দুর্গা বললে–তোর বর তো এখন অতিথশালায় উঠেছে, এই আমার অতিথশালায়
কোন বর?
তোর কলকাতার বর লো। তুই রোস একটু, আমি ডেকে আনছি
এই ছোটমশাইয়ের অতিথশালায়?
হ্যাঁ লো, হ্যাঁ। এখেনে এসে উঠেছে। ওই বুড়ো ঘটকটা, নাপিত আর তোর বর, দাঁড়া আমি এখুনি ডেকে আনছি
দুর্গা চলে গেল। যাবার সময় আবার দরজায় তালা লাগিয়ে দিয়ে গেল। মরালীর মনে হল সব যেন নিস্তব্ধ হয়ে এল চারিদিকে। সব চুপচাপ। জানালার পাশে কোথায় বুঝি একটা ঝিঁঝিপোকা শুধু শব্দের করাত দিয়ে বিকট শব্দ করতে করতে সে-অন্ধকার চিরে খানখান করে ফেলছে। এই সব অন্ধকার রাতেই মুর্শিদাবাদের নবাবের বিরুদ্ধে যত ষড়যন্ত্র মুখর হয়ে ওঠে। মতিঝিলের ওপর একটা দোদুল্যমান বাতাস বুঝি এইসব রাতেই কেঁপে কেঁপে প্রহর ঘোষণা করে। মেহেদি নেসার, ইবলিস, মহম্মদ, ইয়ারজান, সফিউল্লা সাহেবরা তখন তাদের কোটর থেকে বেরিয়ে ফণা তুলে ধরে আকাশে। তারা নবাবকে পরামর্শ দেয় কলকাতা একেবারে সোনায় মোড়া জাঁহাপনা, কলকাতা লুঠ করলে চাদি, জহরত, আর মোহরের কোনও কিফায়েত হবে না
তারা বলে–জাঁহাপনার চারদিকে দুশমন, ওদিকে জাঁহাপনার মাসতুতো ভাই শওকত জঙ আর এদিকে ঘসেটি বেগমসাহেবারা আর ফিরিঙ্গিরা, সকলকে ঠান্ডা করে মসনদে বসে মহফিল করবেন
তারা বলে আর মেয়েমানুষ? জেনানা? তাও আমরা জাঁহাপনাকে জোগাড় করে দেব। নবাব সরফরাজ খা’র পনেরোশো বাঁদি বেগম ছিল, জাঁহাপনারও অভাব হবে না জেনানার, একটা ফৈজি বেগম গেছে যাক, আমরা জাঁহাপনাকে আরও হাজার হাজার ফৈজি বেগম জোগাড় করে দেব
নায়েব মশাইয়ের হাত থেকে তখন পরওয়ানাটা নিয়ে ছোটমশাই পড়ছেন–বদরগাহ রসুল নেয়ামত উসুল কোনেন্দা বান্দে নবাব মির্জা মহম্মদ মনসুরউল-মুলুক সিরাজ-উ-দৌল্লা শা কুলি খান বাহাদুর নেবাং জঙ আলমগির বজন্দিগি তোমার খেয়ের খোবি দারুদ সুরাতে বান্দার খোয়ের খোবি সোদ…’
পড়তে পড়তে যেন হাত কাঁপতে লাগল ছোটমশাইয়ের। মনে হল তিনি যেন আর দাঁড়াতে পারছেন না। মাথাও ঘুরতে লাগল। পাশে গোকুল ছিল, নায়েবুমশাই ছিল। তারা হঠাৎ ছোটমশাইকে ধরে ফেললে।
আর ওদিকে কলকাতার কেল্লার মধ্যে হলওয়েল সাহেবও রেডির তেলের আলোর সামনে কেদারায় বসে ডেসপ্যাঁচে লিখে চলেছে
… বাঙালি হিন্দুরা সব আমাদের পক্ষে আছে জানবেন। কলকাতায় এসে তাদের অবস্থাও ভাল করে দিয়েছি আমরা। তারা জানে আমরা তাদের টাকাকড়ি কেড়ে নিই না। দেনার দায়ে তাদের খ্রিস্টান করি না। কাজ করিয়ে ন্যায্য দাম দিই তাদের। বেগার দিতে হয় না এখানে। শহর তাই অনেক বেড়ে গিয়েছে। কারণ সবাই জানে আমরা শুধু এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য করতেই