মনসুর আলি মেহের সাহেব একবার কান্তর আপাদমস্তক দেখে নিলে। সারা বাংলা মুলুক চালাতে হয় মনসুর আলিকে। একদিকে মেহেদি নেসার সাহেব, আর একদিকে মিরজাফর আলি, জগৎশেঠ। দু’বজরায় পা দিয়ে চলতে হচ্ছে। বড় ঝকমারির নতিজা হয়েছে কাছারির কাজ।
কাফের তো?
হ্যাঁ হ্যাঁ ফুপা, কাফের। হিন্দু কাফের। বেইমানি করবে না।
মনসুর আলি সাহেব কান্তর দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলে–পারবে তো কাজ?
কী কাজ তাই জানে না কান্ত, তার আবার পারাপারির কী আছে! আর সাহেবের গদির মুনশিগিরি করে এসেছে এতদিন, কোন কাজটা না পারার আছে
তুই বলেছিস তো ওকে, কাজটা কী?
বশির মিঞা বললে–সে আমি সব সমঝিয়ে দেব, কিন্তু ওকে আমি বলেছি ছ’টাকা তলব দিতে হবে। ইমানদার আদমি যখন, ছ’টাকা তলব দিলে কী আর নুকসান!
এর বেশি আর কথা হল না মনসুর আলির সামনে। তারপর কাছারির বাইরে বেরিয়ে এসে বশির মিঞা সব বুঝিয়ে বললে। সব শুনে কান্তর হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে এল! আবার সেই হাতিয়াগড়ে যেতে হবে!
কিন্তু রানিবিবিকে এখানে কেন আনবে?
তা জেনে তোর ফয়দা কী? তোকে যা হুকুম করছি তাই-ই কর। কী কাম, কেন করতে হবে, এসব কখনও পুছিস না। জাসুসি কাম এই রকম। আর তোর তো কিছু ঝক্কি নেই। তুই শুধু সঙ্গে সঙ্গে থাকবি। তোর সঙ্গে টাকা থাকবে, পাঞ্জা থাকবে, ফৌজি সেপাই থাকবে, বাকি কাজ সব ডিহিদারের আদমি আছে, তারা করে রাখবে। তুই গেলেই হাতিয়াগড়ের বাপের বাপও গররাজি হবার সাহস করবে না।
কিন্তু তুই যাচ্ছিস না কেন?
বশির মিঞা বললে–আরে মেহেদি নেসার সাহেব যে আমাকে দিয়ে ভরসা করতে পারবে না। আমি যদি মেরে দিই? আমি যদি লবাবের মাল লুটেপুটে খাই?
তার মানে?
বশির মিঞা চটে গেল। বললে–তুই ওসব বুঝবি না এখন। আরও দিনকতক কাম কর নিজামতে তখন হালচাল বুঝে ফেলবি। আমরা শালারা আমাদের নিজের জাতের ওপরেই ভরসা করি না হিন্দুদেরও ভরসা করি না, মোসলমানদেরও ভরসা করি না
কিন্তু তোদের দলে তা হলে কে আছে?
মেহেদি নেসার আছে, আর আরও অনেকে আছে
বলে আর কিছু বলতে চায়নি বশির মিঞা। কান্তও জিজ্ঞেস করেনি৷ টাকা নিয়ে পাঞ্জা নিয়ে সোজা হাতিয়াগড়ে এসে পৌঁছেছিল। গরমে টা ঐটা করছে মাটি। আসবার সময় হাঁটা রাস্তা। রানিবিবিকে নিয়ে ফেরবার সময় তখন আর হাঁটা পথে ফিরতে হবে না। তখন ডিহিদার বজরা দেবে, পালকি দেবে। কাশিমবাজার থেকে সোজা পশ্চিম দিকে গেলে বক্রেশ্বর, তারপর বক্রেশ্বর থেকে সোজা বর্ধমান। সেখান থেকে হাতিয়াগড় দেড় দিনের পথ।
যখন হাতিয়াগড় পৌঁছোল কান্ত, তখন বেশ বেলা। ডিহিদারের দফতরে যাবার রাস্তাটা জেনে নিয়েছিল রাস্তার লোকজনদের কাছে। এই ক’দিন আগেই এখানে এসেছিল বিয়ে করতে। আবার এখানেই তাকে আসতে হবে কে জানত। যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে, তার সঙ্গেই হয়তো শ্বশুরবাড়িতে চলে গেছে সেবউ। হয়তো এতদিন বউভাতও হয়ে গেছে। তারপর হয়তো ধুলো পায়ে লগ্ন সারতে মাথায় সিঁদুর পরে ঘোমটা দিয়ে আবার হাতিয়াগড়েই ফিরে এসেছে, কে জানে!
