তখনও বুঝি ঘসেটি বেগমের ঘুম ভাঙেনি। নবাব-বেগমদের সকাল সকাল ঘুম ভাঙা যেন অপরাধ। আর সকাল সকাল ঘুম ভাঙবেই বা কেন? কীসের দায়? কিন্তু ঘুম ভেঙেছে নজর আলির। নজর আলি সত্যিই নজর আলি। মেয়েরা তার দিকে একবার নজর দিলে আর চোখ ফেরাতে পারে না। হুসেনকুলি খার চেয়েও সুন্দর দেখতে। চারদিকে নবাবি ফৌজের নিশানা টের পেয়েই ঘুম ভেঙে গেছে। তাড়াতাড়ি পিরেন-পায়জামা সামলে নিয়ে ঘসেটি বেগমকে ডাকতে লাগল–মেহেরুন্নিসা, মেহেরুন্নিসা
ঘসেটি ধড়ফড় করে উঠেই সব দেখে শুনে তাজ্জব হয়ে গেছে।
কী হবে এখন নজর? মির্জা তো সহজে ছাড়বে না।
ততক্ষণে নবাবি ফৌজ তোপ দাগবার জন্যে তৈরি হয়ে গেছে। মতিঝিলের আমলা-নোকর-নোকরানিরা সবাই ভয় পেয়ে যে-যেদিকে পারে দৌড়োচ্ছে।
মিরজাফরকে খবর দেব?
নজর আলি বললে–তাকে এত্তেলা দিলে কিছু হবে না, মোহনলালকে হাত করতে হবে। সে-ই তো এখন সেপাহশালার
তা হাত করো না, কত টাকা লাগবে মোহনলালকে হাত করতে?
নজর আলি জিজ্ঞেস করলে কত টাকা আছে তোমার কাছে এখন?
তা কি মনে আছে না গুনে রেখেছে ঘসেটি বেগম। তাড়াতাড়ি সিন্দুক খোলা হল। জাহাঙ্গিরাবাদের দেওয়ানি করা টাকা। শুধু টাকাই নয়, সোনা আছে, মুক্তো আছে, হিরে আছে, চুনি পান্না মতি সব আছে ঘসেটি বেগমের। সব তুলে নিলে নজর আলি। টাকাও নিলে গয়নাও নিলে। সব দিতে হবে মোহনলালকে। যে যা চাইবে তাকে তাই দিতে হবে। বারো লাখও হতে পারে পনেরো লাখও হতে পারে। সেই টাকা নিয়েই সেই ভোরবেলা বেরিয়ে গেল নজর আলি। বললে–আমি ফিরে আসছি মেহেরুন্নিসা বিবি, তুমি ঘাবড়িয়ো না–
সে নজর আলি তারপর আর আসেনি। ঘসেটি বেগম যাকে পেরেছে দু’হাতে টাকা বিলিয়েছে তার মতিঝিল বাঁচাবার জন্যে। কিন্তু মতিঝিল বাঁচেনি। আজও দুপুরবেলা মাঝে মাঝে বোধহয় তাই। মতিঝিলের চোখে তন্দ্রা নামে আর তার মধ্যে খাপছাড়া স্বপ্ন দেখে।
কৌন?
কোথায় যেন একটা গোলমাল উঠল। মতিঝিলের ঘরগুলোর মধ্যে যেন আর্তনাদ করে উঠল কেউ! মেহেদি নেসারের তন্দ্রা ভেঙে গেল। কৌন? কে? নজর আলি কি আবার ফিরে এল ফৌজ নিয়ে। দুপুরবেলার মতিঝিলে তো এত আওয়াজ হওয়ার নিয়ম নেই। তবে কি মির্জার ভাই শওকত জঙ? পূর্ণিয়া থেকে নবাবির খবর পেয়ে দৌড়ে এসেছে? নাকি কাশিমবাজার কুঠির ওয়াট। ফিরিঙ্গিদের পলটন নিয়ে সোজা গঙ্গা বেয়ে এসে হাজির হয়েছে মতিঝিলে।
নেশার মধ্যেই উঠে দাঁড়াল নেসার। মৌতাত এরা জমাতে দেবে না কেউ।
খোদাবন্দ!
মেহেদি নেসার চোখ তুলে দেখলে, মতিঝিলের সেপাইরা কাকে ধরে এনেছে। সমস্ত শরীর দিয়ে ঝরঝর করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। পেছনে পেছনে মতিঝিলের নোকর-নোকরানি বান্দা-খোঁজা সবাই এসেছে।
হুজুর, একে খুন করে ফেলেছি।
মেহেদি নেসার চিৎকার করে উঠল–কে এ? কী করেছিল?
হুজুর, এর নাম কাশেম আলি। লস্করপুরের তালুকদার। নিজামত আদালতে পেশক দিতে এসেছিল, চকবাজারের কাছে হুজুর আপনার পালকিতে জুতে দিয়েছিলেন, তাদের সঙ্গে সঙ্গে একেবারে মতিঝিলের অন্দরে ঢুকে পড়েছিল–মনে হচ্ছে মতলব খারাপ। সিঁড়ির নীচে লুকিয়ে ছিল, তাই কোতল করে দিয়েছি–
বেশ করেছিস! আচ্ছা করেছিস!
