কোথায় কোন একটা জায়গায় এসে জলুসটা যেন হঠাৎ থামল। মিরন সাহেবের গলা। যেন সবাই উদগ্রীব হয়ে আছে। আসামিরা না পালায়। আমরা পালাব কী করে? তোমরা কি আমাদের আস্ত রেখেছ? মানুষের ধর্মবিশ্বাস-অস্তিত্ব সমস্ত কিছু ধ্বংস করে তবে যে আমাদের পরিত্রাণ দেবে!
যে-ঘরটার মধ্যে মরালীকে ওরা পুরে দিয়েছিল সেটা বড় অন্ধকার ঘর। তার ওপর অন্ধকারের যন্ত্রণা। যন্ত্রণা শুধু অস্তিত্বের নয়, লজ্জার ধিক্কারের আর প্রবঞ্চনার যন্ত্রণা। তখনও যেন মরালীর ভাল করে বিশ্বাস হচ্ছিল না। আমি যা কখনও করিনি, তোমাদের জন্যে আমি তাই-ই করলুম, লজ্জা-শরম সবকিছু জলাঞ্জলি দিয়ে, হেসে হেসে তোমাদের ঠোঁটে মদ তুলে দিলুম, আর তোমরা আমাকে ঠকালে? হ্যাঁগা, ঠকালেই যদি তো এমন করেই ঠকাতে হয়?
পাশাপাশি সার সার ঘর। মিরন সাহেবের নিজের বাড়িতে তুলেছে সবাইকে। তার মধ্যে থেকে কখন যে লুৎফুন্নিসা বেগমসাহেবাকে নিয়ে গিয়ে মতিঝিলে তুলেছিল তা কেউ জানে না। মিরন সাহেবের কাজ অঙ্ক কষা নিখুঁত কাজ। বাঁদিদের রেখে দিয়েছিল, তাদের দিয়ে কোনও ভয় নেই। তারা কোনওদিন ছাড়া পেয়ে মসনদ চেয়ে বসবে না। তারা বাদির দল, যে মসনদে বসবে তার বেগমদের বাঁদিগিরি আবার তারাই করবে।
মিরদাউদ মিরন সাহেবকে পেয়েই বলে দিয়েছিল–খুব হুশিয়ার মিরনসাহেব, নবাবের পালিয়ে যাবার মতলব আছে
মিরন সাহেব বকের মতন ঘাড় বেঁকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল–কেন? নবাব কি কিছু বলছিল?
না, বলেনি, শুধু বলেছিল ছেড়ে দিতে, বলছিল আর কখনও মসনদের জন্যে লড়াই করবে না। বলছিল, যদি ছেড়ে দিই তা হলে জাহাঙ্গিরাবাদে গিয়ে বাকি জিন্দগিটা কাটিয়ে দেবে–
মিরন কথাটা শুনে বলেছিল–আচ্ছা, ঠিক আছে, বাকি জিন্দগিটা কাটাতে দিচ্ছি আমি
নবাবের বিচার হবে তো?
মিরন বললে–আলবত হবে।
কে বিচার করবে?
নবাব মিরজাফর আলি মহবত জঙ করবে। মুর্শিদাবাদের আলমগির করবে। নবাবের বিচার নবাবই করবে। ইনসানের বিচার ইনসান ছাড়া আর কে করবে?
তারপর একটু থেমে বললে–তা হলে সন্ধেবেলার দরবারে আসছেন তো ফৌজদারসাহেব? আসছি। মিরকাশিম সাহেবও আসবে তো?
হ্যাঁ হ্যাঁ হরগিজ আসবে। আমি এখন চলি, লুৎফুন্নিসা বেগমসাহেবাকে আমি মতিঝিলে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছি, কেউ যেন না জানতে পারে। লুৎফুন্নিসা বেগমসাহেবার কাছে কিছু গয়নাটনা ছিল না?
মিরদাউদ সাহেব একটু ঘাবড়ে গেল প্রশ্নটা শুনে। মিরকাশিম সাহেব সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল-না জবাব, কিছু ছিল না
তা হলে শুনেছিলাম যে নবাব অনেক মোহর-গয়না-জহরত সঙ্গে নিয়ে গেছে, সেগুলো সব কোথায় সরাল?
