ভাল করেছিস। একটা নোকরি খালি আছে। ছ’টাকা তলব। হাতিয়াগড়ে যেতে হবে তোকে।
হাতিয়াগড়ে? হাতিয়াগড়েই তো বিয়ে করতে গিয়েছিলাম আমি।
তা হলে আবার যা।
কী কাজ?
বশির মিঞা বললে–বলছি তোকে সব। আমার সঙ্গে আয়, সব বলব–হাতিয়াগড়ের রানিবিবিকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতে হবে তোকে—
.
সচ্চরিত্র পুরকায়স্থর লজ্জাও নেই। আবার খাতাপত্র নিয়ে পুঁটলি ঘাড়ে করে অন্য জায়গায় ঘটকালি করতে যায়। হাঁটতে হাঁটতে যায়, আবার কোথাও কোনও সরাইখানা থাকলে সেখানে রাতটার মতন জিরোয়। আর যেখানে কোনও জমিদারবাড়িতে অতিথিশালা থাকে, সেখানে দিন দুই বিশ্রাম করে আবার বেরিয়ে পড়ে। আজিমাবাদ হয়ে রাজমহল গিয়ে একেবারে সুতি পর্যন্ত চলে যায়। তারপর সেখান থেকে মুর্শিদাবাদ, জঙ্গি, অগ্রদীপ হয়ে গঙ্গার ওপারের গাজিপুর পর্যন্ত।
কিংবা বর্ধমান থেকে বীরভূম পর্যন্ত গিয়ে মাঝখানে বক্রেশ্বর হয়ে পুবে কাশিমবাজার। তারপর রামপুর বোয়ালিয়ার দক্ষিণে হাজরাহাট দিয়ে করতোয়ার তির ঘেঁষে ঘেঁষে সেরপুর মুরচা পর্যন্ত যায়। বর্ধিষ্ণু একটা গ্রাম দেখলেই একটু জিরিয়ে নেয়। একে ওকে ডেকে জিজ্ঞেস করে আপনাদের গায়ে ভাল পাত্তোর টাত্তোর আছে মশাই?—
কিন্তু যারা খবরটা পেয়েছে তারা বলে–না বাপু, তোমাকে দিয়ে ঘটকালি করাব না–
কেন আজ্ঞে, আমি কী দোষ করলুম?
দোষ করো নাই? হাতিয়াগড়ের শোভারাম বিশ্বাসের মেয়েটার কী সব্বোনাশ করলে বলল দিকিনি? তার ইহকালও গেল পরকালও গেল
সচ্চরিত্র বোঝে খরবটা জানাজানি হয়ে গেছে। এ-খবর জানাজানি হতে বেশিদিন লাগে না। এক সরকার থেকে আর এক সরকারে লোক যায়, নৌকো যায়, হাতি যায়। সচ্চরিত্র চলতে চলতে হয়তো একেবারে কেষ্টনগর চলে গেছে। কেষ্টনগরে অতিথিশালা আছে। যজমানও কিছু আছে সেখানে সচ্চরিত্রর। তবু কেষ্টনগরের রাজবাড়িতে খাওয়াটা ভাল দেয়। নবদ্বীপের রাজা। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের খাতিরটা হয় ভালমতন।
কেষ্টনগরের কাছাকাছি এলেই লোকে খেপায়। বলে–এই সচ্চরিত্র—
ছেলেছোকরার কথায় না খেপলেই ল্যাঠা চুকে যায়। কিন্তু সচ্চরিত্র খেপে ওঠে। খেপে গিয়ে দৌড়োয়। তাদের পেছন পেছন তাড়া করে। বলে–তবে রে হাড়হাবাতের দল
কিন্তু ছেলেছোকরাদের সঙ্গে পারবে কেন সচ্চরিত্র। তারা দৌড়োতে দৌড়োতে কোথায় গিয়ে লুকিয়ে পড়ে তখন আর কাউকে দেখতে পাওয়া যায় না। এমনি করেই দিন কেটে যায় সচ্চরিত্রর। এমনি করেই শোভারামের মেয়ের বিয়ের ব্যাপারটা ভুলতে চেষ্টা করে। কেষ্টনগর থেকে শিবনিবাস যায়। শিবনিবাস থেকে মোল্লাহাটি। মোল্লাহাটিতে গিয়ে হয়তো একটা পুকুরের ধারে গাছের ছায়ায় বসে জিরিয়ে নেয়। তারপর পোঁটলাটা মাথায় নিয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
সেদিন সচ্চরিত্র একেবারে ধড়মড় করে উঠে পড়েছে। কে? কে যেন ডাকলে আমাকে?
