ওদের কেন ধরেছে?
ভেবেছে ওরাও বুঝি নবাবের বেগম। ওদের জন্যে আমি অনেক করেছি, কিন্তু তবু ওদের শয়তানদের হাত থেকে বাঁচাতে পারলাম না। এই দেখো, ওরা আমার কী করেছে
মরালী তার শাড়ির আঁচলটা আলগা করে নিজের শরীরটা দেখালে।
ক্লাইভ জিজ্ঞেস করলে এসব কী? মরালী বললে–ওরা আমাকে আঁচড়ে দিয়েছে, কামড়ে দিয়েছে–এগুলো তোমাকে দেখাতে এসেছি, ওরা মানুষ নয়, জানোয়ার
কে করেছে? কারা?
ওই মিরদাউদ আর মিরকাশিম। সমস্ত শরীরে আমার ব্যথা হয়ে গেছে, আমি আর দাঁড়াতে পারছি না। ওরা আমাকে ঠকিয়েছে, ওরা বলেছিল নবাবকে আর রানিবিবিকে ওরা ছেড়ে দেবে, তাই ওদের হাতে আমি মদ খেয়েছিলুম, ওদের হাতে আমি…
মনে আছে, মরালীর কথা শুনে ক্লাইভের মুখটা লাল হয়ে উঠেছিল খানিকক্ষণের জন্যে। একদিকে মুর্শিদাবাদের নবাব, আর একদিকে মরালী। দু’য়ের মধ্যে পড়ে সেদিন সাহেব কী করবে বুঝে উঠতে পারেনি। রাগে শুধু থরথর করে কেঁপে উঠেছিল।
তারপর বলেছিল–তুমি চাও আমি নবাবকে ছেড়ে দেব? সত্যি তুমি তাই চাও?
শুধু নবাবকে নয়, আমাদের হাতিয়াগড়ের রানিবিবিকেও ছাড়িয়ে দাও। আর মতিঝিলে সেই যে তোমাকে বলেছিলুম আর-একজন মরিয়ম বেগম আছে, তাকেও তুমি ছাড়িয়ে দিয়ে এসো
আর তুমি?
মরালী বলেছিল–আমাকে তুমি আমার বাবার কাছে পাঠিয়ে দিয়ো, হাতিয়াগড়ে। আমি যেখান থেকে এসেছিলুম, সেখানেই আমি ফিরে যাব–
আর তোমার হাজব্যান্ড? তোমার স্বামী?
মরালী বলেছিল–আমার স্বামীর কাছে যাওয়ার মুখ আমি খুইয়েছি
কেন? কী হল তোমার?
মরালী সে-কথার উত্তর দেয়নি তখন। কী উত্তরই বা সে দেবে? আর ক্লাইভেরই বা সে-উত্তর শোনবার মতো সময় কোথায়? তখন সাহেবের মাথায় অনেক কাজের চাপ। উমিচাঁদের সঙ্গে হিসেবনিকেশের একটা ব্যাপার আছে। চেহেল্-সুতুনে দরবার করা আছে, জগৎশেঠের সঙ্গে ফয়সালা করতে হবে। অনেক অনেক কাজ। ইয়ার লুৎফ খাঁ, রাজা দুর্লভরাম আর জগৎশেঠের বাড়ির সামনে স্পাই রাখা আছে! যে-কোনও মোমেন্টে সমস্ত মুর্শিদাবাদ রিভোল্ট করতে পারে।
আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমার স্বামীকে এখানে আনছি।
আমার স্বামী?
হ্যাঁ, সেই পোয়েট—
বলেই ক্লাইভ বসবার ঘরে চলে আসছিল উদ্ধব দাসের কাছে। কিন্তু মরালী বাধা দিলে। বললে–না, না, তাকে ডেকো না, আমি নষ্ট আমি নষ্ট
তবু ক্লাইভ কথা শুনলে না দেখে মরালী আরও জোরে কেঁদে উঠল–ওগো, তোমার পায়ে পড়ছি, তাকে ডেকো না, আমি নষ্ট, আমি নষ্ট…
ক্লাইভ সেকথায় কান না দিয়ে বাইরের ঘরে আসতেই দেখলে, মেজর কিলপ্যাট্রিক আর সেই হাতিয়াগড়ের রাজা দাঁড়িয়ে আছে।
কর্নেল, মতিঝিলে গিয়েছিলাম। সেখানে মরিয়ম বেগম নেই।
হোয়াট?
