কান্ত বলেছিল–তা মানবে কেন? তোমাকে তো আর ভুগতে হয়নি আমার মতো! আমার মতো কষ্ট পেলে তুমিও কপাল মানতে
রানিবিবি বলেছিল–কিন্তু মনে কষ্ট পুষে রেখে মুখে হাসি ফোঁটানো যে কত শক্ত তা যদি তুমি জানতে গো!
কান্ত তখন সাহস পেয়ে আরও কাছে ঘেঁষে বসেছিল। বলেছিল–সত্যি? তোমারও কষ্ট হয়? সত্যি বলল না, তোমারও কষ্ট হয় তা হলে আমার মতো?
রানিবিবি এবার যেন একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিল। বলেছিল–না বাপু, তুমি একটু সরে বোসো, আমার ভয় করে, অত বাড়াবাড়ি ভাল নয়, শেষকালে তুমি দেখছি আমার গা ছুঁয়ে ফেলবে
ছুঁয়ে ফেললেই বা, তাতে কি খুব অন্যায় হবে?
রানিবিবি রেগে গিয়েছিল। বলেছিল–আবার ওইসব কথা? আমি বলেছি না ওসব কথা বললে–আর তোমাকে আমার কাছেই আসতে হবে না–
আচ্ছা আচ্ছা, এই আমি সরে বসলুম! কিন্তু আমি যে কিছুতেই ভুলতে পারি না।
কী ভুলতে পারো না?
কান্ত বলেছিল–সেদিনের সেই তোমাকে বজরায় করে নিয়ে আসার মুখে তোমার সেই শাড়ির পাড় আটকে যাওয়া, আর সেই তোমার শাড়িটা খুলে দিতে গিয়ে তোমার সেই পা…
আবার?
বলে রানিবিবি খপ করে কান্তর মুখখানা নিজের নরম হাত দিয়ে চাপা দিয়ে দিয়েছে।
রেগে গিয়ে বললে–বলেছি না, ওসব আমার শুনতে ভাল লাগে না, ওসব কথা আমাকে বলতে নেই, ওসব কথা আমার শোনাও পাপ
কিন্তু কান্ত যেন তখন নিজের শরীরের মধ্যেই হঠাৎ নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। রানিবিবি তার মুখটা ছেড়ে দেওয়ার পরও যেন অনেকক্ষণ অভিভূত হয়ে পড়েছিল। তারপর একটু জ্ঞান ফিরে পেয়েই বলেছিল–এই তো তুমি আমার গা ছুঁলে মরালী, আর আমি তোমাকে ছুঁলেই যত দোষ? আমি ছুঁলেই তুমি অশুদ্ধ হয়ে যাবে?
তা তুমি এই সহজ কথাটাও কেন বোঝে না যে আমার সিঁথিতে সিঁদুর রয়েছে, আমি পরের বউ?
তা এই এখানেও কি তুমি পরের বউ? এই নবাবের হারেমের মধ্যে? এই মদ, জুয়া, জাল, জোচ্চুরি, রেষারেষি আর বেলেল্লাগিরির মধ্যেও তুমি কি মনে করো তুমি পরের বউ হয়ে নিজেকে বাঁচাতে পারছ?
খবরদার বলছি, মুখ সামলে কথা বলো!
কান্ত আর পারেনি। চিৎকার করে বলে ফেলেছিল কিন্তু সেই-ই যদি বাসরঘর ছেড়ে পালালে তো আর একটু আগে পালাতে পারলে না তুমি? সম্প্রদান হবার আগে পালাতে পারলে না? লগ্ন বয়ে গেলে কি এর চেয়েও বেশি সর্বনাশ হত? তা হলে কি তোমাকেই আজ সিথির সিঁদুর নিয়ে এই পাপপুরীর মধ্যে আসতে হত, না ভদ্রঘরের ছেলে হয়ে আমাকেই এই নবাবের চরের কাজ করে টাকা রোজগার করতে হত, বলো?