মনে হল দূরে যেন কার পালকি যাচ্ছে। পালকির দরজাটা খোলা। কেউ ডাকেনি তাকে। পালকির বেহারাদের হুম হাম শব্দেই হয়তো তন্দ্রাটা ভেঙে গেছে। হয়তো কোনও জমিদার হবে। যাচ্ছে। কেষ্টনগর রাজবাড়িতে। ভাল পাত্রের সন্ধান পেলেও পাওয়া যেতে পারে। তাড়াতাড়ি গিয়ে রাস্তার ওপর দাঁড়াল। কে যায় গো? কে?
পালকি-বেহারারা ঘেমে নেয়ে উঠেছে।
খুব যে গ্যাদা হয়েছে গো। বলি কে আছে ভেতরে? তবু কেউ উত্তর দিলে না। সচ্চরিত্রকে চেনে তারা। পাগল-ছাগলের কথায় উত্তর দেয় না। খিদে পাচ্ছিল খুব। পেটের ভেতর নাড়িভুঁড়িগুলো বাটনা বাটতে শুরু করেছে। পুঁটলিটা নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলে সচ্চরিত্র। মোল্লাহাটির শ্রীধর বাঁড়ুজ্জে মশাইয়ের একটা ছেলে ছিল। বহুদিন আগের কথা। ছেলে তখন সবে জন্মেছে। প্রায় ন’বছর হয়ে গেল। সেই পাত্রটির সন্ধানে গেলে হয়। পুঁটলিটা নিয়ে উঠল সচ্চরিত্র। উঠে আবার পথ চলা। হঠাৎ দূর থেকে আবার দেখা গেল সেই পালকিটা আবার আসছে।
পালকিটা পাশ দিয়ে চলে যাবারই কথা। সচ্চরিত্র রাস্তার একপাশে সরে দাঁড়াল। কিন্তু অবাক কাণ্ড, পালকিটা সামনে এসেই থেমে গেছে।
শিবনিবাসের পথটা কোন দিকে কত্তা?
সচ্চরিত্র বললে–কেন বলতে যাব শুনি? আমার কথার উত্তর দিয়েছিলে তোমরা? আমি ঈশ্বর ইন্দিবর ঘটকের পুত্র, ঈশ্বর কালীবর ঘটকের পৌত্র…
হঠাৎ পালকির ভেতর থেকে একটা মুখ বেরোতেই সচ্চরিত্র একবারে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে করজোড়ে বলে উঠল–ছোটমশাই আপনি? অধীনকে মার্জনা করবেন হুজুর
হাতিয়াগড়ের ছোটমশাইয়ের হয়তো তখন অত কথা শোনবার সময় ছিল না। চেহারাটা কেমন শুকনো-শুকনো। গরমকাল। ছোটমশাইকে হাতিয়াগড়ে অনেকবার দেখেছে সচ্চরিত্র। ছোটমশাইয়ের অতিথিশালাতেও গিয়ে অনেক দিন রাত কাটিয়ে এসেছে। ছোটমশাইয়ের মতো ভালমানুষ ক’টা আছে বাংলাদেশে। শুধু ছোটমশাই কেন, বড়মশাইকেও চিনত সচ্চরিত্র। রথের সময় পুণ্যাহের সময় নতুন কাপড় দিতেন তিনি। সেসব দিনের কথা সচ্চরিত্রর মনে আছে।
ছোটমশাই বললেন–শিবনিবাসের রাস্তা জানো তুমি?
আজ্ঞে, শিবনিবাসের রাস্তা আমি চিনব না? আমি হলুম ঈশ্বর ইন্দিবর ঘটকের পুত্র, ঈশ্বর কালীবর ঘটকের পৌত্র…
ওসব কথা থাক, আমার সময় নেই, শিবনিবাসে যাবার সোজা রাস্তাটা কোন দিকে গেলে পড়ে তুমি গেছ তো ওদিকে!
