জিজ্ঞেস করো মেহেদি নেসার সাহেবকে, কী দরকার।
পিরালি বলে–বেগমসাহেবা জিজ্ঞেস করছেন আপনার কী দরকার–
মেহেদি নেসার মাথা নিচু করে বলে বলল, দরকার আমার কিছু নেই, শুধু রোজার দিনে বেগমসাহেবার দোয়া নিতে এলাম। বেগমসাহেবার দোয়া না পেলে তো আমি রোজা ভাঙতে পারি না–
তারপর সেই নানিবেগমের দোয়া পাবার পর মেহেদি নেসার সেই মেঝের শ্বেত পাথরের ওপরেই নিজের নাক চুঁইয়ে কুর্নিশ করতে করতে চলে যায়।
এক-একদিন নানিবেগম বলত–মির্জাকে তোমরা একটু শোধরাতে পারো না বাবা, দিনরাত এত মদ খেলে তবিয়ত টিকবে কী করে, দেমাক যে বরবাদ হয়ে যাবে। বয়েস তো বেশি নয়–
মেহেদি নেসার বলত–না বেগমসাহেবা, আমরা তো বোঝাই তাই ওকে! আমরা তো বলি এখন আপনি মুর্শিদাবাদের নবাব জাঁহাপনা, এখন কি আর আগের মতো ছেলেমানুষি করা পোয়! আমরা তো ওকে বারবার সেই কথাই বলি
আমার ওই একটি নাতি বাবা, তোমরা ওর ইয়ার, তোমরা যদি ওকে না দেখো তো কে দেখবে? আমার সঙ্গে তো দেখাই হয় না মির্জার, আমার কথা শোনেই না, তোমাদের সঙ্গে মেশে, তোমাদের কথা শুনেই ও চলে। তোমরা একটু সৎ পরামর্শ দিয়ে বাবা ওকে–
তাই তো দিই বেগমসাহেবা! আমরা ওকে কোরান পড়তে বলি–ও তো নানার সামনে বাত দিয়েছিল সরাব আর খাবে না, সরাব তো আর ছোয়ও না ও। আমরা বলেছি ওকে–কোরান পড়লে দেমাক ঠিক হয়ে যাবে। এই দেখুন না বেগমসাহেবা, আমার কাছেই তো কোরান রয়েছে।
বলে নিজের জোব্বার জেব থেকে কোরানটা বার করে দেখালে। বললে–এই আজকেও ওকে কোরান পড়িয়েছি বেগমসাহেবা, এই জায়গাটা অনেক বার করে পড়িয়েছি–লা এলাহি এল আল্লা মহম্মদ রসুল আল্লা…
তারপর যাবার সময় বলত–তা হলে বান্দা এবার আসছে বেগমসাহেবা—
আচ্ছা, যাও বাবা তুমি, যাও ।
এমনি করেই মেহেদি নেসার এখানে বহুদিন এসেছে, বহুবার বেগমসাহেবার দোয়া নিয়ে চলে গেছে। এবার শেষ রাত্রের দিকে হঠাৎ ডাক পেয়ে মেহেদি নেসার সত্যিই তাজ্জব হয়ে গিয়েছিল। এমন অসময়ে তো নানিবেগম কখনও মেহেদি নেসারকে এত্তেলা দেয় না।
আমাকে ডেকেছিলেন বেগমসাহেবা?
নানিবেগম ভেতর থেকে উত্তর দিলে হ্যাঁ, শুনছি আবার নাকি কোন জমিদারের বউকে মতিঝিলে আনবার ব্যবস্থা করেছ তোমরা?
মেহেদি নেসার বাইরে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল।
শুনছি, আমাদের হাতিয়াগড় সরকারের জমিদারের দোসরা তরফের রানিবিবিকে আনবার জন্যে এখান থেকে ডিহিদারকে পরওয়ানা পাঠাতে বলা হয়েছে। নাকি লোকও চলে গেছে আনতে? এটা কি সত্যি? জবাব দিচ্ছ না কেন, উত্তর দাও
সেকী? হাতিয়াগড়ের রানিবিবি?
