আরে, বড়ি খুবসুরত মাল জনাব!
নেশার ঘোরে ফৌজদার আর মিরবকশিতখন একাকার হয়ে গেছে। মেয়েমানুষের নাম-গন্ধই বুঝি এইরকম৷ সব একাকার করে দেয়।
মরালী শাড়িটাকে আলগা করে দিয়ে শরীর থেকে আঁচলটা খসিয়ে দিলে। বললে–অনেকক্ষণ সরাব খাইনি মেহেরবান, বড় তেষ্টা পেয়েছে–একটু দেবেন বাঁদিকে?
বলে মিরদাউদ সাহেবের গা ঘেঁষে বসল।
মিরকাশিম সাহেব সরে গিয়ে মরালীর কাছে এগিয়ে গেল। বললে–আমার দিকেও একটু নেকনজর দাও বিবিসাহেবা, আমি কী কসুর করলুম!
মরালী দু’জনের দিকেই দুটো হাত বাড়িয়ে দিলে। বললে–তোমার দু’জনে মদের পেয়ালা তুলে দাও জনাব, আমি দু’জনের হাত থেকেই চুমুক দেব
দু’দিক থেকে দু’জনে দুটো পেয়ালা নিয়ে মরালীর ঠোঁটের সামনে এগিয়ে দিয়ে খাওয়াতে চাইলে। কিন্তু দু’জনেরই তখন নেশার ঘোর। হাত কেঁপে ঠোঁটে ঠেকাতেই চলকে পড়ে গেল মরালীর মুখে বুকে সারা শরীরে।
মরালী খিলখিল করে হেসে গড়িয়ে পড়ল।
তোমরা কী যে করো জনাব, মুখ তো আমার একটা, কাকে খুশি করি?
মিরকাশিমের বয়েস কম। সে একেবারে মরালীর গায়ের ওপর এসে বসল। বললে–আমাকে আগে আশরাফজাদি!
মিরদাউদই বা পেছিয়ে যাবে কেন। সেও গায়ে ঢলে পড়ে বললে–আমাকে আগে মেহবুবা
মজা দেখে মরালী হাহা করে হাসতে লাগল। হাসতে হাসতে গায়ের কাপড় খসে যেতে লাগল। মরালী যত আঁচল তুলে গায়ে ঢাকা দিতে চায় তত মিরদাউদ আর মিরকাশিম সাহেব তা টেনে নামিয়ে দেয়।
বড় আরাম হচ্ছে জনাব, বড় আরাম
মিরকাশিম সাহেবের রক্ত তখন মাথায় চড়ে গেছে। বললে–তোমার আরাম আমি আশমানে উঠিয়ে দেব আশরাফজাদি
তা হলে এক কাজ করো জনাব, এখানে আমার বড় লজ্জা করছে। বজরার ভেতরে নবাব রয়েছে, নবাবের জেনানা রয়েছে; ওদের হটিয়ে দাও।
নেশার যেমন মজাও আছে, তেমনি আবার একটা যন্ত্রণাও আছে। নেশার সময় সামনে সুন্দরী মেয়েমানুষ দেখতে পেলে মজার সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রণাটাও একটু যেন কমে যায়। যখন চোখে চাকরির উন্নতি জ্বলজ্বল করছে, তখন ফুর্তির নৌকো বাতাসে পাল তুলে দেয়। তখন মন বলে-কুছ পরোয়া নেই, সিরাজি পিলাও
মিরদাউদ সাহেবেরও তাই হয়েছিল। পেছনে যে সেপাইয়ের দল বন্দুক নিয়ে বজরা তিনটে পাহারা। দিচ্ছে তাদের কথা আর মনে পড়ল না। বজরার ভেতরে যে কয়েদি নবাব রয়েছে, তার বেগম, বাঁদি, লেড়কি রয়েছে, তাদের কথাও আর মনে পড়ল না।
বললে–নবাবকে হটাও—
নিরকাশিম সাহেব নেশার ঘোরে চেঁচিয়ে উঠল–নবাব কো নিকালো–নিকাল দো—
মিরদাউদ বললে–এসো আশরাফুজাদি, সিরাজি পিয়ো–
মরালী সঁতে দাতে চেপে ঠোঁটে মদের পেয়ালাটা ঠেকাল। তার মনে হল যেন একটা আগুনের ডেলা গলা দিয়ে নামতে নামতে একেবারে তলপেটে গিয়ে থামল।
তারপর শুরু হল লড়াই। শয়তানে-মানুষে নখে-াতে সেদিন সেই রাত্রির নিস্তব্ধতার আড়াল ছিঁড়েখুঁড়ে ছত্রখান হয়ে গেল। এতক্ষণ যারা আমিরের মুখোশ পরে আদবকায়দার ওড়নায় মুখ ঢেকে কথা বলছিল, এবার তাদের ভেতরকার আসল রূপ বেরিয়ে পড়ল। নখের আঁচড়ে আর দাঁতের কামড়ে মরালীর শরীরের নরম মাংসগুলো চিরকালের মতো দাগী হয়ে গেল।
মরালী একবার মুখ তুলে বলতে চেষ্টা করলে জনাব, তা হলে আমার নবাবকে তোমরা ছেড়ে দাও–আমাদের রানিবিবিকে ছেড়ে দাও
মিরদাউদ সাহেব তখন জানোয়ারের মতো কামড়ে ধরেছে মরালীকে। কথা বলবার আর উপায় নেই তার।
মরালী মিরকাশিম সাহেবের দিকে চেয়ে বলতে লাগল–তোমরা যে বললে–আমি তোমাদের সঙ্গে শুলে নবাবকে ছেড়ে দেবে, আমার রানিবিবিকে ছেড়ে দেবে?