ছোটমশাইয়ের মুখটা তখন কাদোকঁদো হয়ে গেছে। বললে–না হুজুর, আমার স্ত্রীকে দেখতে পেলাম না সেখানে!
কোনও বেগম নেই?
কিলপ্যাট্রিক বললে–আছে, যেসব বেগম সেখানে আছে, মিরন সবাইকে ডেকে ডেকে দেখালে। আমি সকলের নাম জিজ্ঞেস করলুম। পেশমন বেগম, গুলসন বেগম, বব্বু বেগম, তক্কি বেগম, আরও সব কত আছে। তা ছাড়া অনেক বাঁদিও আছে, কিন্তু মরিয়ম বেগম বলে কেউ নেই সেখানে
কিন্তু তা কী করে হয়?
ছোটমশাইও বললে–আজ্ঞে হ্যাঁ, আমিও তো তাই ভাবছি, তা কী করে হয়?
উদ্ধব দাস হাঁ করে দাঁড়িয়ে এদের কথা শুনছিল। কিছু বুঝছিল, কিছু বুঝছিল না।
ক্লাইভ হঠাৎ বললে–আচ্ছা দাঁড়াও, আমি এখনই আসছি
বলে ভেতরের ঘরে চলে গেল। মরালী তখনও সেখানে ঠিক সেইরকম করেই দাঁড়িয়ে আছে।
ক্লাইভ গিয়ে বললে–শোনো, মতিঝিলে মরিয়ম বেগম বলে কেউ নেই
কেউ নেই?
অন্য সব বেগম আছে, পেশমন বেগম, গুলসন বেগম, তক্কি বেগম, বব্বু বেগম–সবাই আছে, কিন্তু মরিয়ম বেগম বলে কেউ নেই–
মরালী বললে–কিন্তু নানিবেগমসাহেবা? ঘসেটি বেগমসাহেবা, আমিনা, ময়মানা, লুৎফুন্নিসা, তারা কোথায় গেল?
তা জানি না, আমি আমার মেজরকে পাঠিয়েছিলাম, সে নিজে গিয়ে সকলকে দেখে এসেছে
মরালী বললে–কিন্তু চেহেল্-সুতুনে? চেহেলসুতুনটা দেখেছে?
না। চেহেল্-সুতুনের মালখানার চাবি আমার কাছে আছে। আমি নিজে সেখানে যাব পরে।
তুমি এখনই কাউকে পাঠাও চেহেলসুতুনে, নইলে সবাইকে ওরা খুন করে ফেলবে। কিংবা কোথাও সরিয়ে ফেলবে। তুমি ওদের চেনো না, ওরা জানোয়ার, ওরা শয়তান, ওরা সব পারে–
ক্লাইভ বললে–তুমি থাকো, আমি আসছি—
বলে বাইরের ঘরে গিয়ে কিলপ্যাট্রিককে বললে–তুমি এখনই চেহেল্-সুতুনে যাও। শিগগির, মরিয়ম বেগমকে নিশ্চয়ই চেহেল্-সুতুনে রেখেছে ওরা–
কিলপ্যাট্রিকের সঙ্গে ছোটমশাইও চলে গেল।
উদ্ধব দাসের দিকে চেয়ে ক্লাইভ বললে–পোয়েট, এসো, আমার সঙ্গে ভেতরের ঘরে এসো, তোমার সঙ্গে তোমার ওয়াইফের দেখা করিয়ে দেব
*
মিরনের জীবনেও সে এক ভারী দুর্যোগের দিন গেছে। প্রথমে বুঝতে পারেনি যে ফিরিঙ্গিবাচ্চা ক্লাইভ তার চেয়েও শয়তান। মিরজাফর সাহেবের কাছে ধমক খেয়ে মেজাজটা বিগড়ে গিয়েছিল। কী করবে বুঝতে পারছিল না। মরিয়ম বেগমসাহেবা তো এতক্ষণ ভগবানগোলার দিকে পৌঁছে গেছে। এখন তাকে কী করে ফিরিয়ে আনবে, আর ফিরিয়ে আনবেই বা কেন? কার খেদমত করবে সে? কে ক্লাইভ? কোথাকার ফিরিঙ্গিবাচ্চা, তাকে কীসের এত খাতির। নবাব তো মিরজাফর সাহেব। মিরজাফর সাহেব তো মুর্শিদাবাদের মসনদে বসেই গেছে বলতে গেলে। তা হলে ক্লাইভের কীসের এত হক!