হ্যাঁ! তাকে এনে তোমরা আমার নাতির মাথা খাবে বলে মতলব করেছ! একজন হিন্দুকে পাঠিয়েছ তাকে আনতে! মির্জার মন ভোলাবার জন্যে তোমরা সবাই মিলে পরামর্শ করে এই কাজ করেছ! ভেবো না আমি হারেমের ভেতরে থাকি বলে আমার কানে কোনও খবর পৌঁছোয় না। তোমরা তার ইয়ার হয়ে কোথায় সৎ পরামর্শ দেবে, না এইসব করে নবাববংশ ছারখার করে দিতে চাও? তোমরা কি চাও মুর্শিদাবাদের গদি আবার অন্য কারও হাতে চলে যাক? আমি তার নানি, আমি বেঁচে থাকতে থাকতেই তোমরা আমার এই সর্বনাশ করে যাবে?
মেহেদি নেসারকে এবার বড় শক্ত পালা অভিনয় করতে হল।
বললে–আমি আপনার বান্দা বেগমসাহেবা, এসব আপনি কী বলছেন আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না! হাতিয়াগড়ের রানিবিবিকে আনব আমি?
তুমি নয়, তোমার দলবল! ও একই কথা! এমনি করে একদিন সরফরাজের নবাবি গিয়েছে, আমার নাতির নবাবিও তোমরা এমনি করে খোয়াতে চাও? চারদিকে যখন সবাই আমার নাতির বিরুদ্ধে, তখন তোমরাও আমার নাতিকে পথে বসাবে? আর আমাকে বেঁচে থেকে সেই সর্বনাশ দেখে যেতে হবে এই-ই তোমরা চাও!
মেহেদি নেসার হঠাৎ কোরান ছুঁয়ে বললে–এই কোরান ছুঁয়ে বলছি বেগমসাহেবা, আমি এর কিছুই জানি না। আমি আপনাদের নিমক খেয়ে আপনাদেরই নিমকহারামি করব, এ কখনও হতে পারে?
তা হলে আমি যা শুনেছি, সব মিথ্যে!
ডাহা মিথ্যে কথা বেগমসাহেবা! জলজ্যান্ত মিথ্যে কথা! কে এসব আপনাকে বলেছে? আমাদের তো দুশমন আছে চারদিকে, তারাই হয়তো আপনাকে এইসব বলে গিয়েছে।
নানিবেগম বললে–না, আমার কাছে খত আছে, আমার কাছে চিঠি আছে, তাতেই সব লেখা আছে—
কার চিঠি? কে লিখেছে বেগমসাহেবা? নাম কী তার?
হাতিয়াগড়ের বড়রানি! বেচারা কোনও উপায় না পেয়ে আমাকে চিঠি দিয়েছে।
দেখি বেগমসাহেবা, চিঠিখানা দেখি। চিঠিখানা জাল কিনা দেখি!
না, এ-চিঠি তোমরা পাবে না। এ যদি সত্যি হয় তো সেদিন তোমাকে এর জবাবদিহি করতে হবে মনে রেখো। একদিন এমনি করে ওই পেশমন বেগমকে এনেছ এখানে, গুলসন বেগমকে এনেছ, তক্কি বেগমকে এনেছ, নুর বেগম, জিন্নত বেগম, আরও একগাদা বেগমকে এনেছ আবার আর একটা বেগমকে আনতে চাও? আবার আর একজনের সর্বনাশ করতে চাও? এততেও তোমাদের আশ মেটেনি? আমার মির্জাকে না খুন করে কি…
মেহেদি নেসার বললে–নবাবদের তো বেগম থাকেই বেগমসাহেবা, সে তো নতুন কিছু নয়। নবাব সরফরাজ খাঁর পনেরোশো বেগম ছিল কিন্তু আমাদের কেন দায়ী করছেন তার জন্যে বেগমসাহেবা!
হঠাৎ কথা শেষ হবার আগেই দূর থেকে খোজা বরকত আলির ঘোষণা শোনা গেল–নবাব মনসুর-উল-মুস্ক শা কুলি খান বাহাদুর মির্জা মহম্মদ সিরাজ-উ-দ্দৌলা হেবৎ জঙ আলমগির-র-র-র-র…
