আমি হুজুর, আমি, হুজুরের শ্রীচরণের দাস, মুনশি নবকৃষ্ণ—
এখন নয় মুনশি, তুমি পরে দেখা কোরো।
উদ্ধব দাস বললে–ও লোকটা কে প্রভু? মাথায় মস্ত বড় টিকি রেখেছে
ক্লাইভ বললেও আর ওই উমিচাঁদ, ওরা সবাই টাকার দাস পোয়েট। ওরা আলাদা জাত, ওদের কাছে টাকাটাই সব, টাকার জন্যে ওরা আমার পেছনে পেছনে ঘোরে। সবসময় ওদের কাছে থাকতে ভাল লাগে না, সেই জন্যেই তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছি, তুমি চলো তোমার বউয়ের সঙ্গে তোমার দেখা করিয়ে দিয়ে আসি
বলে ক্লাইভ উঠল। পোয়েটও উঠল সঙ্গে সঙ্গে।
*
মরালী যেদিন ময়দাপুর থেকে নৌকায় করে বেরিয়েছিল সেদিন স্বপ্নেও ভাবেনি যে, আবার তাকে সেই দুর্দিনের লগে মুর্শিদাবাদেই ফিরে আসতে হবে; স্বপ্নেও ভাবেনি যে, আবার ছোট বউরানির সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে, কিংবা নবাব মির্জা মহম্মদের সঙ্গে অমন করে দেখা হয়ে যাবে।
নবাব মির্জা মহম্মদ শুধু একবার চাইলে মরালীর দিকে। কিন্তু মুখ দিয়ে কিছু কথা বেরোল না।
মরালী নবাবকে দেখেই বললে–এ কী আলি জাঁহা, এ কী হল?
লুৎফুন্নিসা বেগম নবাবের পায়ের ওপর মাথা দিয়ে শুয়ে পড়েছিল। বাঁদিটা একটু দূরে বসে আছে, তার কোলে লুৎফা বেগমের মেয়েটা ঘুমোচ্ছে।
মরালীকে দেখেই লুৎফা একটু নড়ে উঠল।
মরালী আবার বললে–এমন করে আপনার সঙ্গে দেখা হবে তা তো ভাবিনি আলি জাঁহা, আর এই অবস্থায়।
মির্জা মহম্মদ সেকথার উত্তর না দিয়ে শুধু বললে–তোমাকেও এরা ধরেছে মরিয়ম বেগমসাহেবা? তুমি কী দোষ করেছিলে?
আমার কথা ছেড়ে দিন আলি জাঁহা, কিন্তু আপনিই বা কী দোষ করেছিলেন?
মির্জা মহম্মদ বললে–আমার কথা বলছ? আমি কী দোষ করিনি তাই বলো আগে!
মরালী বললে–আমি কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না আলি জাঁহা, আমি নিজে সাক্ষী আছি, আপনি কারও কোনও ক্ষতি করেননি তো
না মরিয়ম বেগমসাহেবা, আমি অনেক অপরাধ করেছি। সব তো তুমি জানো না।
কিন্তু এমন কী অপরাধ করেছেন যার জন্যে আপনার এই শাস্তি?
মির্জা মহম্মদ বললে–আমি যে সংসারে জন্মিয়েই মহা অপরাধ করেছি বেগমসাহেবা। নবাব যেদিন ফৌজদার হয়েছে সেদিন জন্মিয়েই যে আমি অপরাধ করেছি। নবাব যে মুর্শিদাবাদের মসনদ দিয়েই আমাকে অপরাধী করে গেছে–
কিন্তু এখন কী করবেন আলি জাঁহা?
মির্জা মহম্মদ বললে–তুমি নিজের কথা ভাবো মরিয়ম বেগমসাহেবা। আমি ভেবেছিলাম তোমাকে হাতিয়াগড়ের রাজার কাছে পাঠিয়ে দিয়ে তবে যাব। ভেবেছিলাম তো অনেক কিছুই বেগমসাহেবা। ভেবেছিলাম, ল’সাহেব আজিমাবাদ থেকে ফৌজ নিয়ে এসে আমার সঙ্গে যোগ দেবে, তারপর নতুন করে একবার শেষ চেষ্টা করে দেখব, কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেল আমার বেগমসাহেবা, এখন দেখছ তো আমার এই দুটো হাত বাঁধা ।
মরালী বললে–কিন্তু আপনাকে ওরা চিনতে পারলে কী করে?
