মিরন সাহেব রেগে গিয়েছিল। বলেছিল–তা চাবি তুমি হাতছাড়া করলে কেন?
মিরজাফর সাহেব বললে–চাবি হাতছাড়া করব না তো কী করব?
তা হলে এখন যদি সব টাকাকড়ি নিয়ে নেয়?
তা নিলে আমি কী করব?
আমি যে তাদের অনেক কোশিস করে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রেখে দিয়েছি এতদিন।
মিরজাফর সাহেব রেগে গেল। বললে–তোর বুদ্ধিতে চললেই হয়েছে। তোকে যা বলেছি তুই। তাই বর
আমি তো দরবারের সব ইন্তেজাম করেছি। সব আমির-ওমরাওদের নেমন্তন্নের খত্ পাঠিয়েছি
জগৎশেঠজিকে বলেছিস তো?
বলেছি।
উমিচাঁদকে?
ওকে আর বলতে হয়নি। ও নিজেই তাগিদ দিয়ে দিয়ে আমার কাছ থেকে খত্ আদায় করে নিয়েছে।
আর ফিরিঙ্গি সাহেবদের?
ফিরিঙ্গি সাহেবদের কাউকে বাদ দিইনি। কিলপ্যাট্রিক, ড্রেক, ওয়াটসন, ওয়াট, সেপাইদের ভি কসবার ইন্তেজাম করেছি দরবারে।
মিরজাফর সাহেব তাতেও যেন খুশি হল না। জিজ্ঞেস করলে ওদের খাওয়াদাওয়ার বন্দোবস্ত ঠিক হচ্ছে? কোনও তফলিফ নেই তো?
মিরন বললে–সে তো সব মেহেদি নেসার আর রেজা আলির ওপর ভার দিয়ে দিয়েছি
ও শালারা সব চোর! ওই মেহেদি নেসারটাকে বিশ্বাস করিসনি। ওটা একবার এর দলে, আবার একবার ওর দলে থাকে, টাকা চুরি করতে পারে, নজর রাখবি চারদিকে
মিরন সাহেব চলে আসছিল, হঠাৎ মুখ ফিরিয়েই সামনে দেখে ক্লাইভ সাহেব। সঙ্গে উদ্ধব দাস।
মিরন ফিরিঙ্গিবাচ্চাকে দেখেই কুর্নিশ করলে আদাবরজ সাহেব, কিছু তকলিফ নেই তো হুজুরের?
মিরন দেখলে সাহেবের মুখটা গম্ভীর গম্ভীর। মুর্শিদাবাদে আসার পর থেকে এমন গম্ভীর মুখের ভাব আর কখনও হয়নি সাহেবের।
ক্লাইভ জিজ্ঞেস করলে–মিরজাফর কোথায়? হোয়ার ইজ মিরজাফর আলি?
ওই যে স্যার, ওই যে
থরথর করে কাঁপতে লাগল মিরন সাহেবের কলিজার ভেতরটা। ফিরিঙ্গি সাহেব বেজার হলেই তো সব গোলমাল হয়ে যাবে। মিরন সাহেবের নিজের ভবিষ্যত, মিরজাফর সাহেবের ভবিষ্যত নিয়ে তখন টানাটানি পড়বে।
সাহেবের গলা শুনেই মিরজাফর সাহেব তাকিয়া ছেড়ে উঠে এসেছেন।–কী হুজুর, কী হুকুম।
হঠাৎ যেন সাহেব ফেটে পড়ল। এমন করে রাগতে কখনও কেউ দেখেনি সাহেবকে।
কী হয়েছে বলুন না হুজুর! কী কসুর হয়েছে?
আমি কখন থেকে মরিয়ম বেগমসাহেবার খবর আনতে পাঠিয়েছি, এখনও কোনও ট্রেস নেই কেন? হোয়ার ইজ সি?
