ও-নৌকোর আড়াল থেকে দুর্গা বুঝি তখন হঠাৎ অন্ধকারের মধ্যেও সব দেখতে পেলে।
বললে–ও ছোট বউরানি, দেখো দেখো, মরুনির কাণ্ডটা একবার দেখো
ছোট বউরানি দুর্গার কথায় রেগে গেল। বললে–কী দেখব আবার
দুর্গা বললে–কী ইল্পতে কাণ্ড দেখো মরুনির, চরিত্তিরটা একেবারে নষ্ট করে ফেলেছে গো–ছি ছি ছি–
কী, করেছে কী?
দুর্গা বললে–আর করবে কী, বলে গেল আমাদের জন্যে বলতে যাচ্ছে, আর ওখানে গিয়ে মদ গিলে কিনা বেলেল্লাগিরি করছে মরদগুলোর সঙ্গে
কই, কোথায়?
দুর্গা বললে–ওই দেখো না–ওই যে পাটাতনের ওপর ন্যাংটো হয়ে রয়েছে–
ছোট বউরানি দেখলে, দুর্গা দেখলো দেখলে আকাশ বাতাস অন্তরীক্ষ, আর দেখলে অতীত বর্তমান ভবিষ্যত, আরও দেখলে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগের সেই সন্ধিক্ষণের ইতিহাস। দেখলে আর ঘেন্নায় মুখ ফিরিয়ে নিলে। বজরার উন্মুক্ত পাটাতনের ওপর তখন অসাড় অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে এক প্রাণলক্ষ্মী। বাংলা বিহার উড়িষ্যার সেই প্রাণলক্ষ্মীর হাড়-মাস মজ্জা সব শুষে খেয়ে নিয়েছে তখন মোগল সাম্রাজ্যের কাক-চিল আর শকুনের দল।
চিঁচিঁ করে মরালী তখনও অস্ফুট গলায় শুধু বলতে চেষ্টা করছে–হ্যাগো, তোমরা আমাকে এমন করে ঠকালে…
বজরা তিনটে তখন মুর্শিদাবাদের ঘাটের কাছে এসে পড়েছে
*
মতিঝিলের ফটকের সামনে আর পাহারা দেবার লোক কেউ নেই তখন। যারা ছিল তারা আগেই পালিয়েছে। এক এক করে সব বেগমসাহেবাদের খিড়কির ঘাটে গিয়ে তুলে দিয়েছে বজরায়। গুণে গুণে তুলেছে সবাইকে। কেউ বাদ না যায়। যারা নবাব মির্জা মহম্মদের আপনজন তাদের কাউকে আর রাখা হবে না মুর্শিদাবাদে। মুর্শিদাবাদের মসনদ মিরজাফর আলি সাহেবের জন্যে নিষ্কন্টক করে রাখতে হবে। মিরন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তার জড় তুলে ফেলেছে।
মেহেদি নেসার পঁড়িয়ে ছিল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার চারদিকে। রেজা আলি সাহেবও দাঁড়িয়ে দেখছে। এক এক করে গুণে গুণে তাদের বজরায় তুলেছে।
নানিবেগম।
ঘসেটি বেগম।
আমিনা বেগম।
ময়মানা বেগম।
লুৎফুন্নিসা বেগম।
হঠাৎ মেহেদি নেসারের খেয়াল হল–আর, নবাবের মেয়েটা কোথায় গেল?
মিরন বললে–থাক থাক, সেটা তো বাচ্চা, তাকে জাহাঙ্গিরাবাদে পাঠিয়ে ফয়দা নেই
তারপর সকলের শেষে আর এক জোড়া আড়ষ্ট পা দেখা গেল।
মিরন ভাল করে লক্ষ করে দেখলে। ফিরিঙ্গিবাচ্চা ক্লাইভের এত নেকনজর যার ওপর, সেইমরিয়ম বেগমসাহেবা! সফিউল্লা সাহেবকে খুন করেছিল। এ মুর্শিদাবাদে থাকলে আবার আগুন জ্বালাবে।
মিরন হুকুম দিলে জলদি কর, জলদি
বজরাগুলো তৈরি হয়েই ছিল। তারা কাছি খুলে দিলে। দাড়ের ঘায়ে জলের স্রোতে ছপাৎ করে শব্দ হল। বদর-বদর
মিরন মাঝিকে ডেকে বলে দিলে ভগবানগোলার দিকে ধীরে ধীরে নাও বেয়ে চলল, আমি পেছনে পেছনে যাচ্ছি
ওদিক থেকে জলুসের ভিড়ের শব্দকানে এল। মিরদাউদ আর মিরকাশিম সাহেবনবাব মির্জা মহম্মদকে ধরে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে আসছে। আর দেরি করা চলবে না। যে-বেগমরা মতিঝিলে পড়ে রইল তাদের সকলকে নজরানা দিতে হবে ক্লাইভ সাহেবকে। তখন তারা ক্লাইভ সাহেবের সম্পত্তি!