হ্যাঁগো, এখানে ডিহিদারের দপ্তর কোন পাড়ায় গো?
আপনি কে?
কেমন যেন সন্দেহভরা দৃষ্টি দিয়ে লোকটা তার দিকে চেয়ে দেখলে। তার আসল উদ্দেশ্যটা লোকে জেনে গেছে নাকি! লোকটারও তাড়া ছিল। সেও আর দাঁড়াল না। তখনও বেশ বেলা রয়েছে। সোজা চলতে চলতে নদীর ঘাটে এসে দাঁড়াল। এইখানেই নেমেছিল সেদিন নৌকো থেকে। এইখানেই সেই সচ্চরিত্র ঘটকটা দাঁড়িয়ে ছিল। পুরনো সব কথাগুলো মনে পড়তে লাগল। সেদিন আর এ-দিনে কত তফাত। দূরেই মন্দিরটা দেখা যাচ্ছে। বশির মিঞা বলে দিয়েছিল বুড়ো শিবের মন্দির ওটা। ওরই পেছনে হাতিয়াগড়ের রাজবাড়ি। কোথাকার কোন রাজার বউকে কোন একনবাবের কাছে পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে। চাকরির এও এক বিড়ম্বনা।
হঠাৎ দূরে যেন একটা ভিড় দেখা গেল।
ওইটেই তো তার সেই শ্বশুরবাড়ি। ওই বাড়িটার সামনেই তো সে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। কত লোক উঠোনে খেতে বসেছিল। আজ আবার সেই বাড়িটার সামনেই ভিড়ে ভিড়। আজ আবার ওখানে কী হল।
তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে এগিয়ে গেল কান্ত।
ভিড়ের ঠেলায় ভেতরে কিছু দেখা যায় না। হঠাৎ নজরে পড়ল তার সেই শ্বশুর। শোভারাম বিশ্বাস। চোখ দুটো ছলছল করছে। কাদোক্কাদো মুখ। কী হল আবার এ বাড়িতে! এখন মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে, এখন তো মুখে হাসি বেরোবার কথা!
হ্যাঁগো, এবাড়িতে কী হয়েছে?
চাষাভুষো লোক একজন। কেন, আপনি জানেন না? আপনি কোন গাঁয়ের লোক? হাতিয়াগড়ের সব লোক জেনে গেছে যে! কোন সরকার থেকে আসছেন আপনি? সাত-গাঁ, না বাজুহা?
আমি পরদেশি, কিছু বিপদআপদ হয়েছে বুঝি?
লোকটা বললে–ওই যে দেখছেন বুড়োপানা লোক, ওর মেয়ে পালিয়ে গিয়েছে, বিয়ের রাত্তিরে। বাসরঘর থেকে কিনে পালিয়ে গেছে!
মাথায় যেন বজ্রাঘাত হল কান্তর! কোথায় পালিয়ে গেছে?
ভগমান জানে! তাই তো দুগ্যা হাত চালাচ্ছে–দেখছেন না?
দুগ্যা কে?
রাজবাড়ির ঝি দুগ্যা যে গুণ করতে জানে, নয়ানপিসি মাটিতে হাত পেতে আছে, ওই হাত চলতে আরম্ভ করবে
সত্যিই দুর্গা তখন বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ছে। পুবপাড়া, দক্ষিণপাড়া, তাঁতিপাড়া, কৈবর্তপাড়া, মুসলমানপাড়া–সব পাড়ার লোক হাত-চালা দেখতে এসেছে। উঠোন-দাওয়া-ঘর ভরে গেছে। দুর্গা একটা নতুন থান শাড়ি পরেছে। পুজো তখন সবে বুঝি আরম্ভ হচ্ছে। চালে হলুদে মেখে সাজালে পুজোর জায়গাটা। তারপর জিজ্ঞেস করলে কুলকাঠ কই, কুলকাঠ?
