সচ্চরিত্র চোখ চাইতেই লোকটা বললে–এমন গরমে কি বেরোতে হয় বাবা। মাথা ঘুরে পড়ে তো যাবেই–
তবু কথা বলছে না দেখে লোকটা বললে–আমি এখানকার মসজিদের ইমামসাহেব বাবা, আমার মসজিদে হেঁটে যেতে পারবে?
সচ্চরিত্রর তখনও ভয় যায়নি। বললে–ইমামসাহেব, ওঁরা কোথায়?
ওঁরা কারা বাবা?
নাম উচ্চারণ করতেও যেন ভয় হল সচ্চরিত্রর। পাশেই বমি পড়ে রয়েছে তার। এতক্ষণে গন্ধটা যেন নতুন করে নাকে লাগল। মনে পড়ল সব ঘটনাগুলো। রাম রাম থুঃ থুঃ–সচ্চরিত্র ছেলেমানুষের মতো হাউহাউ করে কেঁদে ফেললে। আমার সর্বনাশ হয়েছে ইমামসাহেব, আমার জাত গেছে-আমার সব গেছে।
বলতে বলতে কান্নায় আর কথা বলতে পারলে না সচ্চরিত্র। ইমামসাহেব এ-অঞ্চলের বহু পুরনো লোক। এসব জিনিস দেখা আছে। নদী থেকে জল তুলে এনে সচ্চরিত্রর মাথায় দিতে লাগল। সচ্চরিত্রর কান্না যেন কিছুতেই আর থামতে চায় না। আমার যজমানদের কাছে আমি মুখ দেখাব কেমন করে ইমামসাহেব—
*
শিবের নিবাস বোধহয় শিবনিবাসও। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র যখন কোথাও যাবেন একলা যাবেন না। সঙ্গে পারিষদরাও যাবে। লোকে বলত–মহারাজ তো মহারাজ, নদীয়ার মহারাজ। উদ্ধব দাস কতবার ছড়া কেটেছিল কৃষ্ণচন্দ্রকে নিয়ে। একবার ডেকেছিলেন মহারাজ। বলেছিলেন–লোকটাকে একবার আনিস তো আমার কাছে
উদ্ধব দাস গেয়েছিল
আমি রব না ভব-ভবনে!
শুনে হে শিব শ্রবণে!
যে-নারী করে নাথ পতিবক্ষে পদাঘাত
তুমি তারই বশীভূত
আমি তা সব কেমন!
মহারাজ রসিক লোক। বললেন–তার পর? তার পর? কার লেখা? তোমার?
উদ্ধব দাস বললে–আজ্ঞে হ্যাঁ মহারাজ, এই অধীনের রচনা। তারপর গাইতে শুরু করলে
পতি বক্ষে পদ হানি ও হল না কলঙ্কিনী
মন্দ হল মন্দাকিনী ভক্ত হরিদাস ভণে।
আমি রব না ভব-ভবনে।
উদ্ধব দাসের গান শুনে সেবার খুব ভাল লেগেছিল মহারাজার। পাশে মন্ত্রী কালিপ্রসাদ সিংহ বসে ছিলেন। তিনি বললেন–ওর আর একটা গান আছে, সেইটে শোনাও তো দাসমশাই তোমার সেই ছড়াটা?
উদ্ধব দাস বললে–তবে শুনুন আজ্ঞে শোভার কথা
বলি বলে উদ্ধব দাস আরম্ভ করলে–
শুনো শুনো সভাজন অভাজনের নিবেদন।
শোভার কথা সভা মধ্যে করি বিবরণ ॥
ঐরাবতের ইন্দ্র শোভা, যোগীর শোভা জটা ॥
ব্রাহ্মণের পইতে শোভা, কপালের শোভা ফোঁটা ॥
আহা বেশ বেশ বেশ ॥
রায় গুণাকর ভারতচন্দ্র শুনছিলেন। সভাকবি! তার মুখ দিয়ে হাসি বেরোল। বললেন–বাঃ, বেশ বেশ
উদ্ধব দাস আবার আরম্ভ করলে–
নিশির শোভা শশী আর নভের শোভা তারা।
ব্রজের শোভা কৃষ্ণচন্দ্র, নদের শোভা গোরা ॥
আহা বেশ বেশ বেশ ॥
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র খুব খুশি। বললেন–রায়গুণাকর, এ যে তোমাকেও হার মানালে হে—
উদ্ধব দাস আবার গাইতে শুরু করেছে
যুবতীর পতি শোভা আর।
গৃহের শোভা নারী।
উদ্ধবচন্দ্র দাস বলে যাই বলিহারি–
আহা যাই বলিহারি ॥
আহা বেশ বেশ বেশ ॥
সঙ্গে সঙ্গে যারা শুনছিল সবাই বলে উঠল–আহা বেশ বেশ বেশ–তার পর?