সেকথা আর এখন ভেবে কী হবে বলো?
কিন্তু এখন কি আর ছাড়া পাবার আর কোনও উপায় নেই?
মির্জা মহম্মদ বললে–আমার জন্যে তোমাদের সকলের দুর্ভোগ, আমি কেবল সেই কথা ভাবছি বেগমসাহেবা!
শুধু আমি একলা নই আলি জাঁহা, আমার সঙ্গে হাতিয়াগড়ের আসল ছোট বউরানিও ধরা পড়েছে
তার মানে?
মির্জা মহম্মদ যেন চমকে উঠল–তার মানে? তুমি তা হলে হাতিয়াগড়ের আসল ছোট রানিবিবিনও?
না
তা হলে তুমি কে?
আমি তার বদলা! আমি হাতিয়াগড়ের রাজবাড়ির নফরের মেয়ে। তাকে বাঁচাবার জন্যেই আমি তার বদলা হয়ে এসেছিলাম চেহেল্-সুতুনে। আমার আসল রূপটা কেউ জানত না চেহেল্-সুতুনে। ভেবেছিলাম, তাকে আমি নবাবের ইয়ারবকশিদের অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচাতে পেরেছি, কিন্তু আজ দেখলুম তা পারিনি। আজ দেখলুম, আমার বদলা হওয়া মিথ্যে হয়ে গেছে
মির্জা মহম্মদ খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। ইতিহাসের এক মহা-সন্ধিক্ষণে সে যেন মহা সমস্যায় পড়েছে। এতগুলো মানুষ, এত বড় মুলুক, সকলের যেন সর্বনাশ ঘনিয়ে এসেছে তার নিজের সর্বনাশের সঙ্গে সঙ্গে।
একটু পরে বললে–কিন্তু কেন যে আমি মসনদ মসনদ করে এত পাগল হয়েছিলুম কে জানে; তখন কি জানতুম, এই মসনদে এত জ্বালা?
তারপর হঠাৎ মরিয়ম বেগমসাহেবার দিকে চেয়ে বললে–তুমি আমার একটা অনুরোধ রাখবে বেগমসাহেবা? তোমার ওই দুটো হাত দিয়ে আমার এই গলাটা টিপে ধরতে পারবে? এমনভাবে টিপে ধরবে যাতে আমার দম আটকে আসে, যাতে আমি আর নিশ্বাস ফেলতে না পারি?
মরালী বললে–ছি আলি জাঁহা, আপনি না মুর্শিদাবাদের নবাব?
মির্জা মহম্মদ বললে–তুমি আর আমাকে লজ্জা দিয়ো না বেগমসাহেবা, আমি আজ আমার ফৌজদারের কয়েদি, এতেও আমাকে লজ্জা দিতে তোমার লজ্জা হচ্ছে না?
কিন্তু তা হলে আপনার জন্যে কী করতে পারি বলুন আলি জাঁহা?
একদিন তুমি আমাকে একজনের গান শুনিয়েছিলে, মনে আছে? সেই কবি?
কবি? ছড়া লেখে?
মির্জা মহম্মদ বললে–না না, ছড়া লেখে না, সেই যে গান গেয়েছিলেন–মা গো আমার এই ভাবনা, আমি কোথায় ছিলাম কোথায় এলাম, কোথায় যাব নাই ঠিকানা
মরালী বললে–রামপ্রসাদ সেন!
মির্জা মহম্মদ বললে–হা বেগমসাহেবা, সেই তার কথাই আমার বারবার মনে পড়ছে কাল থেকে, ভাবছিলাম তার মসনদ তো কেউ কেড়ে নেয় না, তার মসনদ নিয়ে তো কই এত লড়াই মারামারি হয় না, তার মসনদের জন্যে তো তাকে হাতকড়া বেঁধে কেউ ধরে নিয়ে যায় না তাই তাকে একবার দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল, তার গান একবার শুনতে ইচ্ছে করছিল
