তোকে খুন করতে পারলেই তো আমি শান্তি পেতাম, কিন্তু.. তা শেষপর্যন্ত হয়তো তাই-ই..
এতক্ষণ দুর্গা একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল চুপ করে। তার দিকে নজর পড়তেই বড় বউরানি ধমক দিলেন–তুই এখেনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী শুনছিস; অ্যাঁ? তুই যা এখান থেকে যা
দুর্গা ঘরের বাইরে চলে গেল। তারপর বড় বউরানির হঠাৎ পালঙের তলার দিকে নজর পড়ল। বলে উঠলেন–ওখানে কে রে? কে ওখানে? খাটের তলায়?
ওদিকে শিবনিবাসের একটা ঘরের মধ্যে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র তখন সব শুনছেন; শুনতে শুনতে মুখটা কঠোর হয়ে এল তার। তারপরে হাতের চিঠিটা নিয়ে আর একবার পড়তে লাগলেন।
‘নবদ্বীপাধিপতি মহারাজ শ্রীল শ্রীযুক্ত কৃষ্ণচন্দ্র রায়।
বরাবরেষু—
বাংলার নবাবের অত্যাচারে শিক্ষিত, অশিক্ষিত, বিদ্বান, মূর্খ, পণ্ডিত সকলেই স্ব স্ব ঘর-দ্বার ত্যাগ করিয়া পলাইতে উদ্যত। নবাব কাহারও কোনও কথা শুনেইনা। এ-বিষয়ে কী কর্তব্য বুঝিতে না পারিয়া আপনাকে আমরা আহ্বান করিতেছি। আপনি সত্বর আসিয়া সুচিন্তিত মতামত দিয়া সহায়তা করিলে বাংলাদেশ রক্ষা হয়। ইতি—’
নীচে সই করেছেন মিরজাফর, জগৎশেঠ, রাজা দুর্লভরাম, রাজা রামনারায়ণ, রাজা রাজবল্লভ, রাজা কৃষ্ণদাস, রাজা হিরণ্যনারায়ণ।
*
কান্ত কী করবে বুঝতে পারলে না। ষষ্ঠীপদ তাকে যে এমনভাবে ডোবাবে তা সে বুঝতে পারেনি। যতদিন চাকরি করেছে বেভারিজ সাহেবের কাছে, ষষ্ঠীপদ মাথা হেঁট করে সব কাজ করে গেছে। পেটে। পেটে তার যে এমন বুদ্ধি তা জানা যায়নি।
সে-রাতটা সেই হাতিয়াগড়েই কাটল। ওদিকে বিয়েবাড়ির গোলমাল তখন চলছে। রান্নার গন্ধ আসছেনাকে। সচ্চরিত্র নিজেই তিনটে পাতা করে নিয়েছিল। একটা নিজের জন্যে, একটা কান্তর জন্যে, আর একটা নাপিতের জন্যে।
কোথায় যেন একটা ক্ষোভ, একটা লজ্জা, একটা পরাজয়ের কলঙ্ক সারা শরীর আর মনটাকে পিষে থেঁতলে নিঃশেষ করে দিচ্ছিল।
খেয়ে নাও বাবাজি, খেয়ে নেবে চলো, কলাপাতা পেতে দিয়েছি, বৃহৎ ব্যাপারে কারও ওপর নির্ভর করলে চলে না, নিজেরাই করে নিতে হয়। এখানে লজ্জা করলে নিজেরাই উপোষ করে মরব–
সচ্চরিত্র উৎসাহ দিয়ে কান্তকে চাঙ্গা করতে চেয়েছিল খুব। তারও অন্যায় নেই কিছু। সে এরকম অনেক বিয়ে দেখেছে, অনেক বিয়ে ভাঙতেও দেখেছে। নাপিতও এসব দেখে ঠেকে শিখেছে। বিয়েবাড়িতে খেতে সংকোচ করলে শেষকালে ঠকতে হয়।
আপনারা খেতে বসুন, আমি খাব’খন, আমার খিদে নেই
বিয়ে উপলক্ষে সারাদিনই উপোষ করে ছিল। তবু খিদের কথা যেন মনেই পড়ল না। সঙ্গে ঘোট একটা পোটলা ছিল। একটা বাড়তি ধুতি, আর একটা চাদর। সেই পোঁটলাটা নিয়েই সে সেদিন আবার নৌকোর আশায় নদীর ঘাটে এসে দাঁড়াল। কোথায় এতক্ষণ একটা বাড়ির অন্দরমহলে তাকে ঘিরে আনন্দের কলগুঞ্জন মুখর হয়ে উঠবে, তা নয়, সেই মাঝরাত্রের নির্জন পাথরধাঁধানো ঘাটের ওপরেই বুঝি একটুখানি তন্দ্রা এসেছিল। তারপর শেষরাত্রের দিকে ঘুম ভেঙে যেতেই দেখলে, নদীতে একটা নৌকো চলেছে। গহনার নৌকো। তারপর সেই তাদের বলেকয়ে সোজা কলকাতা। কিন্তু সেখানে যখন গিয়ে পৌঁছোল তখন রীতিমতো দেরি হয়ে গেছে। যার নাম বিকেল।
ষষ্ঠীপদ দেখতে পেয়ে হাঁ হাঁ করে উঠল-হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনি ঢুকবেন না কান্তবাবু, সাহেব মানা করে গেছে
মানা করে গেছে মানে!
