মুনশি বাইরে যেতেই ক্লাইভ হেসে বললে–আচ্ছা পোয়েট, তুমি তোমার ওয়াইফের সঙ্গে দেখা করবে? তোমার বউ?
আমার বউ?
হ্যাঁ, মরালীবালা দাসী! সে এখন এখানে আছে
উদ্ধব দাস হাসল। বললে–এখানেই থাকুক আর যেখানেই থাকুক, সে কি আমার সঙ্গে দেখা করবে হুজুর? আমাকে তো সে দেখতে পারে না প্রভু।
সে দেখতে পারুক আর না-পারুক, আমি তার সঙ্গে তোমার দেখা করিয়ে দেব পোয়েট।
উদ্ধব দাস বললে–তাতে আপনার কী লাভ প্রভু?
লাভ? পোয়েট, লাভ-লোকসান জানি না, কিন্তু তোমাকে আমার এত ভাল লাগে কেন জানো? তোমাতে-আমাতে একটা মিল আছে।
সে কী বলছেন প্রভু? আমি তো একজন বাউন্ডুলে মানুষ।
ক্লাইভ বললে–তা হোক, এই তুমি যেমন ভালবাসা না পেয়ে পোয়েট হয়েছ, আমি তেমনই সকলের ঘৃণা পেয়ে পেয়ে সোলজার হয়েছি। আসলে তুমি আমি এক। আমার ইচ্ছে তুমি এবার একটু ভালবাসা পাও
তাতেই বা আপনার কী লাভ?
লাভ আছে বই কী পোয়েট। তোমার ওয়াইফের সঙ্গে যেমন তোমার দেখা হয় না, আমার ওয়াইফের সঙ্গেও আমার অনেকদিন দেখা হয় না। তুমি যদি তোমার ওয়াইফের ভালবাসা পাও তা হলে আমি আমার ওয়াইফকে চিঠি লিখব। লিখব, ইন্ডিয়াতে এসেও আমি আমার ওয়াইফকে কাছে পেয়েছি
উদ্ধব দাস বললে–কিন্তু তা হলে ছড়া লিখব কী করে? কাব্য লিখব কী করে?
তা তোমার পোয়েট্রিই তোমার কাছে বড় হল
? তা আপনার কাছে এই যুদ্ধও কি বড় হয়নি? কেন এ-দেশে লড়াই করতে এসেছেন প্রভ?
হঠাৎ অর্ডার্লি এসে খবর দিলে, একজন জমিদার দেখা করতে চান সাহেবের সঙ্গে।
কে? তার নাম কী?
অর্ডার্লি বলল–হাতিয়াগড়ের রাজা, হিরণ্যনারায়ণ রায়।
আচ্ছা, ভেতরে নিয়ে এসো।
ছোটমশাই ঘরে ঢুকল। দেখলে সেই পাগলটা বসে আছে। প্রথমে তার সামনে কথা বলতে একটু দ্বিধা হল। কিন্তু ক্লাইভ সাহেব অভয় দিলে। বললে–আপনাকে আমি আগে একবার দেখেছি
ছোটমশাই বললে–একবার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে আপনার কাছে গিয়েছিলাম। তখন আপনাকে আমার স্ত্রীর কথা একবার বলেছিলাম মনে আছে নিশ্চয়ই
আছে, বলুন?
এখন জগৎশেঠজির কাছে গিয়েছিলাম, তিনি আপনার কাছে আমাকে পাঠালেন। শুনছি, আজকের দরবারে যত বেগম আছে সকলকে আপনার কাছে নজরানা দেওয়া হবে।
কিন্তু আমি তো কিছু শুনিনি। কেন, নজরানা দেওয়া হবে কেন?
ছোটমশাই বললে–সেইটেই নবাবি কানুন, কিন্তু মতিঝিলে যে-সব বেগমসাহেবারা আছেন তার মধ্যে আমার সহধর্মিণীও আছেন, তার নাম এখানে মরিয়ম বেগম, আপনি তাকে উদ্ধার করে দিন
কিন্তু আপনি ঠিক জানেন যে, মরিয়ম বেগম আপনার ওয়াইফ?
আজ্ঞে হ্যাঁ সাহেব, আমি খুব ভাল রকম জানি!
আপনি আপনার ওয়াইফকে চিনতে পারবেন তো?
