অন্ধকারের সুড়ঙ্গ বেয়ে দুটো আলতা-পরা পা আর জাহাঙ্গিরাবাদের জরি-পাড় শাড়ি দিয়ে মোড়া একটি যৌবন পালকির ভেতরে এসে ঢুকল আর পালকির দরজার দুটো পাল্লা সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল। অন্ধকারের সুড়ঙ্গ বেয়েই আবার সে-যৌবন বেহারাদের কাঁধে চড়ে নিঃশব্দে এগিয়ে চলল আর এক অন্ধকার সুড়ঙ্গের দিকে। সে-সুড়ঙ্গে পাপ-পুণ্য, ন্যায়-অন্যায়, ধর্ম-অধর্ম সব একাকার হয়ে গেছে। সে সুড়ঙ্গের ভেতরে ষড়যন্ত্র আর ষড়যন্ত্রণা নিঃশব্দ আর্তনাদ করে মাথা কুটে মরলেও কেউ প্রতিকার করবার নেই। সেখানেই তার ভূমি-সমাধি হয়ে যাবে চিরকালের মতো। তাকে আর কেউ চিনবে না, জানবে না। বাইরের পৃথিবীতে তার নাম-ধামকুল-গোত্র-পরিচয় চিরকালের মতো মুছে গিয়ে নিঃশেষ হয়ে যাবে।
অন্ধকারে কেউ সেদিন শাঁখও বাজাল না, উলুও দিল না। একদিন যে এ-বাড়িতে বধূ হয়ে এসেছিল, অনেক আচার-অনুষ্ঠানের অনেক মাঙ্গলিক-মন্ত্রের অনুশাসন পালন করে, সে-ই আবার আজ নিঃশব্দে গোপনে সিংদরজা পেরিয়ে উলটোপথে বাড়ির বাইরে চলে গেল। তাকে বার করে দিয়েই, তাকে দূরে তাড়িয়ে দিয়েই যেন এই হাতিয়াগড়ের রাজবাড়ির পবিত্রতা সুনাম সম্মান বেঁচে গেল। তার ছোঁয়াচ থেকে এবাড়ির প্রত্যেকটা পাথর, প্রত্যেকটা ইট, প্রত্যেকটা প্রাণী যেন নিরুপদ্রব হল।
সেদিন সেই রাত্রের পঞ্চম প্রহরে কোথায় কোন গাছের কোটর থেকে একটা তক্ষক হঠাৎ কর্কশ স্বরে ডেকে রাত্রির স্তব্ধতাকে ভেঙেচুরে খানখান করে দিলে। আর সে-ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল শুধু বুঝি সেই নিস্তব্ধ রাত্রির একটা তক্ষক। আর কেউ নয়। আর যদি কেউ কিছু শুনে থাকো, কিছু দেখে থাকো, কিছু বুঝে থাকো তো সমস্ত ভুলে যাও। এ-ঘটনা যদি কখনও তোমার মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয় তো সেদিন বুঝবে, তোমারও চরম সর্বনাশ। সেদিন তোমাকেও এ-পৃথিবী থেকে সেই অবধারিত সুড়ঙ্গের অন্ধকারে নির্বাসনদণ্ড ভোগ করতে হবে। তুমিও এই আজকের রানিবিবির মতো নাম-ধাম-গোত্র পরিচয়হীন হয়ে মুর্শিদাবাদের হারেমের মধ্যে নিঃশেষ হয়ে যাবে!
