*
বড় বউরানি ছোটমশাইকে ভাল করে সব বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। কী কী কথা বলতে হবে তাও গুছিয়ে শিখিয়ে দিয়েছিলেন।
বলেছিলেন–তুমি যেন আবার শুধু হাতে এবার ফিরে এসো না—
ছোটমশাই বলেছিলেন–তুমি যে কী বলো! আমি কিছু বলতে পারি না ভেবেছ?
না, ওরকম মিউমিউ করে কথা বললে–চলবে না।
আমি মিউমিউ করে কথা বলি?
তা বলো না? বললে–আজকে এই দশা হয়? এত বড় আস্পর্ধা নবাবের? নবাব হয়েছে বলে কি একেবারে আমাদের মাথা কিনে নিয়েছে? আমি যদি পুরুষ হতুম তো কবে দূর করে দিতুম না গদি থেকে–
ছোটমশাই বলেছিলেন–এসব কাজ কি অত তাড়াহুড়ো করলে চলে? সবাই মিলে পরামর্শ করছি, দেখতে পাচ্ছ তো
তা নিজের বউকে তা হলে দিয়ে এসো নবাবের হাতে তুলে!
তখনও জানাজানি হয়নি ব্যাপারটা। ছোটমশাই ভেবেছিলেন একদিন সব চাপা পড়ে যাবে। একবার যদি ফিরিঙ্গিরা মাথা চাড়া দেয় তো তখন হয়তো সব ওলোটপালট হয়ে যাবে। সেদিন রাত্রে পরওয়ানাটা পড়ে তাই মাথাটা কেমন ঘুরে গিয়েছিল। তারপর থেকেই কী করবেন, কার কাছে যাবেন বুঝতে পারছিলেন না। একবার চিঠি পাঠান মহিমাপুরে। জগা খাজাঞ্চি বুড়ো মানুষ। তাকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আর কার কাছেই বা বিশ্বাস করে সব বলা যায়। সে-চিঠি আসার জন্যে হাঁ করে পথের দিকে চেয়ে বসে থাকেন। জগা খাজাঞ্চি খালি হাতে ফিরে আসে। শেঠজি খবর দেন–সব বন্দোবস্ত হচ্ছে। কিন্তু কতদিন আর তার জন্যে অপেক্ষা করে থাকা যায়।
বউ বউরানি বলেন–আমি কিন্তু বলে রাখছি, কিছুতেই ছোটকে পাঠাব না সেখানে
তা আমিই কি সাধ করে পাঠাচ্ছি! আমার কি কোনও কষ্ট হয় না?
কষ্ট? কষ্টটাই তুমি দেখলে আর মানসম্মানের কথা তো ভাবলে না একবার! তোমার কষ্টটাই তোমার কাছে বড় হল? মেয়েমানুষ হয়ে জন্মেছি বলে কি এত অপমান সইতে হবে?
ছোটমশাই বলেছিলেন–তুমি এত চেঁচাচ্ছ কেন, শুনতে পাবে যে
বেশ করব চেঁচাব। হাতিয়াগড়ের রাজবাড়ির মানসম্মান বলে একটা জিনিস নেই! আমি ওকে খুন করব তবু ওকে যেতে দেব না, দেখি ওই মেহেদি নেসার বেটা কী করতে পারে–
আসলে তো মেহেদি নেসার একলা নয়!
একলাই হোক আর দোকলাই হোক, আমি কি ভয় করি নাকি কাউকে–? ভেবেছে গদি পেয়েছে বলে যা ইচ্ছে তাই করবে! ভগবান বলে কেউ নেই নাকি ভেবেছে? পরকাল নেই! পরকালে নরকে গিয়ে জবাবদিহি করতে হবে না এর জন্যে!
বড় বউরানি যখন রাগেন তখন ছোটমশাইয়ের ভয় হয়। চুপ করে থাকেন।
আজ ওকে নিচ্ছে, কাল আবার গাঁয়ের আর কাউকে চাইবে! তখন কী করবে? তোমার মুখের দিকে না চেয়ে আছে সব লোক? তাদের হিত তুমি দেখবে না?
