কিন্তু এবারই প্রথম নিরুদ্দেশ হয়েছে সে। সেই মরালী।
বাবুদের পাঁচমহলা গড়বন্দি বাড়িতে সে এসে উঠল এবার। কেউ জানতে পারলে না। না মাধব ঢালি, না হরিপদ, না গোকুল, না শোভারাম, না উদ্ধব দাস, না কান্ত, না বশির মিঞা, কেউ নয়। মেহেদি নেসার, মনসুর আলি, হরিপদ, নয়ানপিসি, এমনকী ছোটমশাইও জানতে পারলে না। সবাই তখন ঘুমিয়ে অজ্ঞান অচৈতন্য।
হঠাৎ শেষ রাত্রের দিকে বড় বউরানি ছোটমশাইয়ের ডাকে দরজা খুলে দিলেন।
কী হল? তুমি? কখন এলে?
এই এখুনি। মিরজাফর আলির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ফিরিঙ্গি হলওয়েল সাহেবও ছিল সেখানে।
জগৎশেঠজি কী বললে?
ছোটমশাই বললেন সব কথা আমি খুলে বললুম। আমি একলা নয়, মিরজাফর সাহেবও তো রেগে আছে নবাবের ওপর, ওকেও সরিয়ে দিয়েছে কিনা নিজামত থেকে। সেই জায়গায় নিজের শালা মোহনলালকে করেছে সিপাহশালার
বউ বউরানি বললেন–সে তো হল, কিন্তু এদিকে পরওয়ানার কথা কী বললে?
জগৎশেঠজি সব শুনলেন। তারপর বললেন, এসব মেহেদি নেসারের কাণ্ড, নবাবকে বলব–
বউ বউরানি রেগে গেলেন। বললেন–নবাবকে বললে–কী হবে? কিচ্ছু হবে না, বললে–না কেন? যেনবাব ইয়ারবকশিদের কথায় চলে তাকে বলে কী লাভ হবে! পরের মেয়েমানুষের দিকে যাদের লোভ তাদের হাতে রাজ্য পড়েছে আজকেও তো ডিহিদার ফৌজের সেপাই পাঠিয়েছিল–
কী বললে?
কী আবার বলবে, সেই পুরনো পরওয়ানা।
–আমি মুর্শিদাবাদে গিয়েছি জানতে পেরেছে নাকি?
বড় বউরানি বললেন–নায়েব মশাইয়ের হাতে পরওয়ানা দিয়ে গেছে, মাধব ঢালিকে জিজ্ঞেস করেছিল ছোটমশাই কোথায় সে বলে দিয়েছে তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ, তখন নায়েব মশাইকে গিয়ে পরওয়ানাটা দিয়েছে–
আমি মুর্শিদাবাদে গিয়েছি তা কেউ জানে না তো?
না, কে আর জানবে! কেউ জানে না।
তা হলে এখন কী হবে?
তা হলে কী যে হবে তাই-ই ক’মাস ধরে ভাবছেন ছোটমশাই। আবওয়াব মাথ আর নজর–এর সঙ্গেই যা-কিছু সম্পর্ক নবাবের। প্রাসাদের সুখসুবিধের দায়িত্ব সব জমিদারদের। নবাবের তা দেখবার দরকার হয় না। দেখবার সময়ও নেই। ডিহিদার, ফৌজদার, পরগনাদার আছে বটে। কিন্তু সে তো শুধু নবাবের স্বার্থ দেখতে। জমিদারদের স্বার্থ দেখতে হবে তাদের নিজেদেরই। এক-একদিন খাতাপত্র সুদ্ধ তলব করেন খাজাঞ্চিমশাইকে। বলেন–বড়মশাইয়ের সময় যেমন সব চলছিল, তেমনই চলা চাই খাজাঞ্চিমশাই
জগা খাজাঞ্চি বলে কিন্তু তেমন যে আর চলছে না–এখন যে সব আইনকানুন বদলে যাচ্ছে। প্রজারাও যে সব একটু জো পেলে চলে যাচ্ছে কলকাতায়। সেখানে সব সেপাইয়ের কাজ দিচ্ছে ফিরিঙ্গিরা
তা নবাব-সরকারে নালিশ করেছ? আমাদের উকিল বরদা মজুমদারকে চিঠি লিখে দাও তুমি, কিংবা সুবেদারের কাছে নালিশ পেশ করতে বলো তাকে
খাজাঞ্চিমশাই বলে–তাতে কিছু হবে না
আগে হত আর এখন হবে না কেন?