মিরকাশিম সাহেব তখন লড়াইয়ের জন্য তৈরি করছে নিজেকে। আরও এক টোক মদ খেয়ে বললো– হ্যাঁ হ্যাঁ মেহবুবা, ছেড়ে দেব, কিন্তু তার আগে…
মরালী এবার কাঁদতে লাগল। বললে–কিন্তু কখন ছাড়বে? এখনই যে মুর্শিদাবাদ এসে যাবে আর যে সময় নেই।
চিল্লাও মাত আশরাফজাদি!
মানুষের ঈশ্বর বুঝি মানুষের দুর্যোগের দিনে মাঝে মাঝে এমনি করেই মুখ ফিরিয়ে থাকে। একদিন তাঞ্জামের মধ্যে চড়ে যখন রানিবিবি সেজে চেহেল্-সুতুনে এসেছিল মরালী, সেদিনও বুঝি এমন কাতর হয়ে ডাকেনি সেই মানুষের ঈশ্বরকে। সেই অভিমানে, সেই রাগেই বুঝি মুখ ফিরিয়ে রইল মানুষের ঈশ্বর! সেদিন তোমাকে ডাকিনি বলেই কি তুমি আজ এমন বিরূপ হলে ঠাকুর! হে ভয়ংকর, হে প্রলয়ংকর, আমার অন্তঃকরণের সমস্ত জাগ্রত শক্তির উদ্যত চেষ্টায় আমি যে আজ পাপ ধ্বংস করব বলে আত্মবলি দিচ্ছি। একে যদি পাপ বলো তো আমি পাপী, একে যদি কলঙ্ক বলো তো আমি। কলঙ্কিনী। তোমার উদ্যত কৃপাণের আঘাতে তুমি আমাকে টুকরো টুকরো করে দাও ঠাকুর, তবু আজ আমি এতটুকু প্রতিবাদ করব না। শুধু নবাবকে ছেড়ে দাও, আমার রানিবিবিকে ছেড়ে দাও। আমাকে নিয়ে তুমি ওদের মুক্তি দাও। ওদের মুক্তি হলেই যে আমি পরিত্রাণ পাব। ওদের শান্তি হলেই যে আমি মুক্তি পাব।
কই, ওগো আমার কথা রাখলে না তোমরা? আমাকে তোমরা ঠকালে?
দাঁত আর নখ তখন বোধহয় কামনায় উত্তাল উদ্দাম হয়ে উঠেছে। সুখে আর তখন তাদের সুখ নেই, টাকায় আর তখন তাদের আকাঙ্ক্ষা নেই। আলস্যে আর তখন তাদের বিশ্রাম নেই। তখন শুধু ভোগ। চুড়ান্ত ভোগের উপচার নিয়ে ভূরিভোজ তখন তাদের উত্তুঙ্গ হয়ে উঠেছে। ঈশ্বর সে তো ভাওতা, মোল্লাদের তৈরি ধোঁকা বেহেস্ত, সে তত বেবুদ, কোরানের তৈরি ইন্দ্রজাল। মেয়েমানুষই তখন একমাত্র সদাকত, মেয়েমানুষই তখন একমাত্র সচাই, মেয়েমানুষই তখন তাদের একমাত্র হক। আর সব কুছ ঝুটা হ্যায়।
