পাণ্ডুলিপিটা পড়তে পড়তে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সামান্য বাউন্ডুলে মানুষ উদ্ধব দাস। কেউই তাকে সেদিন চিনতে পারেনি। হয়তো মরালীও তাকে চিনতে পারেনি। হাতিয়াগড়ের ছোটমশাই, কৃষ্ণনগরের মহারাজাও তাকে চিনতে পারেনি শেষ পর্যন্ত। কিন্তু চিনেছিল বুঝি শেষপর্যন্ত শুধু বিদেশ থেকে আসা একজন বিধর্মী মানুষ!
বারান্দা দিয়ে ফিরে আসতে আসতে উদ্ধব দাস জিজ্ঞেস করেছিল–আপনি আমার জন্যে এত কষ্ট করছেন কেন প্রভু?
ক্লাইভ বলেছিল–তোমাকে তো আমি বলেছি পোয়েট, আমি তোমাকে ভালবাসি
কিন্তু প্রভু, আমি তো আপনাকে ভালবাসিনে!
তা না বাসো, আমার কিছু আসে যায় না। লোকে তো আমার কত নিন্দে করে। কেউ বলে, আমি অত্যাচারী, লোভী। আবার কেউ বলে, মেয়েমানুষের ওপর আমার নাকি দুর্দম লোভ। ফ্রেঞ্চরা আমাকে পেলে খুন করে ফেলে। ডাচরা আমার ওপর হাড়ে হাড়ে চটা, আমি সকলের শত্রু। এই যে নবাবকে আজকে এখানে হাতকড়া দিয়ে ধরে এনে বন্দি করে রেখেছে, তুমি কি ভাবো, মিরজাফর আলি তার। চেয়ে ভাল লোক?
উদ্ধব দাস বললে–আমি ওসব নিয়ে কিছু ভাবিই না প্রভু
তুমি না ভাববা, কিন্তু আমাকে তো ভাবতে হয় পোয়েট! আমি যে কাউকে ক্ষমা করি না। ভালর কাছে আমি ভাল, কিন্তু খারাপের কাছে আমি ডেথ। নবাবকে আজকের দরবারে আমার সামনে হাতকড়া বেঁধে হাজির করবে, আমি তাকে যে শাস্তি দেব তেমন শান্তি কেউ কখনও কাউকে দেয়নি পোয়েট
ভগবান শাস্তি না দিলে আপনি শাস্তি দেবার কে প্রভু?
ক্লাইভ বললে–ঠিক বলেছ পোয়েট, আমি নিজে ভগবানের কাছ থেকে যে শাস্তি পাই তার প্রতিকার করবে কে? জানো পোয়েট, রাত্তিরে আমার ঘুম হয় না
উদ্ধব দাস বললে–আমি কিন্তু খুব পেট ভরে ঘুমোই প্রভু
স্বপ্ন দেখো না?
স্বপ্ন? হ্যাঁ, স্বপ্ন দেখি প্রভু!
স্বপ্ন দেখো? তুমিও স্বপ্ন দেখো?
কেন প্রভু? স্বপ্ন তো সবাই দেখে!
ক্লাইভ এবার উত্তেজিত হয়ে উঠল যেন। বললে–তাসের স্বপ্ন দেখো? হা হ্যাঁ হ্যাঁ, তাস!
কেন, আপনি তাসের স্বপ্ন দেখেন নাকি প্রভু?
ক্লাইভ বললো হ্যাঁ পোয়েট, রাত্রে যখন দুটো চোখ সবে বুজে আসছে, ঠিক তখন একজন আমার ঘরে ঢোকে। ঢুকে আমাকে তাস দেখায়, কুইন অব স্পেড়–ইস্কাবনের বিবি। আমার ঘুম ভেঙে যায়, আমি চিৎকার করে উঠি! একদিন তোমার বউ আমার পাশের ঘরে শুয়ে ছিল। আমার চিৎকারে তার ঘুম ভেঙে গেছে, সে দৌড়ে এসেছে আমার ঘরে, সে কিছু বুঝতে পারলে না। আমি তাকে এক দাগ ওষুধ দিতে বললুম। সে আমায় ওষুধ দিলে তবে আমি আবার ঘুমোলুম!
কিন্তু সে কে প্রভু?
সাকসেস!
সাকসেস মানে কী প্রভু?
