মরালী বললে–কিন্তু তার আর সময় নেই আলি জাঁহা, এখন অন্য কথা ভাবতে হবে। এখন কী করে আপনাকে ছাড়াতে পারি তাই ভাবছি
আমাকে ছাড়াতে পারবে, বেগমসাহেবা?
মরালী বললে–শুধু আপনাকে নয় আলি জাঁহা, হাতিয়াগড়ের রানিবিবিকেও কী করে মুক্তি দেওয়া যায় তাই ভাবছি
কী করে ছাড়াবে? যদি ছাড়াতে পারো তো আমার এই লুৎফা আর আমার এই ছোট মেয়েটাকেও ছাড়িয়ে দাও তুমি! আমার যা হয় হোক, ওদের জন্যে আমি ভাবছি
মরালী বললে–আমি সকলের কথাই ভাবছি আলি জাঁহা
লুৎফা নবাবের পায়ের কাছে এতক্ষণ চুপ করে শুয়ে ছিল, এবার মুখ তুলে বললে–না আলি জাঁহা, আপনি যেখানে থাকবেন আমি সেখানেই থাকব
মির্জা মহম্মদ রেগে গেল। বললে–তা আমি যদি জাহান্নমে যাই তো তুমিও জাহান্নমে যাবে?
লুৎফা উত্তর দিলে না সেকথার। নবাবের পায়ের ওপর মাথা গুঁজে আবার নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল।
মরালী বললে–তুমি কেঁদো না বহেন, আমি যতক্ষণ আছি, ততক্ষণ কোনও ভয় নেই—
মির্জা মহম্মদ হাসলে। বললে–বেগমসাহেবা, তুমি ওই মিরদাউদকে চেনো না, আর ওই মিরকাশিমকেও চেনো না, তাই ওই কথা বলছ
মরালী বললে–শয়তানকে কী করে বশে আনতে হয় তা আমি জানি আলি জাঁহা, নইলে শয়তান সফিউল্লাকে আমি খুন করতে পারি? আর যদি একটু সময় পেতাম তো ওই উমিচাঁদ আর মেহেদি নেসারকেও খুন করতুম, ওরা খুন হলে আর আজকে আপনার এই দুর্ভোগ হ্রত না
তারপর একটু থেমে বললে–তা হলে আমি এখন আসি আলি জাঁহা, দেখি কী করে হারামজাদাদের খুন করতে পারি।
সত্যিই তুমি ওদের খুন করতে পারবে বেগমসাহেবা? সত্যিই তুমি পারবে? আর যদি তা না পারো তো ওদেরও গিয়ে একটু বুঝিয়ে বলল, জীবনে কখনও আমি কারও পথে আর বাধা হয়ে দাঁড়ার না। যদি পারে আমাকে যেন একফালি জমি দেয়, আমি সেখানেই শেষ জীবনটা শান্তিতে কাটাব, আর কখনও কারও শান্তিতে ব্যাঘাত ঘটাতে আসব না। শুধু একফালি জমি–
মনে আছে, কথা বলতে বলতে সেদিননবার মির্জা মহম্মদের গলাটা বুজে এসেছিল। শুধু তানবাব নয়, রানিবিবির কথাও তো মনে ছিল মরালীর। যদি মুর্শিদাবাদে আসতেই হয় তো সকলের কথা ভেবেই আসতে হবে। একসঙ্গে সকলের ভাল করতেই চেয়েছিল মরালী। বাংলা মূলকের স্বার্থে না হোক, অন্তত চরম সর্বনাশ ঘটবার আগে কয়েকজনকে বাঁচাতে চেয়েছিল সে। সেদিন শুধু মনে হয়েছিল, এমন করে শেষ মুহূর্তে এমন সুযোগ তার হাতে আসবে কে জানত!
মনে মনে একবার বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের দেবতাকে উদ্দেশ করে বলেছিল আমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করো ঠাকুর। একদিন সংসারের সব সাধ, সব ঐশ্বর্যের লোভ ছিল আমার। তুমি আমার সেই স্মৰ সাধে ছাই দিয়েছ। চিরকালের মতো তুমি আমার মুখ পুড়িয়ে দিয়েছ ঠাকুর। সবই যখন গেছে ঠাকুর, তখন অন্তত একটা সাধ আমার মেটাও, একটা সাধ মিটিয়ে আমার মেয়েমানুষ-জন্ম সার্থক করো!
