কিলপ্যাট্রিক সাহেব এতক্ষণ ধরে সব বেগমদের দেখছিল। এত বেগম, এত জেনানা থাকে নবাবের। আর কী সব রূপ! এত বেগম নিয়ে নবাবরা কী করে? কার সঙ্গে কখন রাত কাটায়। বছরে তো নিশো পঁয়ষট্টি রাত, তার মধ্যে ক’জন করাত দেখতে পায় নবাবকে, ক’জন শুতে পায় নবাবের সঙ্গে।
মিরন বললে–আমার অনেক কাজ আছে সাহেব, আমি চলি; জলুস এসে গেছে। আপনাকে সব বেগমদের দেখালাম, আর বেগম নেই–
কিলপ্যাট্রিকের তখনও যেন বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি। বললে–আর ওরা কারা! ওদিকে?
ওরা সব বাঁদি, বেগমদের সঙ্গে বাঁদিদেরও নজরানা দেব।
কিলপ্যাট্রিক বললে–এদের সকলকে নজরানা দেবে? সব কর্নেল পাবে?–ওই বাঁদিরা?
বেগম দিলে বেগমদের বাঁদিদের দিতে হবে না? নইলে বেগমদের তরিবত করবে কে?
তারপর মিরন আর দাঁড়াল না। বললে–এবার আপনারা যা খুশি করুন সাহেব, আমার আর সময় নেই। আমি চলি, জলুস এসে গেছে, আমার এখন অনেক কাজ
ডিহিদার রেজা আলি, মেহেদি নেসার, তারাও মিরন সাহেবের পেছনে পেছনে চলে গেল।
*
ওদিকে মনসুরগদির মধ্যে তখন বাংলা মুলুকের ভাগ্যলিপি তৈরি হতে চলেছে। শুধু বাংলা মুলুকই বা কেন, সমস্ত হিন্দুস্থানের ভাগ্যলিপি। মুর্শিদাবাদের গঙ্গার ঘাটে যখন বজরাগুলো এসে লাগল তখনও মরালী নির্বাক নিশ্চল।তার খেয়ালই নেই কখন নৌকো এসে ঘাটে ভিড়েছে, কখন হাজার হাজার লোক তাদের নবাবকে দেখতে এসে ভিড় করেছে।
তখনও চিঁ চিঁ করে সে কোনওরকমে বলতে চেষ্টা করছে-হ্যাগো, তোমরা আমাকে ঠকালে?
কিন্তু মাঝিমাল্লা-সেপাইবরকন্দাজ সকলের হট্টগোলে তখন সে-আর্জি কার কানেই বা পৌঁছোবে? ইতিহাসের বইতে তো মরিয়ম বেগমসাহেবার নামই নেই। উদ্ধব দাস এই ‘বেগম মেরী বিশ্বাস’ কাব্য না লিখলে আমিও তো তার নাম জানতে পারতাম না। গাঁয়ের একটা নগণ্য মেয়ে, দিল্লি থেকে নাচতে আসেনি, নেচে গেয়ে চৌষট্টি কলার আকর্ষণ দেখিয়ে কাউকে হাতের মুঠোয় পুরে নবাবের পেয়ারের বেগমসাহেবা হয়নি। মরিয়ম বেগমসাহেবার উৎপত্তি বড় মামুলি। তাই হয়তো রিয়াজ-উস-সালাতিন-এর মুতাক্ষরীনে তার উল্লেখ নেই, গোলাম হোসেনের রোজনামচাতেও তার কোনও হদিশ নেই। তারিখ-ই-বাংলার পুঁথি খুঁজেও মরিয়ম বেগমসাহেবার কোনও নামোল্লেখ পাইনি।
এমনকী জর্জ ফরেস্ট, সি আই ই, যিনি ক্লাইভ সাহেবের অত বড় দু’ভলমের জীবনী লিখে গেছেন, তারও পাতাগুলো তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি। তারপর এই সেদিন, ১৯৬৩ সালে ছাপা মাইকেল এডওয়ার্ডস-এর লেখা বই ব্যাটল অব প্ল্যাসি’, তার মধ্যেও মরিয়ম বেগমসাহেবার নাম-গন্ধ খুঁজে পেলুম না। তার কারণ মরালী হারিয়ে গিয়েছিল ইতিহাস থেকে। ইতিহাসে এমন অনেক হারিয়ে যাওয়ার ইতিহাস আছে। তারা আড়ালে থাকে, আড়ালে থেকে তারা ইতিহাস তৈরি করে, কিন্তু শেষপর্যন্ত তারাই আড়ালে পড়ে যায়, তারাই অদৃশ্য হয়ে যায় চিরকালের মতো।
