কিন্তু ততদিন তো এখানকার ডিহিদার বসে থাকবে না। সে তো আবার এল বলে। তখন তাকে কী বলে ঠেকাবে?
ছোটমশাই বললেন সেই কথাই তো আমি ভাবছি। তা হলে আমি একবার কেষ্টনগরে যাই, বলি গিয়ে মহারাজকে সব খুলে
বড় বউরানি বললেন–সে তোমার যা-খুশি করো গে যাও, আমি কিছু বলতে যাচ্ছি না, তার আগে যদি ডিহিদারের লোক আসে তো একটা রক্তারক্তি কাণ্ড বাধিয়ে তুলব, তা তোমায় বলে রাখছি
ছোটমশাই বললেন কিন্তু সে তুমি তখন যাই করো, এখন যেন তুমি কিছু বলতে যেয়ো না ওকে বড়বউ। তা হলে কেঁদেকেটে একশা করবে ও লোক জানাজানি হয়ে যাবে
বলব না মানে! নিশ্চয়ই বলব, আমি এখুনি গিয়ে বলে আসছি বলে ঘর থেকে বড়বউ তাড়াতাড়ি ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গিয়েছিল–
ছোটমশাই পেছন থেকে ডেকেছিলেন–বড়বউ, শোনো, শুনে যাও–ও বড়বউ বড়বউ
নিজের মহল ছেড়ে বড় বউরানি বারান্দা পেরিয়ে একেবারে সোজা ছোট বউরানির মহলে গিয়ে পড়লেন। কদিন থেকেই মাথার ঠিক ছিল না। ভাল করে পুজোতেও মন বসছিল না তার। এত সাধের সংসার তার। কত সাধ করে ছোটকে এনেছিলেন তিনি। নিজের হাতে ছোটকে তুলে দিলেন স্বামীর হাতে। নিজে পছন্দ করে বিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন–আমার ছেলে হল না। আমি এসেই হাতিয়াগড়কে নির্বংশ করে গেলাম। তুই এলে তবু যদি আবার হাতিয়াগড় বেঁচে ওঠে! অনেকদিন আগে বজরা করে মহালে যেতে যেতে চাকদহের ঘাটে প্রথম দেখেন ছোটকে। দূর থেকে বজরার জানালা। দিয়ে দেখা। ছোট তখন চান করতে নেমেছে ঘাটে। কত আর বয়েস। বউ হয়ে ঘোমটা দিয়ে সংসার। করবার বয়েস তখনও হয়নি ঘোটর। কিন্তু চোখ জুড়িয়ে গিয়েছিল দেখে। কাঁচা হলুদের মতো রং। গায়ের। মাথার চুলগুলো পিঠের ওপর এলিয়ে পড়েছে। বদর মিঞা বজরার হাল ধরে ছিল। বড় বউরানি বদর মিঞাকেই পাঠালেন।
বললেন–দেখে এসো তো বদর, ও মেয়েটি কাদের?
চাকদহর শ্রীনিবাস মুখুটির একমাত্র মেয়ে। মা নেই, ভাই নেই, বোন নেই। সংসারে আপন বলতে কেউ নেই।
তা না থাক, সেইখানেই ঘাটে বজরা বাঁধা হল সেদিনকার মতো। শ্রীনিবাস মুখুটি মশাইকে বজরায় ডেকে পাঠানো হল। শ্রীনিবাস মুখুটি প্রথমে বুঝতে পারেননি। পরে বুঝলেন পাত্র হাতিয়াগড়ের রাজা হিরণ্যনারায়ণ রায়। তিনি কেঁদে ফেললেন আনন্দে। আনন্দও হল কষ্টও হল। কুলীন হয়ে অকুলীনের হাতে নিজের মেয়েকে দেবেন। যেন মেয়ের কথা ভেবেই চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে পড়ল।
সেই এতটুকু মেয়ে রাসমণি। সেই এ-বাড়ির ছোট বউরানি। তাকেই আজ ম্লেচ্ছদের হাতে তুলে দিতে হবে। তাড়াতাড়ি ছোটর মহলে দরজায় গিয়ে ঘা দিতে লাগলেন–ছোট, ও ছোট ওঠ ওঠ–
ঘরের ভেতরে তখন ছোট বউরানি আর মরালী পাশা খেলতে বসেছে। এমন সময় কারও আসবার কথা নয়। দুর্গা গিয়ে ডেকে এনেছিল মরালীকে।
বউ বউরানির গলা পেয়েই ভয়ে সকলের গলা কাঠ হয়ে গেছে।
ওমা, বড় বউরানি যে, কী হবে?