ছোটমশাই বললেন–দেখো, বাড়ির মধ্যে অমন অনেক চেঁচানো যায়, দেশের অবস্থা তো জানো, সবাই ভয়ে ভয়ে কাঁপছে হিন্দু মুসলমান ফিরিঙ্গিরা পর্যন্ত ভয় করে আছে
তারপর বড় বউরানি কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই ছোটমশাই বললেন–শুনলুম সেদিন লস্করপুরের তালুকদার কাশিম আলি সাহেব নাকি নিজামত কাছারিতে মকর্দমার তদবির করতে গিয়েছিল, মেহেদি নেসার তাকে ধরে তার পালকিতে জুতে দিয়েছে আবার শুনলাম কাকে নাকি ধরে রাস্তায় কোন হিন্দুকে জোর করে গোরুর মাংস খাইয়ে দিয়েছে
বউ বড়রানি বললেন–তা তো হবেই, জমিদাররা যত হয়েছে ভেড়ার দল
ছোটমশাই বললেন–তুমি তো বলেই খালাস, কিন্তু জলে বাস করে কি কুমিরের সঙ্গে ঝগড়া করা যায়? তা হলে তো সেই লড়াই বেধে যাবে
তা লড়াই করবে! এমন করে গোরু-ভেড়ার মতো বেঁচে থাকার চেয়ে লড়াই করে মরে যাওয়াও যে ভাল
তুমি মেয়েমানুষ বাড়ির মধ্যে থাকো, লড়াইয়ের কী বুঝবে! লড়াই মানেই তো কতকগুলো নিরীহ মানুষ মারা যাবে মাঝখান থেকে
বড় বউরানি খেপে গেলেন–তা কয়েকশো মানুষ মারা যাবে বলে লড়াই না করে অন্যায় সহ্য করবে?
ছোটমশাই আর থাকতে পারলেন না। গলাটা একটু উঁচু করে বললেন–অন্যায় সহ্য করার কথা বারবার বলছ কেন মিছিমিছি? আমি কি আমার কথা বলছি? আমি তোমাদের কথা ভেবেই ভয় পাচ্ছি
তা আমরা কি মরতে জানিনে ভেবেছ? না আমরা কখনও মরিনি? আমার ঠাকুমা আমার ঠাকুরদার চিতেয় উঠে পুড়ে মরেনি? মেয়েরা যা পারে তোমরা তা পারো?
ছোটমশাই বললেন–কেন মিছিমিছি তুমি ওসব কথা তুলছ! এখন কী করা যায় তাই ভাবো
ভেবে আমি ঠিক করে ফেলেছি। আমি ছোটকে খুন করব তবু নবাবের হাতে তুলে দেব না!
সেটা তো একটা কথার মতো কথা হল না। যা করা সম্ভব তাই বলো!
সব সম্ভব! মেয়েমানুষের কাছে কিছুই অসম্ভব নয়।
রেগে যেয়ো না, রেগে গেলে কোনও সমাধান হয় না। ভাল করে ভেবেচিন্তে বলো
বড় বউরানি বললেন–আমি সবদিক ভেবেই বলছি। যেদিন থেকে ডিহিদারের পরওয়ানা এসেছে, সেইদিন থেকেই ভাবছি, আমি মাধব ঢালিকে বলে রেখেছি, এবার ডিহিদারের লোক এলেই আমি আমার কাজ সেরে ফেলব। তারপর দরকার হলে না-হয় আমিও আত্মঘাতী হব। যে-দেশে পুরুষমানুষ। নেই, সে-দেশে মরা ছাড়া আমাদের আর কী গতি আছে বলো?
সত্যি বলছি বড়বউ, এসব কথা আমি সমস্ত বুঝিয়ে বলেছি শেঠজিকে
শেঠজি কী করবে? তার কীসের ভাবনা? তার টাকার জোর আছে, নবাব বাদশা থেকে শুরু করে পাইক-পেয়াদা পর্যন্ত তার দলে। আমাদের কথা শেঠজিরা বুঝবে কেন?
ছোটমশাই বললেন–না না, শেঠজি বুঝেছে সব। সমস্ত তোড়জোড় হচ্ছে। ওদিকে ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে ফরাসডাঙার ফিরিঙ্গিদের লড়াই হচ্ছিল বলে এতদিন কিছু করতে পারেনি এবার যে মেমসাহেবদের ধরে নবাবের হারেমে পুরে অপমান করেছে, এবার তাদের গায়েও লেগেছে– ।
