আজ্ঞে কান্তবাবু তো বেওয়ারিশ লোক, কে আর থাকবে? সাত কুলেও কেউ নেই–নো-ওয়ান ইন সেভেন কুল
সাহেব জিজ্ঞেস করলে কুল? হোয়াট ইজ কুল?
হুজুর, কুল মানে খাবার কুল নয়–কুল মানে ইয়ে..মানে…
আর বোঝাতে পারলে না ষষ্ঠীপদ। শেষকালে হাত মুখ নেড়ে বললে–সাত কুল মানে সাতপুরুষ, মানে স্যার সেভেনম্যান
সাহেব বোধহয় কিছুটা বুঝতে পারলে। সেভেন জেনারেশন। আর বুঝতে চাইলে না বিশদ করে। ষষ্ঠীপদ তবু বোঝাতে লাগল। মুর্শিদাবাদে পালিয়ে যাবে বলেই কলকাতায় একটা আস্তানা করেনি কান্তবাবু। আপনার এখান থেকে যত টাকা লুঠ করেছে সেই সমস্ত দিয়ে রাজধানীতে দালান-কোঠা বানিয়েছে, বিবি রেখেছে। আসলে খুলে বলি আপনাকে, কান্তবাবু হিন্দু নয় হুজুর। মুসলমান!
হিন্দু নয়? সাহেব যেন আবার অবাক হয়ে গেল।
না হুজুর। হিন্দু হলে কি আর অত নেমকহারাম হয় হুজুর? দেখছেন না হুজুর, আমি হিন্দু বলে কত অনেস্ট। আমাদের গড হল শিব। আমাদের শিবের গাজন হয়, আপনি দেখেছেন তো–চড়কের সময় পিঠে বান ছুঁড়ে কত কষ্ট করতে হয় বলুন তো
আর তুমি? তুমি শিবপুজো করো?
কী বলছেন হুজুর? করব না? আমি যে ব্রাহ্মণ হুজুর। এই দেখুন–আমার পইতে দেখুন বলে ষষ্ঠীপদ নিজের পইতেটা বুড়ো আঙুলে আটকে রেখে সাহেবের চোখের সামনে ধরলে।
আমি রোজ গঙ্গামাটি দিয়ে এই পইতে পরিষ্কার করি হুজুর। আপনি এবার থেকে যত চাকর রাখবেন সব এই পইতে দেখে রাখবেন, আপনার কোনও জিনিস চুরি হবে না। জাতের মধ্যে সবচেয়ে বড় জাত হচ্ছেন হুজুর, আপনারা, তারপরেই আমরা, এই ব্রাহ্মণরা। এটা আপনি জেনে রাখবেন হুজুর
ঠিক আছে, আজ থেকেই তুমি তা হলে মুনশির কাজ করো–
সাহেবের বোধহয় খুব তাড়া ছিল। তাড়াতাড়ি হিসেবের খাতায় সই করে, টাকাকড়ি পকেটে পুরে উঠছিল। পেছন থেকে ষষ্ঠীপদ এগিয়ে গিয়ে বললে–হুজুর, তা হলে গোমস্তার কাজ কে করবে? আমি তো মুনশি–
সাহেব বললে–আর একজন খুঁজতে হবে
তার চেয়ে হুজুর, একটা কাজ করি, আমার এক ব্রাদার-ইন-ল আছে, সে একেবারে পিয়োর ব্রাহ্মণ, যাকে বলে হজুর একেবারে খাঁটি ব্রাহ্মণ, তার পইতে আমার চেয়েও সাদা, একেবারে সাদা ধপধপ করছে, তাকে রাখবেন? তারও গড শিব
অলরাইট, তাকেই রাখো, কিন্তু ব্রাহ্মিণ যেন হয়—
বলে সাহেব তাড়াতাড়ি আবার পালকিতে গিয়ে উঠল। নইলে ওদিকেও দেরি হয়ে যাবে। সাহেবের সন্ধেবেলা ড্যান্স চাই, ওয়াইন চাই, ওম্যান চাই। এসব নিয়ে বেশি সময় নষ্ট করবার সময় থাকে না বেভারিজ সাহেবের।
সাহেব চলে যেতেই ভৈরব গুটিগুটি ভেতরে ঢুকল। ষষ্ঠীপদ দেখেই বললে–ঠিক গন্ধ পেয়েছিস তো! তোর চাকরি হয়ে গেল, কাল থেকে এখেনে গোমস্তার কাজ করবি
তা মাইনে? মাইনে কত পাব কত্তা?