কথাটা যে কত চেঁচিয়ে বলেছিল কান্ত তা তার খেয়াল ছিল না। হারেমের দেয়ালের ইটগুলোরও যে এক একটা করে কান আছে, তাই বোধহয় ভুলে গিয়েছিল সে। নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ থেকে শুরু করে। নবাব আলিবর্দি খাঁ পর্যন্ত যত খুন, যত অত্যাচার, যত পাপ, যত কলঙ্ক জমা হয়ে ছিল মাটির তলায়, সেই সমস্ত দিয়েই যেন ইট তৈরি করে, সেই ইট দিয়ে গেঁথে গেঁথে তৈরি হয়েছিল এই চেহেল্-সুতুন। প্রত্যেকটা অলিন্দে অলিন্দে, প্রত্যেকটা কোটরে কোটরে, প্রত্যেকটা প্রকোষ্ঠে প্রকোষ্ঠে, প্রত্যেকটা গবাক্ষে গবাক্ষে কান্তর সেদিনকার হাহাকার যেন প্রতিধ্বনিত হয়ে বারবার নিজের ভাগ্যের রাজয়ের
প্রতিশোধ নিজের হাতেই নিতে চেয়েছিল। আর শব্দটা কানে যেতেই ওদিক থেকে দৌড়ে এসেছিল পিরালি খাঁ। পিরালি খাঁ খোজা সর্দার। ঘরের ভেতরে ঢুকেই…
কিন্তু সে কথা এখন থাক। পরের কথা পরে বলাই তো ভাল।
.
সেই অন্ধকারে দক্ষিণের হাওয়ায় বজরায় পাল তুলে দিয়ে তখন মাঝিমাল্লারাও তন্দ্রায় ঢুলছে। মাথার ওপর চিরকালের একঘেয়ে আকাশটা রোজকার মতো তারাফুল ফুটিয়ে নির্জীব নিঃসাড় হয়ে আছে। সেপাই দুটো বন্দুক নিয়ে সামনেই ঘুমে অজ্ঞান অচৈতন্য। ছই-ঢাকা ঘরটার মধ্যে রানিবিবিও হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। কে জানে! হয়তো কেন, নিশ্চয়ই ঘুমোচ্ছে। সেদিক থেকে কোনও সাড়াশব্দ নেই একটুকু! শুধু কান্ত একলা আকাশ-পাতাল তোলপাড় করে বেড়াচ্ছে। সেইখানে সেই বজরার গলুইতে হেলান দিয়ে বসে বসে নিজের সমস্তটা জীবন পরিক্রমা করছে বারবার। এ কেমন চাকরি তার। এ কেমন পেশা! কাকে ধরে নিয়ে চলেছে সে! কার সম্পত্তি কার হাতে তুলে দেবে। কেন তুলে দেবে? ছটা টাকার জন্যে? ছটা টাকার এত দাম? ছ’টা টাকার দাম দিয়ে সে আর একজন পুরুষের শান্তি হরণ করবে? আর একজনের অভিশাপ বরণ করবে? আর একজনের সর্বনাশ করে সে তার নিজের খোরাকি রোজগার করবে? কত কথা তার মনে পড়েছিল সেদিন। এক-একবার কল্পনা করতেও ইচ্ছে হচ্ছিল রানিবিবির মুখখানা। জাহাঙ্গিরাবাদের জরি-পাড় শাড়ির ঘোমটা দিয়ে ঢাকা ছিল সর্বাঙ্গ। শুধু দৈবাৎ একটা পায়ের একটুখানি অংশ নজরে পড়েছিল। তাও এক মুহূর্তের জন্যে। কিন্তু মনে পড়তেই ভাবনাটা মন থেকে দূর করে দিয়েছিল। এ অন্যায়, এ পাপ! রানিবিবির কথা ভাবাও পাপ। চাকরির জন্যে এ-পাপের যতটুকু অংশীদার হবার দায় তার, তার বেশি দায়িত্ব তার নেই। তার চেয়ে যেন বেশি সে কিছু না ভাবে। মুর্শিদাবাদের নবাবের যা সাজে, কান্তর তা সাজে না।
বাবুজি, হুশিয়ার!
চমকে উঠেছে কান্ত! বুড়ো মাঝিটা এতক্ষণ ঢুলছিল। এবার বুঝি সজাগ হয়েছে। কেন? হুঁশিয়ার কেন?
বাবুজি, দাঁড়ের ঝপঝপ আওয়াজ শুনতে পাচ্ছেন না! বদরগঞ্জের কাছে এসেছি, এটা ডাকাতের আচ্ছা!
