি কান্তর। অথচ রানিবিবিকে ডাকতেই হবে। কত দরকার থাকতে পারে। মিরপুরের ঘাটে এখানকার ডিহিদারের লোক খাবারের ব্যবস্থা করবে।
শুনছেন! আমি কান্ত। শুনছেন!
সত্যিই রাত্তিরে বড় ভয় পেয়ে গিয়েছিল কান্ত। ডাকাতি হয় বদরগঞ্জে এটা জানা কথা। বদরগঞ্জে অনেকবার অনেক বজরা লুঠপাট করে নিয়েছে তারা। আলোটা কাছে আসতেই সেপাই দুটো বন্দুক তাক করে রেখেছিল। নৌকোটা কাছে আসতেই সেদিকের মাঝিরা হাঁক দিলে-কার বজরা?
কান্তদের বুড়ো মাঝি হাঁক দিলে ডিহিদারের তোমরা?
হাতিয়াগড় সরকার।
কথা বলতে বলতেই নৌকোটা তিরের গতিতে এগিয়ে চলে গেল। আটজন মাঝি প্রাণপণে বজরা নিয়ে দাঁড় ফেলতে ফেলতে যাচ্ছে! যাক, তখন যেন একটু হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল কান্ত। কিন্তু হাতিয়াগড়ের জমিদার যদি জানতে পারতেন, এবজরাতেই তার রানিবিবি আছে।
শুনছেন! শুনছেন!
মাঝিটা বললে–হুই মিরপুরের বাঁধাঘাট দেখা যাচ্ছে–হুই যে
এতক্ষণে দরজাটা খোলবার একটা শব্দ হল–খুট!
দরজার সামান্য একটু ফঁক দিয়ে দেখা গেল সেই শাড়িটা। রাত্রের সেই জরিপাড় জাহাঙ্গিরাবাদের শাড়ির আঁচলটা।
কান্ত সেই আড়াল থেকে দাঁড়িয়েই বললে–আমরা মিরপুরে এসে গেছি, এখানে আমরা নৌকো বাঁধব। আপনার জলটল কিছু দরকার থাকলে আমাকে বলতে পারেন। আমি নিজে হিন্দু, আপনার কিছু ভয় করবার নেই–আমার নাম কান্ত সরকার
.
আর ওদিকে হাতিয়াগড়ের রাজবাড়িতে তখন সবে ভোর হয়েছে। বড় বউরানির দরজায় টোকা পড়তেই বড় বউরানি উঠে পড়েছেন।
একী, তুমি? তুমি কখন এলে?
এই তো এখন! মহারাজকে সব বলে এলাম। আর কোনও ভাবনা নেই। মহারাজ এবার নিজে এর সমস্ত ভার নিলেন। আমাকে বললেন–আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন রায়মশায়, মিরজাফর যখন আমাদের দলে আছে, তখন আমি এর একটা বিহিত করবই
তবু বড় বউরানি কোনও কথা বললেন না।
মহারাজ আজই মহিমাপুরে গিয়ে জগৎশেঠের সঙ্গে দেখা করবেন বললেন, তারপর সেখান থেকে কালীঘাটে পুজো দেবার নাম করে হলওয়েল সাহেবের সঙ্গে দেখা করবেন, উমিচাঁদের সঙ্গে দেখা করবেন, ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে একটা পাকা বন্দোবস্ত করে আর ফিরবেন না আমাকে কথা দিলেন।
তারপর বড় বউরানির মুখের দিকে চেয়ে বললেন–কী, তুমি কিছু কথা বলছ না যে?
বড় বউরানি তবু কিছু কথা বললেন না।
কী হল তোমার, শরীর খারাপ? না, আমার কথায় বিশ্বাস হচ্ছে না! কথা বলো, অমন চুপ করে রইলে কেন? ছোটবউ কোথায়? ছোটবউ কেমন আছে? আমি তো মহারাজের সঙ্গে মহিমাপুরেই যাচ্ছিলুম, কিন্তু তোমাদের একা ফেলে গেছি ভেবে তাড়াতাড়ি চলে এলুম। ডিহিদারের লোক আর এসেছিল নাকি?
এতক্ষণে বড় বউরানির মুখ দিয়ে কথা বেরুল। বললে–হ্যাঁ!
তারপর? কী বলে গেল? কোনও হিন্দু এসেছিল সঙ্গে? তুমি কী বললে?
বড় বউরানি যেন পাথর হয়ে গেছে। পাথরের মতো শুকনো গলায় বললে–আমি ছোটবউকে খুন করে ফেলেছি।
চেহেল্-সুতুনের ভেতর রাত্রির যে-চেহারা, হাতিয়াগড়ের রাজবাড়ির রাতের চেহারা সেরকম নয়। মুর্শিদাবাদের হারেমে যখন রাত তখন বাংলাদেশের সমস্ত ষড়যন্ত্র সেখানে সজাগ হয়ে ওঠে। জাহাঙ্গিরাবাদ থেকে যেদিন মুর্শিদকুলি খাঁ মুর্শিদাবাদে এসে রাজধানী বসালেন সেইদিন থেকেই সেখানে দিন রাত একাকার হয়ে গেল। ভোরবেলা যখন ইনসাফ মিঞা নহবতে ভৈরোর তান ধরে, তার অনেক আগে থেকেই সকলে জেগে ওঠে। কবর থেকে উঠে আসে নবাববাদশাদের কঙ্কাল। তারা একে একে এসে আবার এখানে পদচারণা শুরু করে। এ-মহল থেকে ও-মহলে যায়। তারপর আর-এক মহলে। এক একটা দৃশ্য দেখে আর মুখ ফিরিয়ে নেয় আতঙ্কে। বহু যুগ আগে মোগলদের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে আমরা যা-কিছু শুরু করেছিলাম, এখনও ঠিক তাই। মদের গেলাস মেঝের ওপর গড়াগড়ি চলেছে আর তারই পাশে নেশায় অসাড় হয়ে পড়ে আছে পেশমন বেগম। তার গায়ের ওড়নি আর কোমরের ঘাগরা বেসামাল। আলো নিভোতে ভুলে গেছে তার ইরানি বাঁদি।
হঠাৎ স্বপ্নের ঘোরেই কেউ বা হেসে ওঠে খিলখিল করে। কেউ বা আবার কেঁদে ওঠে। হাসিকান্নার পান্না-মুক্তোর ঝলসানি লেগে ছাদের ঝাড়লণ্ঠনগুলো পর্যন্ত যেন লজ্জা পায়। খোজা সর্দার পিরালি এক-একদিন নিজেই তদারক করতে বেরোয়। কার ঘরে কে ঢুকেছে, কে জেগে আছে, কে ঘুমায়নি, কে হাসছে, কে কাঁদছে, সব দেখে বেড়ায়। কারও ঘাগরাটা পরিয়ে দিয়ে বলে। বেগমসাহেবা, রাত হয়েছে, দরওয়াজা বন্ধ করে দিন
আবার কারও ঘরে যেতেই সেতারের তার ছিঁড়ে বাজনা বন্ধ হয়ে যায়।