মিরজাফর সাহেব কথাটা শুনে লজ্জায় পড়ল। তাজ্জব ব্যাপার। যে-দিকে নিজে দেখবেনা সেই দিকেই গল। সাহেবকে এত খাতির করে ডেকে নিয়ে এসে শেষকালে একটা সামান্য মেয়েমানুষ ভেট দিতে পারছেনা! চেহেসূতুনে এত মেয়েমানুষ থাকতে কিনা আজ মেয়েমানুষের জন্যে সাহেব চটে গেল।
মিরজাফর সাহেব ক্লাইভের সামনেই তেড়ে গালাগালি দিয়ে উঠল, উল্লক, বেল্লিক, বেওকুফ, জাহান্নাম কাকুত্তা। আরও সব উর্দু ফারসি ভাষায় কী গালাগালি দিলে সব বোঝা গেল না। উর্দু ফারসি ভাষায় যে এত রকম চোস্ত গালাগালি আছে, আর বাপ হয়ে যে ছেলেকে এত গালাগালি দেওয়া যায় তাও বুঝি এর আগে কেউ জানত না।
মিরন কিন্তু একটা কথারও জবাব দিলে না। সব গালাগালি মাথা নিচু করে নিঃশব্দে হজম করে নিলে।
তারপর মিরজাফর সাহেব বললে–আপনি নিজের মহলে যান হুজুর, আমি মরিয়ম বেগমসাহেবাকে হুজুরের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি
সেদিন সেই মনসুরগদির মিরজাফরের মহলের খিলেনের তলায় দাঁড়িয়ে আর এক জালিয়াতির শরণ নিল মিরন সাহেব! শুধু মিরন সাহেবনয়, ইতিহাসও বুঝি মাঝে মাঝে এমনই জালিয়াতির আশ্রয় নেয়। যে-মরিয়ম বেগম মুর্শিদাবাদে নেই, যেমরিয়ম বেগমসাহেবাকে বজরায় তুলে দিয়ে জাহাঙ্গিরাবাদের দিকে পাঠিয়ে দিয়েছে, যে-মরিয়ম বেগমসাহেবা তখন বজরায় ছইয়ের তলায় বসে আকাশের দিকে চেয়ে আছে একদৃষ্টে, সেই মরিয়ম সাহেবার নাম করে আর এক জালিয়াতির জাল বোনা হল সেদিন মনসুরগদির বারান্দায় দাঁড়িয়ে।
ক্লাইভ সাহেব আর কিছু কথা বললে–না। উদ্ধব দাস পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তাকে বললে–চলে পোয়েট, চলো—
*
এ সেই যুগ যখন সারা হিন্দুস্থানে মানুষের বুদ্ধি-বিদ্যে-ক্ষমতার অবক্ষয়ের চিহ্ন পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। দিল্লির বাদশার ক্ষমতা আর নেই, রাজস্থানের রাজপুতদের ঘর ভেঙে গেছে। দক্ষিণের সুবাদাররা স্বয়ম্ভু হয়ে ওঠবার চেষ্টা করছে, মারাঠারা লুঠপাট করে ক্লান্ত, আর পূর্বপ্রান্তের এই জনপদে তখন নখ আর দাঁতের অস্ত্রে শান দেওয়া হচ্ছে সকলের চোখের আড়ালে।
ইতিহাসের সেই সন্ধিক্ষণে একটা মেয়ে হাতিয়াগড়ের মতো অখ্যাত এক জনপদ থেকে বেরিয়েছিল ঘটনাচক্রের অমোঘ বিধানে। তার বিদ্যে ছিল না, বুদ্ধি ছিল না, সহায়-সম্বল কিছুই ছিল না সেদিন। তারপর কেমন করে হিন্দুস্থানের রাষ্ট্রবিপ্লবের সঙ্গে একাত্মভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল তার ভাগ্য। চোখের সামনে ভাগ্য-বিধাতার পরিহাস দেখলে, ধর্ম-অধর্মের কলহ দেখলে। অর্থগৃধুতার চরম বিকাশ দেখলে, লালসার অনির্বাণ জ্বালানল দেখলে, তারপর একদিন সেই আগুনে আত্মাহুতি দিলে। এ সমস্তই মাত্র একটা জীবনের মধ্যে ঘটে গেল। এ বড় অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। আর উদ্ধব দাস তার দেখাকে নিজের দেখায় পরিণত করলে। মরিয়ম বেগমকে অমর করে রেখে গেল।
উদ্ধব দাস লিখে গেছে–একলিযুগ। কিন্তু সত্যযুগের মানুষ ছিল অন্যরকম। তখন মানুষের সাধনা ছিল মুক্তির সাধনা। অধ্যাত্মবাদের মধ্য দিয়ে মুক্তির সাধনাই ছিল তখন প্রধান কাজ। তারপর এল ত্রেতাযুগ। তখন এল ধর্ম। এল ক্ষত্রিয়। দুর্জনের হাত থেকে সত্যনিষ্ঠকে রক্ষার ধর্ম, পাপের হাত থেকে পূণ্যকে। তারপর এল দ্বাপর। দ্বাপরে ন্যায়ের মর্যাদা বাড়ল। সৎপথে অর্থ উপার্জন শুরু হল। এল বৈশ্য। অর্থের সদ্ব্যবহারে মানুষের সমৃদ্ধিসাধন হল। তারপর সকলের শেষে এল কলি। ক্রোধের ঔরসে আর হিংসার গর্ভে জন্ম হল কলির। ধর্ম-অর্থ-মোক্ষ কাম সব ভেসে গেল। এল ম্লেচ্ছ। স্বার্থের সঙ্গে স্বার্থের বিরোধ বাধল, দেশের সঙ্গে বিদেশের, মানুষের সঙ্গে মানুষের। যৌনক্ষমতা দিয়ে বিচার হল মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের। জয় হল দুর্জনের। প্রতিষ্ঠা হল পাপের।