কেন, তোর সঙ্গে তো কথা হয়ে আছে। দু’টাকা মাইনে, তার থেকে এক টাকা আমার। কিন্তু কথার খেলাফি যদি করো বাপু এখন, তা হলে কিন্তু তোমার চাকরি হবে না, তা বলে রাখছি। আর ওই যা বলেছিলুম–যা হাতসাফাই করব, তার দশভাগের একভাগ তোমার, বাকিটা সব আমার–রাজি তো? আমি কান্তবাবুকেও ওই কথাই বলেছিলুম, তা কান্তবাবু তো রাজি হয়নি, তাই এখন সরে যেতে হল। আমার সঙ্গে চালাকি করে পারবিনে, তা বলে রাখছি
তারপর একটু থেমে বললে–আর একটা কথা, তোকে বাপু গলায় একটা পইতে দিতে হবে
ভৈরব জিভ কেটেছে। সেকী হুজুর? আমি যে নমশূদ্র
নমশূদ্র তো কী হয়েছে? আমিও তো বাহাত্তরে কায়েত, আমি কী করে পইতে পরি? এ কি আমার দেশ না তোর দেশ? এখেনে বেটা ম্লেচ্ছদের হাতে মাইনে নিলে জাত যায় না, আর পইতে নিলেই একেবারে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? টাকা বড় না জাত বড়? বল, বল তাই আমাকে–
আজ্ঞে টাকা!
তবে? তবে যে পইতে পরতে ভয় পাচ্ছিস? যখন এককাঁড়ি টাকা নিয়ে দেশে-গাঁয়ে যাবি তখন পইতেটা ছুঁড়ে ফেলে দিস, কে দেখতে যাচ্ছে? চিরকাল তো আর ফিরিঙ্গি কোম্পানি থাকবে না, দু’দিনের জন্যে এসেছে, কারবার করছে, আবার একদিন ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাবে। কিন্তু টাকাটা তো আর ফিরিয়ে নিতে পারবে না। আমাদের টাকা আমাদেরই থেকে যাবে। তখন টাকা দিয়ে তিনটে বামুন খাইয়ে কালীঘাটে পুজো দিলেই প্রাশ্চিত্তির হয়ে যাবে
কথাটা ভৈরবের তখনও ভাল করে উপলব্ধি হয়নি।
ষষ্ঠীপদ বললে–তিনগাছা ফরসা সুতো নিয়ে গলায় দিয়ে আয়, আজ থেকেই তোর চাকরি হয়ে গেল ধরে নে–আর সাহেব এসে যদি তোর নাম জিজ্ঞেস করে, যেন বলিসনি তোর নাম ভৈরব দাস, বলবি ভৈরব চক্কোত্তি, বুঝলি?
ভৈরব বুঝল কি বুঝল না, কে জানে!
অত তখন ভাববার সময় নেই ষষ্ঠীপদর। ভৈরব ঘাড় নেড়ে পইতে জোগাড় করতে চলে গেল।
*
বশির মিঞার ফুপা মনসুর আলি মেহের মোহরারের সঙ্গে কান্তর সেই প্রথম দেখা। বশির মিঞাই নিজে নিয়ে গেল তার কাছে। এলাহি কাণ্ড চারদিকে। এর আগে কখনও নিজামতকাছারি দেখেনি কান্ত। মনটাও খারাপ হয়ে গিয়েছিল তার। এত সৎভাবে চাকরি করেও চাকরি রইল না তার। সাহেব তাকে ভুল ভাবলে। সাহেব কিনা ভাবলে তার মুনশি নবাবের নিজামতের চর। স্পাই। কলকাতা থেকে হাতিয়াগড়, হাতিয়াগড় থেকে কলকাতা। আবার কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদ। হাতে একটা বাড়তি টাকাও নেই।
বশির মিঞা বললে–ফুপা, এই হল আমার দোস্ত–এর কাছ থেকেই ফিরিঙ্গিদের সব খবর পেতাম খুব সাচ্চা আদমি, একেই হাতিয়াগড়ে পাঠাচ্ছি
