তা হলে আমি আসি ষষ্ঠীপদ।
হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনি আর দাঁড়াবেন না, আপনি চলে যান। আপনি থাকলে আমার একটু সুবিধে হত, কিন্তু আমার সুবিধের চেয়ে আপনার সুবিধেটাই বড় বলে মনে করি আমার নিজের কষ্ট হোক, কিন্তু আপনার ভাল হোক, এই আমি চাই কান্তবাবু
কান্ত আর দাঁড়াল না। আর কোনও কথা না বলে সোজা আবার পথে পা বাড়াল পুঁটলিটা হাতে নিয়ে। মিছিমিছি অনেকগুলো টাকা খরচ হয়ে গেল। বিয়ের গায়ে-হলুদের কিছু জিনিসপত্র কিনতে হয়েছিল। নাপিতকেও রাহা খরচ দিতে হয়েছিল। বড়চাতরার বাড়িটা পরিষ্কার করবার জন্যেও নায়েববাবুদের গোমস্তাকে কিছু টাকা পাঠাতে হয়েছিল। একদিন বহু আগে সব ছেড়ে এখানে এই কলকাতায় এসে আশ্রয় পেয়েছিল, আজকে আবার এখান থেকেও চলে যেতে হল। সবাই যখন নিজের নিজের দেশ ছেড়ে কলকাতায় এসে নতুন করে বসবাস পত্তন করতে শুরু করছে, তখন কান্তকেই একলা এ-জায়গা ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে। তবু তো মুর্শিদাবাদ রাজধানী! এই জলা-জঙ্গল ভরা কলকাতার থেকে তো সেই মুর্শিদাবাদ ভাল। মুর্শিদাবাদ হল শহর, আর এ তো গ্রাম। গণ্ডগ্রাম! ভাগ্যে থাকলে হয়তো সেই রাজধানীতে গিয়েই তার ভাগ্য উদয় হবে। কোথায় কবে কেমন করে কার ভাগ্য উদয় হয় কেউ কি বলতে পারে!
আশ্চর্য, কান্ত যদি জানত একদিন তার এই রাজধানীতে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলার ইতিহাস এমন করে বদলে যাবে! যদি জানত একদিন তার ভাগ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের ভাগ্য জড়িয়ে একাকার হয়ে যাবে। যদি জানত শুধু বাংলাদেশ নয়, সমস্ত ভারতবর্ষের ভাগ্যলক্ষ্মীকে এমন করে পরের হাতে তুলে দেবে!
কান্ত গদি ছেড়ে চলে যাবার পরই বেভারিজ সাহেব এসে হাজির হল। সহজে বেভারিজ সাহেব কাউকে কিছু বলে না। কারবার করতে এসেছে কালাপানি পেরিয়ে। প্রথমে রাইটার হয়ে এসেছিল। তখন বছর কুড়ি বয়েস সাহেবের। নিজের দেশে কিছু হল না। বাপ-মা ছেলের জন্যে ভেবে ভেবে অস্থির। চাকরিবাকরি পায় না। এদিকে বেয়াড়া হয়ে যাচ্ছে ছেলের স্বভাব। মেয়েদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে বেড়ায় দিনরাত। শেষকালে একদিন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজে উঠে ইন্ডিয়ায় এসে হাজির হল। যে বেভারিজ সাহেব নিজের দেশে খেতে পেত না ভাল করে, এই সস্তা-গণ্ডার দেশে এসে তার হাতে টাকা এল, মেয়েমানুষ এল। চাকর বাকর-ঝি-বেয়ারা নিয়ে একেবারে নবাবপুত্তুর হয়ে বসল। গড়গড়ায় তামাক খেতে লাগল। বারুইপুরের পান খেতে লাগল। চুলে তেল মাখতে লাগল। তখন ঘুমোবার সময় দু’জন চাকর পায়ে সুড়সুড়ি দিলে তবে বেভারিজ সাহেবের ঘুম আসে। সে ঘুম ভাঙে পরদিন বেলা বারোটায়! একজন তামাক সাজে, একজন জামা পরিয়ে দেয়, একজন আবার জুতো পরিয়ে দেয়। কুড়িটা চাকর না হলে বেভারিজ সাহেবের অসহায় বলে মনে হয় নিজেকে। তারপর খেয়েদেয়ে নাক ভাকিয়ে ঘুমিয়ে বিকেলবেলা পালকি নিয়ে বেরোয়। বেরিয়ে একবার পেরিন সাহেবের কেল্লায় যায়,
তারপর আসে সোরার গদিতে। সাহেব এলেই কান্ত হিসেবপত্র নিয়ে সাহেবের সামনে ধরে। সাহেব একবার দেখে। তারপর যথাস্থানে সইসাবুদ করে পকেটে টাকাকড়ি পুরে নিয়ে আবার পালকি করে চলে যায়।
কিন্তু সেদিন ষষ্ঠীপদকে দেখে সাহেব অবাক হয়ে গেল। কান্তবাবু কোথায়? হোয়ের ইজ কান্টোবাবু?