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র হঠাৎ ডাকলেন–ও গোপালবাবু, গোপালবাবু
গোপালবাবু এতক্ষণ একপাশে মুখ চুন করে শুনছিলেন। একটা কথাও বলেননি। কৃষ্ণচন্দ্র বললেন–লোকে তোমাকে ভাঁড় বলে গোপালবাবু, কিন্তু উদ্ধব দাস যে তোমাকে হারিয়ে দিলে দেখছি
উদ্ধব দাসের তখন উৎসাহ বেড়ে গেছে। বললে–তা হলে আমি একটা ছড়া বলব রাজামশাই বলুন তো দেখি কী উত্তর হয়–
সূর্যবংশ জন্ম তার অজ রাজার নাতি।
দশরথ পুত্র বটে নয় সীতাপতি ॥
রাবণের অরি নয় লক্ষ্মণের জ্যেষ্ঠ।
ভণে কবি উদ্ধব দাস হেঁয়ালির শ্রেষ্ঠ।
বলুন তো প্রভু, কী?
মহারাজ গোপালবাবুর দিকে চাইলেন। বললেন–বলো গোপালবাবু, উত্তর দিতে হবে তোমাকে! নইলে তোমার চাকরি থাকবে না আর
গোপালবাবু ক্ষীণ একটু হাসলেন। বললেন–আজ্ঞে, ভরত—
উদ্বব দাস বললে–তা হলে আর একটা বলুন দিকি, কেমন বিদ্যে আপনার দেখি–
পিতৃগৃহে লজ্জাবতী থাকে অতিশয়।
কিন্তু পরগহে গেলে সে ভাব না রয় ॥
মুখেতে করিলে তারে জুড়ায় পরান।
সভাস্থলে সবাকার রাখয়ে সম্মান ॥
রমণী কুলেতে তার কর্ম ভাল জানে।
কী নাম তাহার প্রভু বলো মম স্থানে ॥
গোপালবাবু, চুপ করে রইলে কেন, বলো? উত্তর দাও
মন্ত্রী কালিপ্রসাদ সিংহ বললেন–আমি বলব? পান—
তুমি হেরে গেলে গোপালবাবু–উত্তর দিতে পারলে না—
গোপালবাবু বললেন–তা হলে আমি একটা বলি–উত্তর দাও তো হে–
অলি অলি পাখিগুলি গলি গলি যায়।
সর্ব অঙ্গ ছেড়ে দিয়ে ডোখ খুবলে খায় ॥
উদ্ধব দাস বললে–প্রভু, এ তো সহজ প্রশ্ন, ধোঁয়া—
মহারাজ খুব খুশি। বললেন–তুমি একটা চাকরি নেবে উদ্ধব দাস আমার কাছে?
উদ্ধব দাস গান গেয়ে উঠল–আমি রব না ভব-ভবনে
মহারাজ চাকরকে ডাকলেন–ওরে বৈকুণ্ঠ, এই উদ্ধব দাসকে কিছু খেতে দে–কিছু খেতে ইচ্ছে করছে? খিদে পেয়েছে? কী খাবে?
উদ্ধব দাস বললে–আজ্ঞে, মুগের ডাল—
কালিপ্রসাদ সিংহ হঠাৎ তাড়াতাড়ি কাছে ঘেঁষে এলেন। কানে কানে বললেন তিনি এসেছেন
কার আসার কথা শুনেই যেন মহারাজ উঠলেন। অনেক দিন এসব ষড়যন্ত্রের মধ্যে ছিলেন না। এসব আগে করা গেছে। ক’মাস থেকেই ভাল লাগছিল না কিছু। দিল্লির বাদশাদের সঙ্গে আপস করে চলতে চলতেই জীবন কেটে গেল। আবার এখন মুর্শিদাবাদের নবাবকে নিয়ে ওরা ঘোঁট পাকিয়ে তুলছে। যেন অনিচ্ছের সঙ্গে বললেন–চলো–আমি আসছি—