ফটকের কাছে আসতেই সোজাসুজি মেজর কিলপ্যাট্রিক সাহেবের সঙ্গে দেখা।
কী সাহেব, কী খবর?
মেজর কিলপ্যাট্রিক ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললে–এরই নাম হিরণ্যনারায়ণ রায়। হাতিয়াগড়ের জমিদার। কর্নেল হুকুম দিয়েছে মরিয়ম বেগমসাহেবাকে এর হাতে তুলে দিতে হবে।
ডিহিদার রেজা আলি একবার চেয়ে দেখলে ছোটমশাইয়ের দিকে। কিন্তু যেন চিনতে পারলে না।
ক্লাইভসাহেবের হুকুম?
ইয়েস!
কিন্তু ক্লাইভসাহেব বললে–তো আমি শুনব না। মিরজাফর সাহেবের হুকুমনামা আছে?
কিলপ্যাট্রিক বললে–মিরজাফরই তোমার কাছে পাঠালে।
মিরন একটু মিইয়ে গেল মিরজাফর আলি সাহেবের নাম শুনে।
কিন্তু সব বেগমদের যে আজকের দরবারে ক্লাইভসাহেবের সামনে হাজির করা হবে। তখন ক্লাইভসাহেব বেগমদের যার হাতে খুশি দান-খয়রাত করতে পারে
কিলপ্যাট্রিক বললে–না, তার আগে মরিয়ম বেগমসাহেবাকে এই জেন্টলম্যানের হাতে তুলে দিতে হবে, কর্নেলের অর্ডার।
অর্ডার! তবে অর্ডারই তামিল করো তুমি! যদি পারো মরিয়ম বেগমসাহেবাকে খুঁজে বার করে নাও। খুঁজে বার করে নিতে পারলে আমার আর আপত্তি নেই।
জলুসটা আরও এগিয়ে আসছে। আরও হাজার হাজার লোক জলুসের পেছন পেছন আসছে। ওদিক থেকে শোরগোল আসছে মানুষের। মুর্শিদাবাদের মানুষের আজ এক স্মরণীয় দিন। মুর্শিদাবাদের হর্তাকর্তা-বিধাতাকে আজ হাতকড়া বাঁধা অবস্থায় রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে আনা হচ্ছে।
মতিঝিলের ভেতরে তখন এক-একটা বেগমসাহেবাকে পরীক্ষা করে দেখছে ছোটমশাই। মিরন সঙ্গে সঙ্গে চলেছে। ঘরের পর ঘর, বেগমের পর বেগম। চেহেলসূতুনের কতদিনকার পোষা বেগম সব। কেউ কমবয়েসি, কেউ মাঝবয়েসি, কেউ বা যৌন পেরিয়ে বুড়ি হতে চলেছে। তবু চোখে সুর্মা দিয়েছে, হাতের আঙুলের নখে মেহেদি পাতার রং লাগিয়েছে। বাঁকা বাঁকা চাউনি, ওড়নির ফাঁকে ফাঁকে মুচকি হাসি–
এ কে?
এর নাম পেশমন বেগম।
আর এ?
বব্বু বেগম।
আর এ?
গুলসন বেগম।
আর এ?
তক্কি বেগম।
একটার পর একটা বেগমকে মিরন দেখাচ্ছে আর ছোটমশাই বলছে-না, এ তো নয়, এ তো ছোট বউরানি নয়। তার যে অন্য রকম চেহারা। সে যে আরও অনেক সুন্দরী, আরও অনেক ভাল দেখতে। মতিঝিলে যদি না থাকে সে তো কোথায় গেল! কোথায় গেলে তাকে পাওয়া যাবে! ছোট বউরানিকে না পাওয়া গেলে বড় বউরানির কাছে মুখ দেখাবে কী করে!