ষষ্ঠীপদ বললে–আপনি কাল যাবার পরেই যে সাহেব রাত্তিরে এসেছিল। সাহেব একলা নয়, সাহেবের সঙ্গে কেল্লা থেকে পল্টনরাও এসেছিল।
কেন?
আপনাকে ধরতে।
ধরতে মানে? আমি কী করেছি?
ষষ্ঠীপদ বললে–তা তো জানিনে। উমিচাঁদ সাহেবের লোক সাহেবকে বলেছে যে, আপনার কাছে। নাকি মুর্শিদাবাদের চর বশির মিঞা আসে। আপনার কাছ থেকে সব খবর নিয়ে সে মুর্শিদাবাদে পাচার করে।…
কান্ত কেমন অবাক হয়ে গেল। বশির মিঞা যে চর একথা কে বললে! ভাল করে ভেবে দেখল, কবে তাকে কী কথা সে বলেছে। কী কী জানতে চেয়েছে সে। অনেক সময় ষষ্ঠীপদর সামনেও অনেক কথা হয়েছে তার সঙ্গে। বশির মিঞা যে এখানে আসে এ কথা ষষ্ঠীপদ ছাড়া আর কে-ই বা জানে।
তা হলে আমি কি দেখা করব গিয়ে সাহেবের সঙ্গে?
না, তা করবেন না কান্তবাবু। শেষকালে আপনাকে হয়তো কেল্লার ফাটকে পুরে ফেলবে সাহেব। সাহেব বড় রেগে গেছে কিনা। সাহেব আমাকে বলে রেখেছে আপনি এলেই যেন তাকে খবর দিই। তা আমি তেমন নেমকহারাম নই কান্তবাবু। অন্য লোক হলে এত কথা বলত না, সাহেবকে গিয়ে চুপি চুপি খবরটা দিয়ে আসত
তা হলে আমি এখন কী করি বলো তো ষষ্ঠীপদ?
আমি আপনার ছোটভাইয়ের মতো কান্তবাবু, আমি বলছি আপনি এখান থেকে পালিয়ে যান। আপনার ভাবনা কী কান্তবাবু! এ ছোটলোকদের চাকরি কে সাধ করে করে? আমার যদি জানাশোনা থাকত তো আমি কবে নিজামতকাছারিতে গিয়ে চাকরি নিতুম! আপনাকে কত খোশামোদ করছে ওরা আর আপনি কিনা হেলায় হারাচ্ছেন! আপনি না নিন, আমাকে একটা চাকরি করে দিন ওখানে
কান্ত অনেক ভাবল। কাল থেকে খাওয়া নেই। কাল থেকে ঘুম নেই। মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। সত্যিই তো৷ ষষ্ঠীপদ তো ঠিক কথাই বলেছে। নবাব মারা গেছে। তারপরেই ফিরিঙ্গি সাহেবদের মধ্যে তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। লড়াই-ই বেধে যাবে হয়তো। তখন কোথায় থাকবে ফিরিঙ্গি কোম্পানি আর কোথায়ই বা থাকবে তার চাকরি!