শুনছি লড়াই বাধবে।
লড়াই!
হাতিয়াগড় থেকে সব খবর প্রথম দিকে পাওয়া যেত না। তারপরে যেবার মুর্শিদাবাদ গেলেন নজর-পুণ্যাহের সময়, সেখানে গিয়েই সব খবর পেলেন। ফরাসিদের সঙ্গে ইংরেজদের ঝগড়ার কথা শুনলেন। মিরজাফরের সঙ্গে নবাবের ঝগড়ার কথা শুনলেন। উমিচাঁদের ব্যাপার শুনলেন। ওয়াটস্ সাহেবকে নিজামতে ধরে নিয়ে এসে অত্যাচারের কথাও শুনলেন। তারপর নিজের পরওয়ানার কথাও জানলেন। ডিহিদারকে দিয়ে মেহেদি নেসারই এই কাণ্ড করিয়েছে।
ডাকলেন—গোকুল—
গোকুল পেছনেই ছিল। বললেন–যা তো, নায়েবমশাইকে একবার ডেকে নিয়ে আয় তো।
রাত তখন বুঝি পুইয়ে আসছে। বজরায় সারারাত ভাল ঘুম হয়নি। সমস্ত শরীরটা টনটন করছে।
ওদিকে অন্ধকার ঘরের মধ্যে রাত্রি তখনও আকাশ-পাতাল ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঝনাত করে চাবিতালার শব্দ হতেই দরজা খুলে গেল। দুর্গা বলল–ভয় পেয়েছিলি নাকি মুখপুড়ি? যখন বলেছি তোকে বাঁচাব তখন কোনও ভয় নেই তোর ছোট বউরানিকে তাই বললুম
মরালী জিজ্ঞেস করলে ছোট বউরানি কী বললে–শুনে? বললে, দেখিস দুগগা, যেন সব্বোনাশ না হয়, বউ বউরানি যেন জানতে না পারে। আমি বললাম আমি ঠিক সামলে নেব–এই নে, তোর জন্যে ছোট বউরানির কাছ থেকে শাড়ি চেয়ে নিয়ে এসেছি, চেলি ছেড়ে এইটে পর খাবি কিছু? খিদে পেয়েছে?
মরালীর তখন সত্যিই চোখে জল এসে গেছে। সত্যি, এমন করে কে তার কথা ভাবে? দুর্গা আবার বললে–এখুনি তোর বরকে তোর কাছে এই ঘরে এনে দিতে পারি, দেখবি? মরালী অবাক হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলে কী করে? কিন্নরসাধন করে। কিন্নরসাধন-মন্তর পড়লে তোর বর এখুনি এসে পড়বে এখানে–মরালী বললে–না দুগগাদি, তোমার দুটি পায়ে পড়ি। বরের কাছে আমি আর যাব না দুর্গা বললে–দূর, তোর ওবর কেন রে, সেই বর, সেই কলকাতার বর। দেখবি কিন্নরসাধন মন্তর পড়লেই সেই বর এসে একেবারে এই ঘরের মধ্যে হাজির হবে, এসেই তোকে প্রাণেশ্বরী বলে জড়িয়ে ধরবে। তখন দুজনে গলাগলি জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকবি
মরালী বললে–কিন্তু আমার বড় ভয় করছে দুগগাদি, যদি কেউ দেখে ফেলে
দেখতে পাবে কেমন করে? এ-ঘরে কি কেউ আসে? এ-দিক কেউ মাড়ায় না। খিড়কির পুকুরের দিকে এ-ঘর। এখানে চেঁচিয়ে বললেও কেউ টের পাবে না। তোকে আমি এখানে ভাত এনে দেব, তুই থাকবি খাবি ঘুমোবি–তোর বরও থাকবে তুইও থাকবি–
মরালী কী ভাবতে লাগল আবার।
