সত্যিই হারিয়ে গেল তারা সেই সেদিনকার মুর্শিদাবাদের মানুষগুলো। হারিয়ে গিয়ে বেগম মেরী বিশ্বাসের পাতায় পুঁথি হয়ে রইল। কোথায়ই বা রইল সেই চেহেতুন যেখানে কর্নেল ক্লাইভ মিরজাফরের হাত থেকে এক-একটা করে এগারোটা বেগম নজরানা নিলে। কোথায় রইল সেইমনসুরগঞ্জ, সেই নিমকহারামের দেউড়ি, যেখানে ক্লাইভ সাহেব তার সেপাই বরকন্দাজ নিয়ে সেদিন এসে উঠেছিল।
ক্লাইভ সাহেব বলেছিল–চলল, তোমার বউয়ের সঙ্গে তোমার দেখা করিয়ে দিই পোয়েট!
উদ্ধব দাস বলেছিল–কিন্তু প্রভ, বউ যদি আমার সঙ্গে সেবারের মতো দেখা না করে?
কিন্তু তুমি কী দোষ করেছ বলোত পোয়েট?
উদ্ধব দাস বলেছিল–দোষগুণ তো মনের ভুল প্রভু, আমার কাছে যা গুণ আপনার কাছে তো তা দোষ হতে পারে। রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের নাম শুনেছেন প্রভু?
সে কে?
সেও একজন কবি প্রভু, সে লিখেছে–দোষ হইয়া গুণ হইল বিদ্যার বিদ্যায়। তাই তো বলি, দোষও কখনও গুণ হয় প্রভু, আবার গুণও কখনও কখনও দোষ হয়। মানুষের আদালত বড় বিচিত্র স্থান, কোনও নিয়মের ঠিক-ঠিকানা নেই সেখানে।
ক্লাইভ অবাক হয়ে গেল–তুমি এত কথা জানলে কী করে পোয়েট?
হরির কাছে প্রভু, হরিই আমায় সব জানিয়ে দেয়।
হরি? হরি কে? তোমার গড?
আমি যে ভক্ত হরিদাস প্রভু!
তার মানে?
আমি মানুষের মধ্যেই হরিকে দেখি, তাই তো আমার কোটি কোটি হরি প্রভু। আপনার মধ্যেও আমি হরিকে দেখি, আমার বউয়ের মধ্যেও আমি হরিকে দেখি। হরিকে খুঁজতে আমাকে তাই অরণ্যে যেতে হয় না প্রভু। আমার হরি লোকালয়েই থাকে
তা তোমার বউ যে তোমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে তাতে তোমার দুঃখ হয় না? আমার বউ যদি অমনি করে আমাকে তাড়িয়ে দিত তো আমি তো তাকে ডিভোর্স করতাম।
উদ্ধব দাস বললেহরি যদি আমাকে ত্যাগ করে তো আমি কি হরিকে ত্যাগ করতে পারি প্রভু? আমাকে তো লোকালয়ের সবাই ত্যাগ করেছে, কিন্তু আমি কি লোকালয় ত্যাগ করতে পেরেছি? আমি তো এই লোকালয়েই ঘুরে বেড়াই। কখনও আসি মুর্শিদাবাদে, কখনও মোল্লাহাটিতে, কখনও যাই কেষ্টনগরে, আবার কখনও হাতিয়াগড়ে
আচ্ছা, একটা কথা সত্যি বলবে?
সত্য বই মিথ্যা তো বলি না কখনও প্রভু।
তা হলে বলো তো, তোমার বউয়ের নাম কি মরালীবালা দাসী?
হ্যাঁ প্রভু, আপনি সঠিক বলেছেন।
কিন্তু তুমি কি জানো তোমার বউ এখন কোথায়?
না প্রভু, আমার জানবার আগ্রহ নেই।
তুমি কি তোমার বউকে দেখতে চাও?
প্রভু, আমি তো কাউকে ত্যাগ করিনি, বউই আমাকে ত্যাগ করেছে।
তা হলে তোমাকে বলি পোয়েট, তোমার বউ এখানেই আছে!
এই মুর্শিদাবাদে?