হঠাৎ যেন একটা শব্দে কান্ত চমকে উঠল।
চুপ করে খাড়া রইলে কেন বাবুজি, চলো, চলো
সেপাই দুটোর কথায় যেন এতক্ষণে ঘুম ভাঙল কান্তর। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই যেন এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল সে৷ তারপর স্বপ্নের ঘোরেই আবার সকলের পেছন পেছন চলতে লাগল। যেখানে বর্তমান মুহূর্ত ইহকালে গিয়ে মিশেছে, যেখানে আজকের বাস্তবতা আগামীকালের ইতিহাস হয়ে উঠেছে, সেইদিকে লক্ষ করেই যেন চলতে লাগল কান্ত। সেই বুড়োশিবের মন্দির পেরিয়ে ছোটমশাইয়ের তরকারির খেত, তার পাশ দিয়েই রাস্তা। সেই রাস্তা পেরিয়েই ছাতিমতলার ঢিবি। তারপর জায়গাটা ঢালু হয়ে নেমে গেছে সোজা একেবারে নদীর ঘাটে। সেখানে ডিহিদারের বজরা দাঁড়িয়ে আছে। বজরার পাল খাঁটিয়ে মাঝিমাল্লারা তৈরি। রানিবিবি বজরায় উঠলেই তারা বদর-বদর বলে কাছি খুলে দেবে। আর ইতিহাসের পাখায় ভর করে হাতিয়াগড়ের যৌবন নিরুদ্দেশের দিকে উধাও হয়ে যাবে
একটু দাঁড়ান, শাড়িটা আটকে গেছে। ঘাট থেকে বজরায় ঠিকই উঠেছিল রানিবিবি। কিন্তু বজরায় উঠে ছই-ঢাকা ঘরের মধ্যে ঢুকতে গিয়েই জাহাঙ্গিরাবাদের শাড়ির জরির পাড়টা আটকে গেছে ছইয়ের বাঁশের খোঁচায়।
কান্ত তাড়াতাড়ি নিচু হয়ে শাড়িটা খুলে দিলে। সেই অন্ধকারেও নজরে পড়ল সুগোল একটা টুকটুকে ফরসা পায়ের গোছ, আর সেই পায়ের পাতারই চারপাশ ঘিরে টাটকা আলতার রেখা।
রানিবিবি বোধহয় একটু লজ্জায় পড়ে গিয়েছিল। লজ্জায় মাথার ঘোমটাটা আর একটু টেনে দিয়ে ভেতরে গিয়ে ঢুকে পড়ল। তারপর বজরা ছেড়ে দিলে।
এ-ঘটনার অনেকদিন পরে কান্ত যখন রানিবিবির জীবনের সঙ্গে ষড়যন্ত্রের জালে আরও জড়িয়ে গিয়েছিল, তখন একদিন বলেছিল–জানো, সেদিন তোমার পা দেখে আমার খুব ভাল লেগেছিল
আমার পা?
কথাটা শুনে রানিবিবি প্রথমটায় অবাক হয়ে গিয়েছিল।
হ্যাঁ, তোমার পা। তোমার শাড়ির জরির পাড়টা বাঁশের খোঁচায় আটকে যেতেই আমি ধরে ফেলেছিলাম, নইলে দামি শাড়িটা সেদিন ছিঁড়ে যেত–
রানিবিবি বলেছিল–কিন্তু পা কখন দেখলে তুমি?
তখনই তো। তোমার শাড়িটা আটকে যেতেই খানিকটা পা বেরিয়ে পড়েছিল, নজরে পড়ল তোমার আলতা-পরা একটা পায়ের পাতা আর গোল পায়ের গোছ, সেদিন এত ভাল লেগেছিল যে কী বলব…
রানিবিবি বলেছিল–ছিঃ, ওকথা বলতে নেই–অমন করে বোলো না
কান্ত বলেছিল–বলতুম না, কিন্তু তখন তো জানতুম না তুমি কে, তোমার আসল পরিচয় কী! তখন জানতুম, হাতিয়াগড়ের রানিবিবিকেই বুঝি নিয়ে চলেছি আমি! অথচ দেখো, তোমাকে নিয়ে যাবার ভার আর কারও ওপর পড়তেও তো পারত, তা না পড়ে কপালের দোষে আমার ওপরই বা সে-ভার পড়ল কেন?
তা কপালের দোষ বলছ কেন?
কপালের দোষ নয়? কপালের দোষ না থাকলে কেউ বিয়ে করতে গিয়ে দেরি করে ফেলে? কপালের দোষ না থাকলে কারও নিজের ঠিক করা বউয়ের সঙ্গে অন্য লোকের বিয়ে হয়ে যায়?
কপালের দোষ না থাকলে এত চাকরি থাকতে শেষকালে আমাকে এই চরের চাকরি করতে হয়? আর তা ছাড়া কপালের দোষ না থাকলে…
রানিবিবি বলেছিল–থাক, আর কপালের দোষ দিতে হবে না–আমি অত কপালটপাল মানিনে তোমার মতো!
