কান্ত মাঝির নির্দেশ লক্ষ করে দূরের দিকে চেয়ে দেখলে। অনেক অনেক দূরে অন্ধকারের বুক চিরে যেন একটা আলোর বিন্দুর মতো কী দেখা গেল। একেবারে নদীর বুক বরাবর। আলোটা যেন ক্রমেই স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে।
সেপাই দুটো তখনও ঘুমোচ্ছে।
কান্ত বললে–ওদের ডেকে দেব? ওদের কাছে বন্দুক আছে
কিন্তু ডাকতে হল না। তারা নিজের থেকেই উঠে পড়ল। এ যেন তারা জানত। বদরগঞ্জে অনেকবার ডাকাতি হয়েছে। অনেকবার ডাকাতদের সঙ্গে তাদের মুখোমুখি সওয়াল করতে হয়েছে। তারা উঠেই বন্দুক তাগ করে তৈরি হয়ে রইল। ঈড় ফেলার ঝপঝপ শব্দ ক্রমেই আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠছে। যেন তাড়াতাড়ি ঝড়ের গতিতে কাছে এগিয়ে আসতে চাইছে।
কান্তর কেমন ভয় করতে লাগল। যদি সত্যিই ডাকাত পড়ে, তা হলে রানিবিবির কী হবে! রানিবিবি হয়তো কিছুই টের পাচ্ছে না, অঘোরে ঘুমোচ্ছে!
কান্ত ছইয়ের দরজার কাছে গিয়ে ডাকতে লাগল–শুনছেন–
ভেতর থেকে কোনও সাড়াশব্দ এল না। হয়তো শুনতে পায়নি। দরজা-জানালা সব বন্ধ করে দিয়ে ভেতরে একলা রয়েছে।
কান্ত এবার দরজায় টোকা দিতে লাগল–শুনছেন–শুনছেন–আমি কান্ত-শুনছেন—
*
মুর্শিদাবাদে তখনও মতিঝিল থেকে মির্জা ফেরেনি। রাত শেষ হয়ে আসছে। চেহেল্-সুতুনের অন্দরমহলে সব আলো নিভে গেছে। কিন্তু নানিবেগমের ঘরে তখনও একটা আলো জ্বলছে টিমটিম করে।
বাইরে থেকে ডাক এল–বেগমসাহেবা
সন্ধে থেকেই নানিবেগমের খারাপ লাগছিল। লুৎফাও ঘুমোতে পারে না, নানিবেগমও ঘুমোতে পারে না। চেহেল্-সুতুনের ভেতরে একবার এলে ঘুম না-হওয়া যেন রোগে দাঁড়ায়। ছোট্ট রোগা রোগা মেয়েটা। তার দিকে চাইলেই নানিবেগমের বুকটা হুহু করে ওঠে। এমন বউ যেন এখানে মানায় না। নানিবেগম বউকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে মাঝে মাঝে। যখনই সব পুরনো কথা মনে পড়ে যায়, তখন আর কাউকে ভাল লাগে না। নিজের পেটের মেয়েরাও তখন যেন বিষ হয়ে ওঠে নানিবেগমের চোখে। মেয়ে নয়তো, সব কাটা। এক-একটা কাটা হয়ে সব নানিবেগমের বুকে ফুটে আছে। তোরা সব মানুষ না কী? তোদের মান-ইজ্জৎ-সম্মান-মর্যাদা কিছু নেই? তবুনানিবেগমের যদি নিজের ছেলে থাকত তো আজ ভাবনা! সারা জীবনটাই তো নানিবেগমের কেটে গেছে আলিবর্দি সাহেবের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে। একটা দিনের জন্যে নানিবেগম মনে শান্তি পায়নি। চেহেল্-সুতুনের মধ্যে রাতের পর রাত কেটে যায় সেই সব পুরনো কথা ভাবতে ভাবতে। পাশে কেউ বিশেষ থাকে না। শুধু লুৎফা কাছে আসে। কাছে। এসে বসে আর কাঁদে।
নানিবেগম বলে-তুই কেন কাঁদিস মা, কেন আমার পেছন পেছন ঘুরিস?