হ্যাঁ পোয়েট। আমার নিজের এখন সময় নেই। আমার অনেক ভাবনা মাথার ওপর, আমার নিজের শরীরও খারাপ পোয়েট। লোকে জানে আমি মস্ত বড় বীর, লোকে জানে আমি কোম্পানির কর্নেল, কিন্তু তারা জানে না আমার মতো কাওয়ার্ড আর দুটি নেই, তারা জানে না আমি ঘুমোতে ঘুমোতে ভয় পেয়ে জেগে উঠি–
উদ্ধব দাস বললে–কেন প্রভু, আপনার ভয় কীসের?
সাকসেসের ভয়, পোয়েট। এই অল্প কমাসের মধ্যে তিনটে দেশ জয় করেছি, এ কি সামান্য কথা পোয়েট? ক’জন কর্নেল এ করতে পেরেছে? আজ মিরজাফরসাহেব, মিরনসাহেব, জগৎশেঠজি, সবাই আমাকে এসে ফ্ল্যাটারি করছে, যেন ওদের চেয়ে আমি অনেক বড়। অথচ পোয়েট, আমি নিজে জানি আমি তোমার মতো গরিব, তোমার মতো সাধারণ; ওরা জানে না, যে এতগুলো দেশ জয় করলে, সে আমি নই, আমার ভূত।
বলছে কী প্রভু? ভূত?
হ্যাঁ পোয়েট, সেই ভূতটা মাঝে মাঝে আমার ঘরে ঢোকে, আমি যখন রাত্রে ঘুমোই তখন আমার ঘরে ঢোকে, আমাকে ভয় দেখায়, একটা তাস নিয়ে আমাকে দেখায়, কুইন অব স্পেস, যাকে তোমরা বলো ইস্কাবনের বিবি
ইস্কাবনের বিবি? কেন প্রভু?
হ্যাঁ, তোমার যদি সাকসেস হত পোয়েট তো তোমাকেও সেই ভূতটা ভয় দেখাত, তোমারও অসুখ করত। আমার মতো তোমাকেও ওষুধ খেতে হত
কেন প্রভু?
সে তুমি বুঝবে না পোয়েট! যার সাকসেস হয় তার ঘুম হয় না, তাকে ওষুধ খেতে হয়। তোমার বউ একদিন দেখেছে, একদিন আমাকে ওষুধ খাইয়েছে নিজের হাতে। সেই ওষুধ একটু বেশি মাত্রায় দিয়ে আমাকে সে মেরে ফেলতে পারত, কিন্তু তা সে করেনি। সেই জন্যেই তাকে আমি আমার কাছে রেখেছি, আর সেই জন্যেই আমি তোমাকে আমার কাছে ডেকে পাঠিয়েছি
উদ্ধব দাস চুপ করে বসে সব শুনছিল। বললে–তা আমাকে কী করতে হবে প্রভু?
তুমি আমার সঙ্গে চলো। আমি তোমাকে তোমার বউয়ের কাছে নিয়ে যাব। আজকেই এখানে সব ফয়সালা হয়ে যাক। মুর্শিদাবাদের মসনদেরও ফয়সালা হবে
উদ্ধব দাস বললে–আমার কী ফয়সালা প্রভু করবেন?
তোমার বউয়ের সঙ্গে তোমার মিল করিয়ে দেব।
উদ্ধব দাস হেসে উঠল–আপনি পারবেন?
আমি কী না পেরেছি পোয়েট? আমি যেমন ভাঙতে পারি, তেমনি আবার যে জোড়া লাগাতেও পারি। এইটেই ইতিহাসে লেখা থাকুক। বহুদিন পরে যখন এই মুর্শিদাবাদ নিয়ে ইতিহাস লেখা হবে, তখন অন্তত লোকে জানবে, আমি শুধু ভিলেন ছিলাম না, জানবে আমি একজন মানুষও ছিলাম, আমারও দুঃখ, কষ্ট, ব্যথা, ভয় সবই ছিল–আমিও আর সকলের মতো হেসেছি, কেঁদেছি, ভালবেসেছি, ঘৃণা করেছি, ভয় পেয়েছি, ভয় পেয়েও বুক উঁচু করে আবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছি
হঠাৎ দরজায় আওয়াজ হতেই ক্লাইভ চিৎকার করে উঠল–কে?