কে জানে কোথায় সরাল!হয়তো ধরা পড়বার ভয়ে গঙ্গার জলে ফেলে দিয়েছে। তাও হতে পারে।
আর এ-ঘরে দু’জন কারা?
মিরদাউদ বললে–ওরা নবাবের বাঁদি।
আর এ-ঘরে?
মিরদাউদ বললে–এ-ঘরে মরিয়ম বেগমসাহেবা।
মরিয়ম বেগমসাহেবা! মিরন সাহেব অবাক হয়ে চেয়ে রইল ফৌজদার সাহেবের দিকে। মরিয়ম সাহেবাকে যে এইমাত্র বজরায় করে জাহাঙ্গিরাবাদে পাঠিয়ে দিয়ে এল নিজে হাতে। মরিয়ম বেগমসাহেবা আবার এখানে আসবে কী করে?
হ্যাঁ জনাব, আমি বলছি মরিয়ম বেগমসাহেবা, আমি আর মিরকাশিমসাহেব দুজনে মিলে যে তার সঙ্গে নৌকোর ওপর মেহফিল করলুম
তার মানে?
মানে ফুর্তি করলুম, সরাব খেলুম। খাসা মাল জনাব। সফিউল্লা সাহেবকে খুন করেছিল, মনে নেই? তাই তার একটু বদলা নিলুম
বদলা নিলুম মানে?
মিরকাশিম সাহেব হেসে উঠল হোহো করে। বললে–আরে জনাব, একটু আয়েশ করলুম দুজনে মিলে; আপনি দেখছি সাটের কথা বোঝেন না! কিন্তু মাল খুব খুবসুরত জনাব, দেমাগ তর হয়ে গেছে কাল, একেবারে তর…
মিরন সাহেব তখন উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। বললে–আরে, একদম গল করেছেন জনাব, বিলকুল গল। মরিয়ম বেগমসাহেবাকে মেহেদি নেসার সাহেব চেহেল্-সুতুনে গ্রেফতার করে রেখেছিল, সেখান থেকে আমি তাকে মতিঝিলে নিয়ে গিয়েছিলুম, এখন তো একেবারে জাহাঙ্গিরাবাদে
তাই নাকি জনাব? তোবা! তোবা!
মিরদাউদ আর মিরকাশিম সাহেব ঘেন্নায় তোবা’ তোবা’ করে উঠল। ছি ছি, কাল সারারাত তা হলে দু’জনে মরিয়ম বেগমসাহেবা ভেবে বাঁদির সঙ্গে মেহফিল করেছে। বাঁদির ছোঁয়া মদের পেয়ালায় ঠোঁট ছুঁইয়েছে।
রাত্রের কথাগুলো ভেবে মিরদাউদ আর মিরকাশিম সাহেবের মনটা ঘেন্নায় রিরি করে উঠল। যাক, মনে মনে কান মুললে দুজনেই। এমন বেওকুফি আর কখনও করবে না ফৌজদার সাহেব। রাত্রের অন্ধকারে চেনা যায়নি, তাই অমন ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু বাঁদি হোক আর যাই-ই হোক, মাল খুবসুরত না?
কী বলল মিরকাশিমসাহেব, মাল খুবসুরত না?
বড় খুবসুরত জনাব, বড় আরাম দিয়েছে বাঁদিটা।
কিন্তু মিরন সাহেব তখন সেখান থেকে চলে গেছে। তার অনেক কাজ। বাঁদির সোহাগের কেচ্ছা শুনলে তো আর তার চলবে না। ফিরিঙ্গিবাচ্চার খেয়াল-খুশির একটা ফয়সালাও করতে হবে। তারও নজর পড়েছে মরিয়ম বেগমসাহেবার ওপর। তাকেও একটা বাঁদি দিয়ে বলতে হবে–এর নামই মরিয়ম বেগম।
সেখান থেকে সোজা চলে গেল মিরজাফর সাহেবের মহলে। কাল থেকে অনেক ঝক্তি গেছে মিন সাহেবের মাথার ওপর দিয়ে। কাজকারবার বন্ধ হয়ে রয়েছে শহরের। চেহেসতুনের মালখানার চাবি পর্যন্ত নিজের কাছে নিয়ে রেখেছে ক্লাইভ সাহেব। চাবি আর হাতছাড়া করছে না কিছুতেই