ষষ্ঠীপদ বললে–আজ্ঞে হুজুর, কান্তবাবু আসবে না
হোয়াই? কেন?
হুজুর, কান্তবাবু তো চাকরি করতে আসেনি এখানে, অন্য কাজে এসেছিল।
কী কাজ?
আজ্ঞে হুজুর, এতদিন আপনাকে আমি বলিনি, কান্তবাবু নবাবের স্পাই হুজুর!
হোয়াট!
বেভারিজ সাহেব যেন ভয় পেয়ে লাফিয়ে উঠেছে কেদারা থেকে। সামনে কেউটে সাপ দেখলেও কেউ এমন করে চমকে ওঠে না। নবাবের স্পাই এতদিন তার গদিতে কাজ করছে আর সাহেব কিনা কিছুই জানত না।
এতদিন আমাকে বলোনি কেন কিছু?
হুজুর, আমার কসুর হয়ে গেছে। আমি রোজ দেখতাম কান্তবাবুর কাছেনবাবের লোক আসত, এসে গুজগুজ ফিসফিস করত!
সাহেব বুঝতে পারলে না। জিজ্ঞেস করলে গুজগুজ ফিসফিস কী?
আজ্ঞে, এখানকার কেল্লার সব খবর নিত!
কে সে? লোকটার নাম কী?
আজ্ঞে বশির মিঞা! আসলে কান্তবাবু আপনার কাছ থেকেও মাইনে নিত, আবার নবাব-নিজামতের কাছারি থেকেও মাইনে নিত। দুমুখো সাপ হুজুর। তা ছাড়া আপনার গদির টাকাই কি কম মেরেছে। নাকি? আপনি তো কিছু দেখেন না হুজুর, হাজার হাজার টাকা মেরে নিয়েছে তবিল থেকে
স্ট্রেঞ্জ! বেভারিজ সাহেবের যেন চোখ খুলে গেল এতদিনে। হলওয়েল সেদিন বলেছিল বটে যে বাঙালিদের বিশ্বাস করতে নেই।
বলে হিসেবের খাতাটা বার করে খুলে ধরে দেখালে ষষ্ঠীপদ। এই দেখুন, এইখানে একান্ন টাকার খেলাপ লেখা আছে, আর এখানে জমার বেলায় শূন্য। আর এই দেখুন দু’শো তিরাশি টাকা জমা লেখা আছে, আর আয়ের ঘরে জমা করা হয়নি।
বেভারিজ সাহেব দেখলে নজর দিয়ে।
বললে–আগে এসব আমাকে বলেনি কেন?
আজ্ঞে আমি কী করে বলি? মুনশি হল কান্তবাবু, আমি তো গোমস্তা মাত্তোর, আমি খাস মুনশির বিরুদ্ধে বলব?
ঠিক আছে। বেভারিজ সাহেব বললে–ঠিক আছে, কান্তবাবুকে আমি ডিসচার্জ করে দিলাম। তুমিই মুনশির কাজ করবে এবার থেকে। মুনশির কাজ করতে পারবে তুমি?
ষষ্ঠীপদ হাসলে। সাহেব বুঝল সে হাসির মানে। জিজ্ঞেস করলে–মুনশির কে আছে কলকাতায়?
