রেজা আলি আদর করে নিজের ঘোড়ার নাম দিয়েছে ফিরিঙ্গি।
সেদিন সন্ধেবেলাও রেজা আলি নিজের এলাকায় টহল দিয়ে ফিরে এসেছে। ফিরে এসেই দফতরে একজন কাফেরকে দেখে জিজ্ঞেস করলে–তুমি কে? তুম কৌন?
কান্তর কাছে সবই ছিল। পরিচয় দেবার যা যা সরঞ্জাম, সমস্তই মনসুর আলি মেহের সাহেবের কাছ থেকে জুগিয়েছিল বশির মিঞা। একটা খও দিয়ে দিয়েছিল সঙ্গে। কিছু অসুবিধে হবার কথা নয়। নবাবি নিজামতে সব পাকা কাজ। রেজা আলি সমস্ত দেখলে, ঠিক আছে। মেহেদি নেসার সাহেব এত লোক থাকতে কেন একজন কাফেরকে পাঠিয়েছে, তাও বুঝতে পারলে। মেহেদি নেসার সাহেবের এই এক গলত। সব কাজে নিজের জাতভাইকে সন্দেহ করবে। কিন্তু রেজা আলির মনে হয়, কাফেরদের এত বিশ্বাস করা ভাল নয়। নবাব আলিবর্দি খাঁ সাহেবেরও এই দোষ ছিল। জগৎশেঠজিকে বড় বেশি বিশ্বাস করেছে। এখন? এখন সেই জগৎশেঠজি যে ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে দহরমমহরম করছে, কারবার চালাচ্ছে!
ঠিক আছে, তুমি তৈরি থাকবে, আমার পালকি তৈরি আছে, বজরা আছে, ভোরাত্রেই কাম ফতে হয়ে যাবে!
কান্ত তো তৈরিই ছিল। নতুন করে আর কী তৈরি হবে। নবাবি-নোকরিতে যখন যেখানে পাঠাবে, সেখানেই যাবার জন্যে তৈরি হয়ে থাকতে হবে। আজ বলবে ইসলামাবাদ যাও, কালই হয়তো আবার জেলালগড়। আকবরনগরই হোক আর বক্সবন্দরই হোক, কিংবা দিল্লিই হোক, কান্ত সবসময়ই তৈরি।
সেই ডিহিদারের দফতরের একপাশেই সারাটা রাত একরকম জেগেই কাটল তার। শুয়ে শুয়েও কেবল মনে পড়তে লাগল সেই বিকেলবেলার ঘটনাটা। কোথায় গেল মেয়েটা। আর বিয়ের বাসর থেকে পালালই বা কেন? মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল নাকি? যার তার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল বলে রাগ করে পালিয়েছে? দেবনর-গন্ধর্ব কেউ টের পাবে না, এই-ই বা কেমন পালানো! পুষ্যানক্ষত্রে শ্বেতজয়ন্তীর শেকড় খেলে কি কেউ খুঁজে পাবে না? কান্তরও যেন কেমন পালাতে ইচ্ছে করল। কেউ টের পাবে না, সে বেশ হবে! বেশ পেট চালানোর দায়িত্ব থেকে বেঁচে যাবে। সে এর থেকে অনেক ভাল। কোথাকার কোন রাজার রানি তাকে নিয়ে যাবার দুর্ভোগ থেকে তো অন্তত বাঁচবে।
মনে আছে, তখন অনেক রাত। শেষ রাতের তারাটা তখন ডিহিদারের দফতরের জানালা দিয়ে স্পষ্ট উঁকি মারছিল। একজন সেপাইয়ের ডাকে কান্ত ধড়মড় করে উঠে পড়ল।
ভাইয়া, উঠো উঠো, জলদি উঠো