সাকসেস মানে এই যশ-খ্যাতি-জয়-ঐশ্বর্যবীর্য-টাকা-চাকরি-উন্নতি, এই সবকিছু মানুষের মূর্তি ধরে রাত্রে আমার কাছে আসে। কেন যে এত লোক থাকতে বারবার আমার কাছেই আসে তা জানি না পোয়েট! আমার মুনশিকে জিজ্ঞেস করেছি, তার কাছে আসে না, তোমার কাছেও আসে না। আমার দলের কাউকে আমি জিজ্ঞেস করিনি, কাউকে আমি কথাটা বলিনি। ইংলন্ডে আমার বাবাকে চিঠি লিখি, আমার বউ পেগিকে চিঠি লিখি। ইন্ডিয়ার সব কথা লিখে জানাই, তোমার কথাও তাদের লিখেছি, কিন্তু একথাটা জানাতে ভয় করে, তা হলে তারা আমাকে দেশে ফিরে যেতে বলবে–
চলতে চলতে নিজের মহলের কাছে এসে গিয়েছিল ক্লাইভ সাহেব। উদ্ধব দাসও পেছন পেছন আসছিল। বিরাট হাবেলি মনসুরগঞ্জ। মতিঝিলের দেখাদেখি তারই অনুকরণে নবাব আলিবর্দি খাঁ মির্জা মহম্মদের জন্যে তৈরি করে দিয়েছিলেন। বারান্দার পর বারান্দা, অলিন্দের পর অলিন্দ, খিলেনের পর খিলেন, চবুতরার পর চবুতরা।
সাহেব বারান্দা পেরিয়ে নিজের মহলের মধ্যে ঢুকল।
সামনে অর্ডার্লি মিলিটারি কায়দায় সেলাম করলে। মহলে ঢুকে প্রথমে বসবার ঘর। মাথার চারদিকে মখমলের চাদোয়া। তার চারপাশ থেকে পাতলা ঝালর ঝুলছে। তার চার কোণে আবার চারটে ঘর। সেই মহলেই আজ সকাল থেকে এত বেলা পর্যন্ত কেটেছে। এই বসবার ঘরে বসেই ক্লাইভ জগৎশেঠজির সঙ্গে কথা বলেছে, উমিচাঁদের সঙ্গে কথা বলেছে, মুনশি নবকৃষ্ণর সঙ্গে কথা বলেছে, মিরজাফর আলির সঙ্গে কথা বলেছে, মিরনের সঙ্গে কথা বলেছে, কিলপ্যাট্রিকের সঙ্গে কথা বলেছে।
কে?
উদ্ধব দাসকে বসবার ঘরে বসিয়ে রেখে ক্লাইভ নিজের শোবার ঘরে ঢুকেছিল। হঠাৎ মনে হল দেয়ালের ঝালরের আড়ালে কে যেন নড়ে উঠল। হাতের পিস্তলটা বাগিয়ে ধরলে সাহেব। স্পাই নয় তো! চারদিকে এত নজর রাখা হয়েছে, তবু কে ভেতরে এসে ঢুকল!
কে তুমি?
ঝালরটা একটু দুলে উঠল।
হু আর ইউ?
আস্তে আস্তে পিস্তলটা সামনে তাগ করে আরও এগিয়ে গেল সাহেব। যে ভেতরে ঢুকেছিল তার যেন গলা শোনা গেল এবার।
ওরা আমাকে ঠকিয়েছে! ওরা আমাকে..
ক্লাইভ ঝালরটা সরিয়ে ভাল করে তাকিয়ে দেখে অবাক হয়ে গেল।
তুমি? তুমি এখানে? আমি তো সব খবর শুনেছি, মাঝিরা আমায় সব খবর দিয়ে গেছে। তোমাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দেবার জন্যে এতক্ষণ তো আমি ওদের বলেছি, তুমি এখানে কী করে এলে?
মরালী কোনওরকমে বললে—পালিয়ে
কিন্তু কী করে পালিয়ে এলে? কেউ তোমাকে দেখতে পেলে না?
নেয়ামত আমার দরজায় চাবি খুলে দিয়েছে, আমি সকলকে লুকিয়ে তোমার কাছে চলে এসেছি, ওরা দেখতে পেলে আমাকে খুন করে ফেলবে!
আর নবাব?
কী জানি, সেই কথা বলতেই আমি এসেছি তোমার কাছে। আমি জানি এ সময়ে তুমিই একলা নবাবকে বাঁচাতে পারো। শুধু নবাব নয়, নবাবের পাশের ঘরে আমাদের হাতিয়াগড়ের ছোট রানিবিবি আছে, আর তার ঝি আছে, তাদেরও তুমি ছেড়ে দাও দয়া করে, ওদেরও ধরে নিয়ে এসেছে ওরা–