লোকটার দিকে আবার চাইলে মেহেদি নেসার। সারা শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। লোকটাকে ধরে জুতে দিয়েছিল পালকিতে। একটা কথা পর্যন্ত বলেনি, প্রতিবাদও করেনি তখন। এখন মনে হল যেন কথা বলতে চাইছে। যে-কথা হুসেনকুলি খাঁ বলতে চেয়েছিল মরবার সময়, সেই কথা বলবার জন্যেই যেন লস্কপুরের তালুকদার কাশেম আলিও নড়ে নড়ে উঠছে। তামাম বাংলা মুলুকের মুখের কথা একা সে-ই মরার আগে বলে যাবে।
ওরে, নড়ছে যে, কোতল কর, কোতল কর ওকে এখনও জিন্দা আছে–
আর নিজের চিৎকারে নিজেরই ঘুম ভেঙে গেছে মেহেদি নেসারের। মতিঝিলেরও ঘুম ভেঙে গেছে। চারদিকে লাল চোখ দিয়ে চেয়ে দেখলে মেহেদি নেসার। কেউ কোথাও নেই। এতক্ষণ কেবল স্বপ্ন দেখছিল তবে! মিছিমিছি ভয় পেয়ে গিয়েছিল মেহেদি নেসার। মুর্শিদাবাদের চেহেল্-সুতুন কায়েম হয়ে গেছে, মসনদও কায়েম হয়ে গেছে। ঘসেটি বেগম, মিরজাফর, ওয়াটস, ফিরিঙ্গি কোম্পানি, শওকত জঙ, সব খতম। এবার আর কীসের ভয়। কাকে ভয়? মেহেদি নেসার হল–শরবত
খিদমদগার হঠাৎ ঘরে ঢুকেছে–হুজুর, নবাবের তাঞ্জাম এসেছে—
২.০২ হাতিয়াগড়ের অন্ধকার
সেদিন সেই হাতিয়াগড়ের অন্ধকার ঘরের চারটে দেয়ালের মধ্যে গাঁয়ের একটি মেয়েই শুধু পালিয়ে আসেনি। পালিয়ে এসেছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রাণলক্ষ্মীও। মাঠে ঘাটে একদিন যে-লক্ষ্মী বায়ু হয়ে অগ্নি হয়ে জল হয়ে ঘরে ঘরে ক্ষুধা তৃষ্ণা কামনা বাসনা মিটিয়েছে, পৌষের শিশির হয়ে, বৈশাখের রৌদ্র হয়ে, নীড়ের শান্তি, গৃহকোণের স্নেহ, পিতার আশীর্বাদ, মায়ের বাৎসল্য, স্বামী-স্ত্রীর প্রেম হয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রাণরস জুগিয়েছে, তার বুঝি শেষ হল। একদিন ধর্মপাল-দেবপালের দেশে যে সূর্য উঠেছিল, বখতিয়ারের আবির্ভাবে সেই সূর্যই বুঝি মধ্য আকাশে ভাস্বর হয়ে উঠেছিল তারপর। তখনও মানুষকে ঘর ছেড়ে বেরোতে হয়নি। গৌড়ের সিংহাসনে বাংলার প্রাণলক্ষ্মী নিরাপদই ছিল সেদিন। পঞ্চাশ বছরের ইলিয়াস-শাহি বাদশা বাংলার বুকে অচল-অটল হয়ে বসে ছিল। হিন্দুদের হিন্দুত্ব বজায় ছিল, তবু গৌড়ীয় সুলতানদের তাতে কিছু এসে যায়নি। গঙ্গা যমুনার মধ্যে সপ্তগ্রামে এসে জাহাজ। ভিড়ত। তিন দিনারে দুগ্ধবতী একটা গোরু, এক দিরহামে আটটা মুরগি, দুই দিরহামে একটা ভেড়া। দুই দিনারে তিরিশ হাত মসলিন, আর নগদ একটা মোহর দিলে সুন্দরী একটি মেয়ে বাঁদি। যারা এখানে। এসেছে তারা সস্তার বহর দেখে অবাক হয়ে গেছে। এখানে চাঁদ উঠেছে রাত্রে আর ধানের খেতে বাড়ির চালে আর রাজার প্রাসাদে তা সমান হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। অম্বুবাচীর দিন সিদ্ধান্তবারিধিরা শাস্ত্রের নির্দেশ দিয়েছেন, রোজার দিন নির্দেশ দিয়েছেন মৌলানা-মৌলবিরা। হাঁচি কাশি টিকটিকি চামচিকে নিয়ে জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ নিষ্পন্ন হয়েছে নির্বিঘ্নে। শোক দুঃখ আনন্দ নিয়ে জীবন এগিয়ে গেছে অব্যাহত। কিন্তু তখনও প্রাণলক্ষ্মী চঞ্চল হয়নি। দোল দুর্গোৎসব চড়কের গাজনে বারবার উজ্জীবিত হয়েছে। বাংলার সেই প্রাণরস।
