শোভারাম কুলকাঠ একগাছা এগিয়ে দিলে সামনের দিকে। সেই কুলকাঠে আগুন জ্বালানো হল। দাউদাউ করে জ্বলে উঠল শুকনো কুলকাঠ।
তারপর দুর্গা সেই কুলকাঠের আগুনের ওপর একটু একটু করে চাল ছড়ায় আর মন্ত্র পড়ে
আচাল চাল ওচাল চালম, চালম গোরক্ষনাথ।
পাতালের বাসুকী চালম, চালম পিসির হাত।
নয়ানপিসি এতক্ষণ মাটির ওপর নিজের হাতের পাতাটা উপুড় করে রেখেছিল। দুর্গা গুনে গুনে একশো আটবার তার হাতের ওপর আরও কী সব মন্ত্র পড়তে লাগল। শেষে অবাক কাণ্ড! পিসির হাতখানা আস্তে আস্তে চলতে শুরু করল। উঠোন পেরিয়ে দাওয়ায় গিয়ে উঠল হাত। মানুষের ভিড়ও আস্তে আস্তে এগোতে লাগল। কান্তও এগোল। সামনের ভিড় সরে গেল। ভিড়ের ফাঁক দিয়ে নয়ানপিসিও চলতে লাগল হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে। আর পেছন পেছন দুর্গাও চলতে লাগল সঙ্গে সঙ্গে।
শোভারাম কেমন যেন তখনও বিমর্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। পাশের একজনকে জিজ্ঞেস করলে ও হরিপদ, মাকে আমার পাওয়া যাবে তো?
হরিপদ বললে–তুমি চুপ করো তো, দুগ্যা তোমার মরিকে নির্ঘাত বার করে দেবে–তুমি চুপ করে দেখোনা
নয়ানপিসির হাত দাওয়া ছাড়িয়ে ঘরের ভেতরে গিয়ে ঢুকল। ওই ঘরেই মরালীর বাসরঘর হয়েছিল বুঝি। তখনও বাসরঘরের বালিশ-বিছানা তেমনি পড়ে আছে। কেউ হাত দেয়নি।
শোভারামের বুকটা বুঝি ঢিপঢিপ করে উঠল।
কান্ত পাশের লোকটাকে আবার জিজ্ঞেস করলে–যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল, সে কোথায় গো? সে এখেনে আছে?
লোকটার এ কথার উত্তর দেবার সময় নেই তখন। সবাই তখন মজা দেখছে একমনে। কান্তও সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল। জানালার আড়াল থেকে অনেক মেয়েমানুষ হাত-চালা দেখতে এসেছে। এখানে না এলে তো এ-খবর জানতেও পারত না কান্ত! তবে কি বর পছন্দ হয়নি। তবে কি আত্মঘাতী হল মনের দুঃখে!
কান্ত দেখলে, নয়ানপিসি বলে সেই বিধবা মেয়েমানুষটা হাত চালিয়ে যেতে যেতে একেবারে খিড়কির দিকের দরজার কাছে এসে আটকে গেছে।
দুর্গা চিৎকার করে উঠল-ইদু পিদু কুড়ি স্বাহা
আর নয়ানপিসি সঙ্গে সঙ্গে সেইখানেই দড়াম করে অজ্ঞান হয়ে পড়ল। সঁতকপাটি লেগে গেল তার।
দুর্গা এবার শোভারামের দিকে চেয়ে বললে–মাথায় জল ঢালো নয়ান পিসির
কে একজন ঘড়া এনে জল ঢালতে লাগল নয়ান পিসির মাথায়।
শোভারাম ভয় পেয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলে কী হল দুগ্যা? পেলে না?
দুর্গা বললে–মেয়েকে তোমার পাওয়া যাবে না শোভারাম
শোভারামের যেন তখন মাথায় বজ্রাঘাত হল। পাওয়া যাবে না?
ততক্ষণে দুর্গা সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বললে–না
কোথায় গেল?
দুর্গা বললে–দেব-নর-গন্ধর্ব কারও সাধ্যি নেই জানতে পারে।
তবু শোভারামের সন্দেহ গেল না। জিজ্ঞেস করলে কেন?
দুর্গা বললে–তোমার মেয়ে পুষ্যানক্ষত্রে শ্বেতজয়ন্তীর শেকড় খেয়েছে তার সন্ধান আর কেউ পাবে না
কথাটা শুনে শোভারাম হাউহাউ করে কেঁদে ফেললে। আশেপাশের লোকজনও এতক্ষণ শুনছিল। তাদেরও মন বুঝি ভারী হয়ে এল। শ্বেতজয়ন্তীর শেকড় তাকে বাসরঘরে কে এনে দিতে গেল কে জানে। আর তখন যে পুষ্যানক্ষত্র ছিল তাই বা কার জানার কথা!