নিশ্চয় চিনতে পারব। আমি নিজের সহধর্মিণীকে চিনতে পারব না। আজ এত মাস ধরে আমি তার জন্যে ঘুরে বেড়াচ্ছি চারদিকে
ক্লাইভ কিলপ্যাট্রিককে ডাকলে। ডেকে বললে–এঁকে মিরজাফর সাহেবের কাছে নিয়ে যাও, নিয়ে গিয়ে বলল মতিঝিলে এর ওয়াইফ আছে, তার নাম মরিয়ম বেগম, এর হাতে যেন তাকে তুলে দেয়, বলো এটা আমার হুকুম
ছোটমশাইকে নিয়ে মেজর কিলপ্যাট্রিক বাইরে চলে গেল।
২.১৮ মরিয়ম বেগম
চেহেতুন আবার বহুদিন পরে সাজানো-গোছানো হচ্ছে। সন্ধেবেলা দরবার বসবে। মুর্শিদাবাদের তাবৎ আমির-ওমরাও আসবে দরবারে। ফিরিঙ্গি কোম্পানির ক্লাইভ সাহেব এসে ওই মসনদে বসবে। জগৎশেঠজি আসবে, ইয়ার লুৎফ খা আসবে, রাজা দুর্লভরাম আসবে, মিরজাফর সাহেব আসবে, মিরন সাহেব আসবে, মেহেদি নেসার, মনসুর আলি মোহর আসবে, মিরদাউদ, রেজা আলি ডিহিদার, মিরকাশিম সাহেব আসবে।
ইনসাফ মিঞা আবার নহবত নিয়ে বসেছে।
ছোটে শাগরেদ বললে–ওস্তাদজি, কোন রাগ বাজাব?
ইনসাফ মিঞার যেন আর নহবত বাজাবার মেজাজ নেই। আর যেন নহবতে ফুঁ দিতে ইচ্ছে করছে না। বললে–কী বাজাব?
ছোটে শাগরেদ বললে–আলিবর্দি সাহেব যেবার মসনদে বসেছিল, সেবার যেটা বাজিয়েছিলে, সেই রাগটা বাজাও
ওদিকে মতিঝিলের পেছন দিকে গঙ্গা যেখানে বেঁকে গেছে সেইখানে ছ’টা বজরা সার সার দাঁড়িয়ে ছিল। মতিঝিলের খিড়কির ফটক দিয়ে বোরখা-পরা এক-একটা মূর্তি বেরিয়ে এল খোলা আকাশের নীচে। তরতর করে বয়ে চলেছে গঙ্গার স্রোত। স্রোতের টানে ছলাত-ছলাত করে জল চলকে উঠছে বজরাগুলোর গায়ে লেগে। এক-একজন বেগম এক-একটা বজরায় গিয়ে উঠল।
পাশে দাঁড়িয়ে ছিল মিরন সাহেবের লোক। আর খানিক দূরে তদারক করছিল মিরন সাহেব নিজে। মনে মনে হিসেব ঠিক রাখছিল।
নানিবেগম!
ঘসেটি বেগম!
আমিনা বেগম।
ময়মানা বেগম।
লুৎফুন্নিসা বেগম!
সকলের শেষে আর এক জোড়া আড়ষ্ট পা দেখা গেল। মিরন ভাল করে লক্ষ করে দেখলেহ্যাঁ, যার ওপর ফিরিঙ্গিবাচ্চা ক্লাইভের এত নেকনজর, সেই মরিয়ম বেগম। সেই মরিয়ম বেগমও জাহাঙ্গিরাবাদে চলে গেল।
.
মুর্শিদাবাদের সেই দিনটা, সেই তারিখটা, সেই তিথিটা, সে বড় ভয়ংকর। যারা একদিন সূর্যের মুখ দেখলে আইনভঙ্গ হত, যারা চেহেল সুতুনের অন্ধকার ভুলভুলাইয়ার ধাঁধায় নবাবের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে গিয়ে ইচ্ছে করে হারিয়ে যেত, তারাই আবার সেদিন প্রখর সূর্যের আলোর তলায় চিরকালের মতো আইন ভাঙল, চিরকালের মতো উদ্ধব দাসের মতো তুলোট কাগজের পুঁথির পাতায় হারিয়ে গেল৷
তাই মনে হয় উদ্ধব দাস বুঝি সবই দেখেছে। যা নিজের চোখে দেখেনি তাও দেখেছে, যা মেরী বিশ্বাসের কাছ থেকে শুনেছে তাও দেখেছে। তার দেখা আর শোনার ব্যবধান ঘুচিয়ে সে এক মহাকাব্য লিখে গিয়েছে।