ততক্ষণে বুঝি বাইরের আকাশে চাঁদ উঠেছে। বড় নিরিবিলি রাত। এইসব রাতেই বুঝি মানুষের পাপের সাপ ফণা উঁচু করে ফোঁসফোঁস করে। এসব রাত বড় ভয়ংকর। এইসব রাত্রেই অষ্টাদশ শতাব্দীর আমির-ওমরাওরা ষড়যন্ত্রের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে উত্থানের স্বপ্ন দেখত। আঙুরের মদে চুমুক দিয়ে বেহেস্তের বাস্তব ছবি কল্পনা করে নিত। এইসব রায়েই সুন্দরী মেয়েমানুষের দরকার হত। মেয়েমানুষের শরীরের খাঁজে খাঁজে রোমাঞ্চের খোরাক খুঁজত!
মিরদাউদ আর মিরকাশিম। ফৌজদার আর মিরবকশি! বড় ক্ষোভ ছিল দু’জনের বরাবর। অবহেলার ক্ষোভ, অশ্রদ্ধার ক্ষোভ, নেকনজরের ক্ষোভ। কাল সকাল থেকে রাজমহল থেকে বেরিয়েছে। তারপর মুর্শিদাবাদে যাবে। সেখানে নতুন নবব মিরজাফর সাহেবের পায়ে মির্জা মহম্মদকে ইনাম দিয়ে তারিফ পাবে। আর সেই তারিফের স্বপ্নেই সন্ধে থেকে দু’জনে মদ খেতে শুরু করে দিয়েছিল।
সেপাইরা বজরার পেছন দিকে রয়েছে। আর সামনের দিকে দু’জন। মাথার ওপর চাঁদ। ভিজে ভিজে হাওয়া। মদের গরমে নদীর ভিজে হাওয়া শরীর জুড়িয়ে দিচ্ছিল। মরিয়ম বেগমসাহেবা নবাবের বজরার ভেতরে ঢোকার সময়েই দু’জনে লক্ষ করে দেখেছিল। বড় ভাজা, বড় খুবসুরত মনে হয়েছিল বেগমসাহেবাকে। যাক, ভেতরে যাক, নবাবের হাতে হাতকড়া বেঁধে দেওয়া আছে। বৃড় মুষড়ে পড়েছে নবাব। বড় কান্নাকাটি করছে। মদের নেশায় বড় ভাল লেগেছিল নবাবের আর্জি। হাহা করে হেসে উঠেছিল দু’জনেই। আরে, আমরা কী করব, আমরা তো নবারে নৌকর, যে যখন নবাব হরে আমরা তখন তারই হুকুম তামিল করব।
মিরকাশিম বললে–নবাব, নবাবের কী হবে?
মিরদাউদ বললে–কী আর হবে, ফাঁসি হবে—
ফাঁসি? ফাঁসি হলে কিন্তু খুব তামাশা হবে জনাব।
বলে আবার চুমুক দিলে মদের পেয়ালায়। ফাঁসি হলে কী রকম তামাশা হবে সেইটে যেন নেশার ঘোরে কল্পনা করতে ইচ্ছে হল মিরকাশিম সাহেবের।
হঠাৎ যেন সামনে ভূত দেখলে মিরকাশিম সাহেব। আরে, মরিয়ম সাহেবা যে সামনে এগিয়ে আসছে জনাব! বড়ি খুবসুরত আওরত তো
আইয়ে, আইয়ে বেগমসাহেবা!
মরালী দাঁতে দাঁত চেপে সামনে এগিয়ে আসতে লাগল। হে ঈশ্বর, একদিন অনেক দুঃখে, অনেক আঘাতে এই জগৎজোড়া শ্মশানের মধ্যে আমি পাপের পক্তি-ভোজে বসেছিলাম। সেদিন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমি অনেক দেখলুম। অনেক ভুগলুম, অনেক সইলুম। হয়তো আরও অনেক দেখতে হবে ভুগতে হবে, সহ্য করতে হবে। কিন্তু আজকের মতো এমন সুযোগ হয়তো আর কখনও আসবে না। আজ তুমি আমার সমস্ত পাপ পবিত্র করে দাও ঠাকুর, আজ তুমি আমার সমস্ত কলঙ্ক নিশ্চিহ্ন করে দাও। আজ আমি তোমার নাম করেই শয়তানদের কাছে নিজেকে আহুতি দিই–