শোভারাম কেঁদে পড়ল। বললে–তুমি যেমন করে পারো আমার মেয়েকে বার করে দাও দুগ্যা
দুর্গা বললে–আমি তো আমি, আমার চোদ্দোপুরুষের সাধ্যি নেই তাকে খুঁজে বার করে–ছোটমশাই আজ রাত্তিরে বাড়ি নেই, আমার অনেক কাজ, আমি চলি–
একটা কিছু ব্যবস্থা করবে না দুগ্যা? আমার যে ওই এক মেয়ে
দেখি কী করতে পারি, পরে ভেবে বলব
বলে দুর্গা কোমর দুলিয়ে রাজবাড়ির দিকে হনহন করে চলে গেল
.
ওদিকে শিবনিবাসের প্রাসাদে গোপালবাবু তখনও উদ্ধব দাসকে নিয়ে মশকরা করছিল। বলছিল তা বউ তোমার পালাল কেন হে উদ্ধব দাস?
উদ্ধব দাস গান গেয়ে উঠল। হাত মুখ নেড়ে বললে–
কেন শ্যামা গো তোর পদতলে স্বামী।
তুই সতী হয়ে পতি-পরে করিলি বদনামী ॥
পাশের ঘর থেকে উদ্ধব দাসের গানের সুরটা কানে আসতেই মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন। তারপর চিঠি থেকে মুখ তুললেন।
ছোটমশাই অধীর হয়ে একটা কিছু উত্তর শোনবার প্রতীক্ষায় ছিলেন।
এবার বললেন–তা হলে আমি এখন কী করি বলুন আপনি?
একটা উপায় আছে।
কী উপায়? আমার যে আর সময় নেই। আজ নবাব আমার স্ত্রীর দিকে নজর দিয়েছে, কাল হয়তো আবার আর কারও স্ত্রীর দিকে নজর দেবে, তখন? তা ছাড়া, আমি হয়তো ফিরে গিয়েই দেখব। ডিহিদারের লোক এসে গেছে
কী করে জানলেন?
ছোটমশাই বললেন–মুর্শিদাবাদে মিরজাফর আলি সাহেবের কাছে শুনলাম, মেহেদি নেসার নাকি একজন হিন্দুকে ভার দিয়ে দিয়েছে তাকে আনবার জন্যে।
কেন, হিন্দুকে কেন?
মুসলমানদের যে মেহেদি নেসার বিশ্বাস করে না। দেখলেন না মিরজাফরকে তাড়িয়ে দিয়ে সেই জায়গায় দেওয়ান-ই-আলা করে দিলে মোহনলালকে
পাশের ঘরে তখন উদ্ধব দাসের গলা আবার শোনা গেল। উদ্ধব দাস বলছে এই হেঁয়ালিটার সমাধান করুন তো প্রভু
ব্যবসায় ছয়গুণ হয় যেই জন।
পুরুষ অপেক্ষা করে দ্বিগুণ ভোজন।
বুদ্ধিতে যে চারিগুণ অসত্য এ নয়।
রমণেতে আটগুণ জানহ নিশ্চয়
পুরুষ অপেক্ষা যারা এত গুণ ধরে।
তত্ৰাচ জগৎ তারে অবিশ্বাস করে ॥
বলুন তো প্রভু, কী?
*
ডিহিদার সব ব্যবস্থাই করে রেখেছিল। ডিহিদার রেজা আলি দোর্দণ্ডপ্রতাপ লোক। মেহেদি নেসার সাহেবের দূরসম্পর্কের রিস্তাদার। কোথায় কার টাকা হল, কে কারবার করে দুটো পয়সা উপার্জন করেছে, সেদিকে খবর রাখাই তার আসল কাজ। মেহেদি নেসার মেহেরবানি করলে একদিন রেজা। আলি ফৌজদার পর্যন্ত উঠতে পারে। কাগজে কলমে ফৌজদাররা দিল্লির বাদশার লোক হলেও, আসলে তো নবাবই সব। তারপর আল্লার দোয়া থাকে তো সুবাদার হতেও আটকাবে না। তখন এক-হাজারি থেকে দশ-হাজারি মনসবদারি পর্যন্ত সবকিছুই রেজা আলির মুঠোর মধ্যে। তখন নবাবও যা, রেজা আলিও তাই। তখন রেজা আলি চেহেল্-সুতুনে নবাবের সামনে গিয়ে কুর্নিশ করে কথা বলবে। তখনকার কথা ভেবেই রেজা আলি নিজের দফতরে বসে মৌচে তা দেয়। তখনকার কথা ভেবেই রেজা আলি নিজের ঘোড়াটার পিঠে সপাং করে চাবুক কষিয়ে দেয়। বলে জোর কদম ফিরিঙ্গি