মেয়েটা কথাও বলে না বেশি, কথা বললেই যেন সে কেঁদে ভাসিয়ে দেবে। এখানেই একদিন নাচতে এসেছিল এই মেয়ে এই মুর্শিদাবাদে। সেই মেয়ে যে তার নাতবউ হবে তা-ই বা কে ভেবেছিল।
নানি বলত–দেখলি তো এখন নবাবি হারেমে কত সুখ! আমারও এক এক সময় মনে হয় মা, বোধহয় মুর্শিদাবাদের গরিব প্রজার ঘরে জন্মালে এর চেয়ে অনেক সুখ পেতাম
লুৎফা সব শোনে। শুনতে শুনতে মাঝে মাঝে নানির বুকে মাথা গুঁজে হাউহাউ করে কেঁদে ওঠে।
হারেমের ওপাশে যখন সারেঙ্গি বাজে, ঘুঙুর বাজে, সরাবের হা চলে, পেশমন বেগম, দুলহান বেগম, বব্বু বেগম সবাই মিলে যখন পাশা খেলে ঘুটি খেলে রাত কাবার করে দেয়, তখন নানিবেগমের ঘরের ভেতরে দুটি প্রাণী শুধু প্রহর গোনে। কখন মির্জা আসবে তার তো ঠিক নেই। গদিতে বসবার পর থেকেই ইয়ারবকশিরা নাতিকে আরও ঘিরে রেখে দিয়েছে। নানিবেগমের সঙ্গে দেখা করবারই সময় হয় না তার। একবার যদিই বা আসে, একটুখানির জন্যে এসেই আবার চলে যায়। বলে আমি আবার আসব নানি
কিন্তু, কী নিয়ে আবার এত ব্যস্ত তুই? তুই কি একদণ্ড শান্তিতে ঘুমোতে পারবিনে?
মির্জা বলে কিন্তু সবাই মিলে যে আমার দুশমনি করছে নানি, আমি কী করব?
তা তোর নানার কি দুশমন ছিল না? তোর নানা আমার সঙ্গে দেখা করবার ফুরসুত পেত কী করে?
মির্জা বলত–সে জমানা আর নেই নানি, তোমার মেয়েরাই আমার সবচেয়ে বড় দুশমন! নিজের ঘরের মধ্যে যার দুশমন, তার শান্তি কী করে হবে? আমার যে ঘরে-বাইরে দুশমন!
কথা বলে আর দাঁড়াত না মির্জা। আবার কোথায় বেরিয়ে চলে যেত।
আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লুৎফা সব শুনত। এক ফোঁটা মেয়েটা পাতলা লিকলিকে চেহারা, তাকে দেখতে পেয়েই নানিবেগম বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরত। কিছু ভাবিসনে মা, নবাবের বিবি হলে সুখ হতে নেই। নবাবের বেগমদের ওপর খোদাতালার অভিশাপ আছে। সাজাহানাবাদের বেগমদেরও সুখ হয়নি জীবনে। আকবর বাদশা, জাহাঙ্গির বাদশা, শাহজাহান বাদশা, ঔরঙ্গজেব বাদশা–সকলের বেগমেই কেঁদে কেঁদে কাটাতে হয়েছে
বেগমসাহেবা!
বাঁদি এসে বললে–মেহেদি নেসার সাহেব সেলাম ভেজিয়েছেন
ডাক এখেনে, ডেকে আন।
মেহেদি নেসারকে আজ ডেকে পাঠিয়েছিল নানিবেগম। ডেকে না পাঠালেও মেহেদি নেসার সাহেব নানিবেগমকে সেলাম জানিয়ে যায় মাঝে মাঝে। নবাবের নানি, তাকে হাতে রাখা ভাল। এসে বলে বন্দেগি বেগমসাহেবা
এসব বিনয়ের ব্যাপারে মেহেদি নেসারের আবার জুড়ি নেই। কোনও কাজ থাকলেও মেহেদি নেসার আসে, আবার না থাকলেও আসে। এসে বলে গোস্তাকি মাফি হয় বেগমসাহেবা। আমি বেগমসাহেবার খিদমদগার। বান্দাকে একটু দোয়া করবেন হুজুরাইন। নানান ভাষায়, নানান কায়দায় সেলাম জানাতে মেহেদি নেসার ওস্তাদ! ঘরের ভেতরে রদার আড়ালে নানিবেগম থাকে আর বাইরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে কথা বলে। মাঝখানে দরওয়াজার মধ্যে থাকে নানিবেগমের খাস বাঁদি আর খোজা সর্দার পিরালি খাঁ। দু’তরফের কথা সেই বলে শোনায়।
