আজ্ঞে, এই তো শিবনিবাস থেকেই আসছি আমি ছোটমশাই। ওভেনে মহারাজ কেষ্টচন্দ্র আছেন, তস্য মন্ত্রী কালীপ্রসাদ সিংহ মশাই আছেন, গোপাল ভাড় মশাই আছেন, রায় গুণাকর কবিভূষণ ভারতচন্দ্র আছেন। আমি গেলুম, মহারাজ আমাকে পাঁচটি টাকা দিলেন, আমাকে খুব স্নেহ করেন কিনা–আর আমি তো যে-সে ঘটক নই ছোটমশাই, ঈশ্বর ইন্দিবর ঘটকের…
ওসব কথা শোনবার বোধহয় সময় ছিল না ছোটমশাইয়ের। বেহারাদের ইঙ্গিত করতেই তারা চলতে লাগল
সচ্চরিত্র চেঁচিয়ে বলে উঠল–আজ্ঞে, সোজা নাক বরাবর গিয়ে বাঁ দিকে মোড় নেবেন, সেখানে চুয়োডাঙার মধ্যে পড়ে ইচ্ছামতীর পাড় ধরে একেবারে…
ছোটমশাই শুনতে পেলেন কি না কে জানে। পালকিটা হনহন করে চলে গেল। আহা, ছোটমশাইকে ভাল করে পথটা বলে দেওয়া হল না। সচ্চরিত্রর মাথার মধ্যে সবসময় যেন চরকির পাক চলছে। শোভারামের মেয়ের বিয়ের পর থেকেই জিনিসটা হচ্ছে। আর সে-যুগ নেই। এখন যেন ঘটক দেখলে ঠাট্টা করে সবাই। যেন ঠাট্টার বস্তু সচ্চরিত্র। আমি মরছি পেটের জ্বালায়, আর সবাই ঠাট্টা ধরে নিয়েছে। কুলশীল মিলিয়ে, মেলগোত্র যাচাই করে বিবাহ দেওয়া কি যার-তার কাজ কর্তা? আমার পিতা ঈশ্বর ইন্দিবর ঘটক, পিতামহ কালীবর ঘটক…
হঠাৎ পেছন থেকে কে একজন নবাবি নিজামতের লোক একেবারে চেঁচিয়ে উঠেছে এই পণ্ডিত–পণ্ডিত
মহা মুশকিলে পড়া গেল। সচ্চরিত্রকেও চেনে নাকি! আমার পিতা ঈশ্বর ইন্দিবর ঘটক, আমার পিতামহ কালীবর ঘটক….
পরিচয় দিতে দিতেই জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। নবাবি কেতায় প্রাণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
আমি রে বাবা, আমি! আমি কোথায় যাই তাতে তোমার কীসের দরকার বাপু! তুমি নিজের চাকায় তেল দাও না ভাইসাব! আমি পণ্ডিত নই, আমি ঘটক, ঘটককারিকা আমার মুখস্থ
চলো, মেহেদি নেসার সাহেব তলব দিয়েছে। চলো
সচ্চরিত্রর বুকটা ধক করে উঠেছে মেহেদি নেসার সাহেবের নাম শুনে। এরপর কেঁচোর মতো হয়ে। গেল সচ্চরিত্রর মুখখানা। সেপাইটার পেছন পেছন যেতে হল। মোল্লায় ধরলে মসজিদ পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে তবে ছাড়বে। কোথা দিয়ে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে কে জানে। জিজ্ঞেস করবার সাহস পর্যন্ত নেই সচ্চরিত্রর। পুঁটলিটা বগলে করে একেবারে নদীর ধারে নিয়ে গেল। ঘাটে নৌকো বাঁধা। ভেতরে মেহেদি নেসার সাহেব। সঙ্গে ইয়ারবকশি সবাই আছে।
নৌকোর সামনে যেতেই সচ্চরিত্র ঢিপ করে একটা প্রণাম ঠুকে দিলে।
মেহেদি নেশার মদ খেলেও কাজের কথা ভোলে না।
জিজ্ঞেস করলো–হ্যাঁ রে পণ্ডিত, সড়ক দিয়ে পালকি করে কাউকে যেতে দেখেছিস তুই
দেখেছি হুজুর
মেহেদি নেসার শুধু একলা নয়। ইবলিশ সাহেব, সফিউল্লা সাহেব, ইয়ারজান সাহেব। নবাবের সব শাগরেদরা হুল্লোড় করছে ভেতরে।
বহুত আচ্ছা পণ্ডিত, বহুত আচ্ছা
ইবলিশ সাহেব বললে–ওকে একটু দারু দাও নেসার মিঞা, পণ্ডিতের গলাটা শুকিয়ে গিয়েছে। ইয়ার
দারু খাবি পণ্ডিত? গলা ভিজিয়ে নিবি?