দুর্গা তাড়াতাড়ি মরালীকে পালঙের নীচে ঠেলে ঢুকিয়ে দিয়েছে। ভেতরে যা শিগগির, বড় বউরানি দেখতে পেলে অনগ্ধ বাধবে—যা–
বড় বউরানি ভেতরে ঢুকেই একেবারে রণচণ্ডী মূর্তি ধরলে।
মুখপুড়ি, তুই নিজেরও মুখ পোড়ালি আর রায় বংশেরও মুখ পোড়ালি! কেন তুই মরতে গিয়েছিলি মুর্শিদাবাদে?
ছোট বউরানি এমনিতে হাসিখুশির মানুষ। কিন্তু বড়দিকে একটু ভয় করে। বড়দিকে দেখেই কেমন চোখ মুখ শুকিয়ে গেল।
বড় বউরানি তখনও বলে চলেছে–এত যদি তোর রূপের দেমাক, তা পরপুরুষকে সেরূপ না দেখালে তোর চলছিল না? পরপুরুষই তোর কাছে এত মিষ্টি হল রে? তুই একবার তোর স্বামীর কথা ভাবলি না, আমার কথা ভাবলি না, এই রায়বংশের কথাও ভাবলি না মুখপুড়ি?
ছোট বউরানির চোখ দুটো ছলছল করে উঠল।
এখন আমার বাপের বাড়ির লোকের কাছে মুখ দেখাব কেমন করে বল তো? আমার হাতিয়াগড়ের প্রজাদের কাছে আমি কী কৈফিয়তটা দেব? আমি সাধ করে তোকে আস্তাকুঁড় থেকে রাজসিংহাসনে বসালুম, তাতেও তোর মন বসল না? তোর এত দেমাক?
ছোট বউরানি কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠল–তুমি আমাকে অমন করে বোকোনাবড়দি, তুমি আমার মায়ের মতন আমার মা নেই–তুমিই আমার মা…
তা মায়ের মুখ খুব রাখলি তো ছোট! মায়ের মুখ একেবারে পুড়িয়ে ছাড়লি তুই–এমন মেয়ে নিয়ে এসেছিলুম সতিন করে যে আমার হাড়মাস পর্যন্ত ছাই করে দিলে! কেন তুই মরতে গিয়েছিলি, বল মুখপুড়ি বল
ছোট বউরানি বললে–তুমি তো জানো বড়দি, আমি যেতে চাইনি–
তুই যেতে চাসনি তো তোকে হাতে দড়ি বেঁধে ধরে নিয়ে গিয়েছিল ছোটমশাই? কেন, বাড়ির ভেতর ঘরের জানালা-দরজা বন্ধ করে রুপোর পালঙে শুয়েও তোর পিরিত হয় না? এত গরম তোর? তবু যদি বুঝতুম একটা ছেলে বিয়োতে পারতিস–
ছোট বউরানি দু’হাতে নিজের মুখ ঢেকে তখন কাঁদছে।
আবার কাঁদছে। ভেবেছে কাদলে সুরাহা হবে! ছেনালি কান্না রাখ তো তুই। ও কান্নায় আমি ভুলছিনে!
ছোট বউরানি হঠাৎ ডুকরে উঠল–কিন্তু আমার কী দোষ বলো তুমি?
তোর দোষ নয়? কেন তুই নবাবজাদার বিয়েতে মুর্শিদাবাদে গেছলি? আর যদি গেলিই তো কেন নবাবজাদার ইয়ারবকশিদের দিকে চোখ তুলে চাইলি? একলা ছোটমশাইতে তোর মন ভরছিল না–?
ছোট বউরানি আর পারলে না। হঠাৎ বড় বউরানি পায়ের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে হাউহাউ করে কেঁদে উঠল। বললে–আর অত বোকো না বড়দি, আমাকে তুমি তার চেয়ে খুন করে ফেলল, আমি সহ্য করতে পারছি না