সেদিন মরিয়ম বেগমসাহেবারও তাই হয়েছিল।
মুর্শিদাবাদের গঙ্গার ঘাটে যখন সবাই নবাবের চরম দুর্দশা দেখতে ব্যস্ত, তখন অন্য বেগম বাদিদের মধ্যে মরালীর ঘোমটা-ঢাকা মুখটা কেউই দেখতে পায়নি। দেখতে চায়ওনি। ময়দপুরের ক্লাইভ সাহেবের কিনে দেওয়া সেই আড়ঙ-ধোয়া তাঁতের শাড়িটা পরে সেও দলের সঙ্গে ঘাটে নেমেছিল। সমস্ত শরীর তার তখন টলছে। ব্যথা হয়ে গেছে কোমরে, গায়ে, মাথায়। নখের আর দাঁতের লজ্জা শাড়ির ভেতরে লুকিয়ে রেখে মাথা নিচু করে হেঁটে হেঁটে চলেছে। শুধু মনে মনে বলেছে, পৃথিবীর সবাই তাকে কেবল প্রবঞ্চনাই করে গেল। কারও কোনও উপকারে লাগল না সে। সামনেই চলেছে নবাব মির্জা মহম্মদ। তার পেছনে লুফুন্নিসা বেগম। তার পেছনে শিরিনা। নবাবের মেয়েকে কোলে নিয়ে চলেছে। তার পেছনে দুর্গা আর ছোট বউরানি, আর তার পেছনে মরালী।
মিরন সাহেব একবার সামনে দেখে, আর একবার পেছনে। আসামিরা না ভাগে।
পেছনে ওটা কে রে?
চারদিকের ভিড় থেকে মানুষেরা কৌতূহলী প্রশ্নগুলো ছুঁড়ে মারে। কেউ চেনে না কাউকে। নবাবকেই তারা চেনে কেবল। আর সব অচেনা। চেহেল্-সুতুনের হারেমের ভেতরের মানুষদের চিনবেই বা কী করে! বাইরের কেউ তো কখনও দেখেনি তাদের। তাদের কথা দুরে থাক, আকাশের চন্দ্রসূর্যও কখনও তাদের সাক্ষাত পায়নি। কত বাঁদি কত বেগম চেহেল্-সুতুনের ভেতরে থাকে, কে তার খবর রেখেছে।
মিরদাউদ আর মিরকাশিম সাহেব সবার আগে আগে বিজয়ীর মতো বুক ফুলিয়ে এগিয়ে চলেছে। যেন তারাই এ-উৎসবের লক্ষ্য, আর সবাই গৌণ! অথচ কাল রাত্রের কথা কেউ জানে না। তাদের ফৌজ-পোশাকের আড়ালের মানুষটাকে দেখতে পাচ্ছে না কেউ। তাদের নখে আর তে যে এত ধার আছে তাও কেউ জানতে পারলে না। তবু তারাই আজ চেহেল্-সুতুনের দরবারে খেলাত পাবে, ইনাম পাবে।
মরালী একবার থমকে দাঁড়াল।
একটা চেনা গলার আওয়াজ কানে এল যেন। সেই বশির মিঞা। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল তার কথা সেই আর একজন। হয়তো এখনও সে চেহেলসূতুনের অন্ধকারের মধ্যে বোরখা পরে চরম হুকুমের প্রতীক্ষায় মুহূর্ত গুনছে। তুমি আমার জন্য নিজেকে বলি দিতে চেয়েছিলে, কিন্তু তুমি জানতেও পারলে না যে, আমাকে তুমি বাঁচাতে পারলে না। তুমি চেয়েছিলে আমি এই নবাব-মসনদ-আমির, এই বিলা-ঐশ্বর্য-বৈভব সমস্ত কিছু থেকে দূরে পালিয়ে গিয়ে শান্তির সংসার গড়ি স্বামীকে নিয়ে। যাতে আমি নিরাপদে থাকি তাই সমস্ত বিপদের বোঝা তুমি নিজের মাথায় তুলে নিয়েছিলে। কিন্তু তুমি জানতেও পারলে না যে আমি বাঁচিনি। ওদের নখের আর দাঁতের হিংস্রতায় আমি আজ নিঃশেষ হয়ে গেছি।