শুধু মদ নয়, ভেতর থেকে মাংসর গন্ধও আসছে। হো হো করে সবাই হেসে উঠল কথাটায়। সচ্চরিত্র কাপড়টা দিয়ে নাক চাপা দিলে। গন্ধতে পেটের নাড়িভুড়িগুলো পর্যন্ত বমি হয়ে আসছে।
পালকিতে কে ছিল দেখেছিস?
আজ্ঞে হ্যাঁ, জনাব।
কে?
হাতিয়াগড়ের ছোটমশাই হুজুর
বলেই সচ্চরিত্র বুঝলে বলাটা ঠিক হয়নি৷ ছোটমশাইয়ের কী ক্ষতি করবে কে জানে!
কোন দিকে গেল?
ততক্ষণে একজন সত্যি সত্যিই গেলাসে মদ ঢেলে টলতে টলতে সামনে নিয়ে এসে মুখে দেয় আর কী। আর একজন মাংসের বাটিটা নিয়ে এসেছে খাওয়াবে বলে।
সচ্চরিত্র তখনও মুখে কাপড় চাপা দিয়ে আছে। কোনওরকমে মুখ ফাঁক করে বললে–ওসব আমি খাই না হুজুর। আমি হিন্দু হুজুর
মেহেদি নেসার জিজ্ঞেস করলে–শিগগির বল, জমিদারবাচ্চা কোন দিকে গেল–তা হলে গোস খাওয়াব না, না বলতে পারলে তোকে গোস খাইয়ে দেব
হুজুর, জমিদারবাবু মোল্লাহাটের দিকে গেল!
মোল্লাহাট?
হ্যাঁ হুজুর, মোল্লাহাটের রাস্তা জিজ্ঞেস করলেন আমাকে আমি তাই রাস্তা বলে দিলুম।
কে জানে, কী সদবুদ্ধি উদয় হল সচ্চরিত্রর মনে। ছোটমশাইয়ের অতিথিশালায় অনেক দিন আশ্রয় পেয়েছে সচ্চরিত্র। হয়তো শিবনিবাসের নাম করলে কোনও সর্বনাশ হবে ছোটমশাইয়ের। কে জানে! এ মিথ্যে কথায় কোনও পাপ নেই।
মোল্লাহাটের নাম শুনে যেন খানিকটা নিশ্চিন্ত হল সবাই। নৌকো আবার মোল্লাহাটের দিকেই ফিরল। মোল্লাহাটে পৌঁছোতে রাত পূইয়ে ভোর হয়ে যাবে। কিন্তু ইয়ারজান ছাড়লে না। বললে–পণ্ডিত উবকার করেছে, তা হলে পণ্ডিতকে একটু দারু খাইয়েই দে ইয়ার, পণ্ডিতের গলা ভিজিয়ে দে–
তারপর সে এক কাণ্ড! তিনজনে মিলেই সচ্চরিত্রকে জাপটে ধরলে। তারপর নাকের কাপড়টা খুলে দিয়ে একজন মুখটা হাঁ করিয়ে মদ ঢেলে দিলে। গলা দিয়ে কিছুতেই ঢোকে না। তারই ওপর আর
একজন মাংস নিয়ে মুখের মধ্যে পুরে দিয়ে বললে–খা পণ্ডিত, খা খা–
সচ্চরিত্রর মনে হল মাথাটা যেন তার ঘুরছে। হাত থেকে ঘটককারিকার পুঁটলিটা মাটিতে পড়ে গেল। বোধহয় তার তখন আর জ্ঞানই নেই। সেই টাটা করা রোদ, সেই দুপুরবেলা মাথার ব্রহ্মতালু ভেদ করে যেন প্রাণটা বেরিয়ে আসতে চাইল বাইরে। সঙ্গে সঙ্গে সবাই হো হো করে পৈশাচিক হাসি হেসে উঠেছে।
হঠাৎ অনেকক্ষণ পরে জ্ঞান হতেই চোখ তুলে দেখলে কে যেন তার মাথায় জল দিচ্ছে। চিনতে পারলে না লোকটাকে। একমুখ পাকা দাড়ি। বেশ বুড়ো মানুষ।