রেজা আলির কাজ পাকা কাজ। সব বন্দোবস্ত করে রেখে তবে খবর দিয়েছে। দু’জন সেপাই, একটা বজরা নদীর ঘাটে তৈরি। সেই মাঝরাতেই কখন যে সব সেপাইরা রাজবাড়িতে গিয়ে পৌঁছেছে, কখন। তারা তোড়জোড় করে সব ব্যবস্থা পাকা করে ফেলেছে, কেউ টের পায়নি। হাতিয়াগড়ের প্রজা-পাঠকরা তখন সবাই সারাদিন খেত-খামারে খেটে ঘুমে অচৈতন্য। তারা জানতেও পারলে না, কোথায় কখন কার কলকাঠিতে অত বড় রাজবাড়ির সাতমহল থেকে কী রাহাজানি হয়ে গেল। যে-হাতিয়াগড়ের বড়মশাই একদিন খাজনা দিয়ে, নবাবের বিপদে-আপদে, অর্থ-ঐশ্বর্য-স্বার্থ দিয়ে বাংলায় নবাবি মসনদ কায়েম করে দিয়েছিল, তারই প্রাসাদ থেকে আর-এক নবাব তার লজ্জা-সম্মান-সম্ভ্রম সমস্ত অপহরণ করে নিয়ে গেল।
বুড়োশিবের মন্দিরের তলায় অন্ধকারে গিয়ে দাঁড়াল কান্ত।
সেপাই দুটো সিংদরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। কান্তর দিকে চেয়ে বললে–আরে উধার কাহে, ইধার আও, ডরনা মাত
ডিহিদার রেজা আলি নিজে তখন সরকারমশাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে ভেতরে গেছে। সেখানে দাঁড়িয়েই দু’জনে কী কথা হচ্ছে ওদের। রেজা আলির ফিরিঙ্গি’দরজার সামনে দু-একবার পা ঠুকল। তার যেন আর দেরি সইছে না। সেও যেন অস্থির হয়ে উঠেছে মেহেদি নেসারের মতো। সেও যেন পা-কে বলছে–আর দেরি কোরো না-নবাবের শান্তির দরকার,নবাবের একটু মহফিলের দরকার। নবাব মসনদে বসে যন্ত্রণায় ছটফট করছে। তার চারদিকে দুশমন। তাড়াতাড়ি তোমার রানিবিবিকে পাঠিয়ে দাও। নতুন মেয়েমানুষ দিয়ে তাকে আমরা ঠান্ডা রাখব। আমরা তাকে শান্তি দেব। মনসুর-উল-মুলক খেলাৎ মির্জা মহম্মদ সিরাজ-উ-দ্দৌলা শা কুলি খান বাহাদুর খুশি থাকলে তবেই তো আমরা খুশি থাকব। আমরা খুশি থাকলে তবে তো বাংলা মুলুক খুশি থাকবে। বাংলা মুলুক খুশি থাকলে। দিল্লির বাদশা শাহানশাও খুশি থাকবে। তখন যত ইচ্ছে ফুর্তি করো, মহফিল করো, আমরা কাউকে কিছু বলব না।
সেই অন্ধকার রাতে রাজবাড়ির কোথায় বুঝি কোন কোণে একবার একটু চাপা মেয়েলি গলার শব্দ হল। একটা অস্ফুট আর্তনাদ। মহলে মহলে বুঝি একটা ত্রস্ত পদক্ষেপ। তারপর পালকিটা ঢুকে গেল সিংদরজার ভেতরের চবুতরে। একটা ফিসফিস শব্দ। অস্পষ্ট অনুচ্চারিত একটা দীর্ঘশ্বাস। কাউকে জানাবার দরকার নেই কী দুর্ঘটনা ঘটে গেল। কাল সকালে বাড়ির ভেতরে বাইরে কেউ যেন টের না পায়। যেমন খাজাঞ্চিখানায় রোজ সকালবেলায় খাতক-প্রজা-পাইকের ভিড় থাকে, কালও তেমনই ভিড় থাকবে। রোজ সকালবেলা শোভারাম যেমন ছোটমশাইকে স্নান করাতে আসে, তেমনই আসবে। ছোটমশাইয়ের জলচৌকিটার ধারে দাঁড়িয়ে বুকে-পিঠে-পায়ে সরষের তেল মাখিয়ে দেবে। কাল সকালেও বিশু পরামানিক এসে খেউরি করে দিয়ে যাবে ছোটমশাইকে। কাল সকালেও বড় বউরানি সাজিতে করে ফুল সাজিয়ে বুড়োশিবের মন্দিরে পুজো করতে যাবেন গলায় আঁচল দিয়ে। কেউ জানবে না, কোথায় কখন কী ব্যতিক্রম হল। হাতিয়াগড়ের প্রজারা আজ মাঝরাত্রে যেমন ঘুমিয়ে আছে, কাল দিনের প্রখর সূর্যের আলোতেও তেমনি করেই ঘুমিয়ে থাকবে।