এসেছি। নবাবের মা আমিনা বেগমও আমাদের সঙ্গে মাল বেচা-কেনা করে। উমিচাঁদ আমাদের দলে। নদিয়ার রাজা কিষণচন্দর আমাদের দলে। সম্প্রতি মিরজাফর আলি খাঁ-কে কম্যান্ডার ইন চিফের চাকরি থেকে নবাব তাড়িয়ে দিয়েছে। এখন সেও আমাদের দলে চলে এসেছে। সেদিন আমি ব্যাঙ্কার মহাতাপ জগৎশেঠের বাড়িতে গিয়ে লুকিয়ে দেখা করে এসেছি। সেখানে হাতিয়াগড়ের রাজা হিরণ্যনারায়ণের সঙ্গে দেখা হয়েছে। সেও আমাদের দলে। তার ছোট রানিকে জোর করে নবাবহারেমে পাঠাবার জন্যে ডিহিদার পরোয়ানা পাঠিয়েছিল। তাই সেও আমাদের দলে যোগ দিতে রাজি হয়েছে। আগে কলকাতায় পাকা বাড়ি কেউ বানাত না, পাছে টাকা হয়েছে মনে করে কেউ কুনজর দেয়। এখন কিছু কিছু পাকাবাড়ি হচ্ছে। নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে রেভিনিউ আদায় হত চার হাজার টাকা। এখন বেড়ে সতেরো হাজারে উঠেছে। ট্যাক্স বাবদ আরও নব্বই হাজার টাকা আয় হচ্ছে। আমরা সইয়ে সইয়ে আদায় করছি। নবাবদের মতো জোরজবরদস্তি করি না। আমরা নবাবদের মতো কাফেরদের কাছ থেকে বেশি ট্যাক্স নিই না। আমরা মুসলমান-হিন্দু দু’দলকেই সমান চোখে দেখি। তাই আমাদের ওপর হিন্দুরা খুব খুশি। নবাবের যারা বিশ্বাসী আমির-ওমরাহ তারাও নবাবের ধ্বংসই চায়। এই বাঙালিদের স্বভাবই এইরকম। এদের কাউকে বিশ্বাস করা যায় না। তাই খুব সাবধানে কাজ করতে হচ্ছে। আমরা এদের বলেছি যে আমরা ব্যাবসাদার মানুষ, ব্যবসা করে টাকাকড়ি পেলেই খুশি, মসনদে কে বসবে তা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। এই বাঙালিরা এত বোকা যে এরা আমাদের সেই কথায় বিশ্বাস করেছে…
দুর্গা হঠাৎ দৌড়োতে দৌড়োতে আবার ঘরে ঢুকেছে, ঢুকেই হাঁপাতে লাগল।
মরালী বললে–কী হল দুগগাদি?
সর্বেনাশ হয়েছে রে। অতিথশালার দিকে যাচ্ছিলুম তোর বরকে ডাকতে, হঠাৎ এক কাণ্ড হয়ে গেছে–
কী কাণ্ড?
ছোটমশাই হঠাৎ মুর্শিদাবাদ থেকে বাড়ি ফিরে নায়েব কাছারির কাছে অজ্ঞান হয়ে গেছে বড় বউরানি তাই শুনে নীচেয় নেমে আসছে–
তারপর একটু থেমে বললে–তুই বোস চুপ করে, আসছি
বলে দুর্গা আবার দরজা বন্ধ করে বাইরে চলে গেল।
*
কী রে, তুই?
মতিঝিল থেকে বেরিয়েই হঠাৎ কান্তর সঙ্গে দেখা। বশির মিঞা কান্তর চেহারা দেখে অবাক হয়ে গেছে। চেহারা শুকিয়ে একেবারে চামড়া হয়ে গেছে।
তোর শাদি হয়ে গেছে? সেদিন যে শাদি করতে গেলি?
না ভাই, আমার দেরি হয়ে গেল যেতে, আর অন্য বরের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে তারা। কী করব আর, সেখান থেকে কলকাতায় গিয়েছিলাম। আমার সে চাকরিও নেই আর। তাই তোর খোঁজেই মুর্শিদাবাদে এলুম।
