কী জানি, এত বেগম এত বদি, কে হিসেব রাখে ভাইসাহেব, কার ঘাড়ে কটা মাথা আছে বলো?
তারপর একটু থেমে বললে–চলো না, মতিঝিলে যাই, বেগমূসাহেবাদের নিয়ে সবাইকে জাহাঙ্গিরাবাদে পাঠিয়ে দিই। লেকেন, যা করতে হবে, আজই করতে হবে–
মেহেদি নেসার কী যেন ভাবলে। ডিহিদার রেজা আলিরও ভারী আগ্রহ। দু’জনেই দুজনের দিকে চাইলে। মিরন সাহেবেরও অনেক কাজ। ওদিকে নবাব আসছে চকবাজারের রাস্তা দিয়ে জুলুস করে। তারও একটা হিল্লে করতে হবে। কিন্তু তার আগে বেগমসাহেবাদেরও একটা কিছু ব্যবস্থা করতেই হবে। শুধু তাদের কয়েদ করলেই হবে না। একেবারে পদ্মা পার করে জাহাঙ্গিরাবাদে পাঠিয়ে দিলেই নিশ্চিন্ত। নানিবেগমসাহেবা, ঘসেটি বেগমসাহেবা, সকলের সব আশা নির্মূল করে দিতে হবে। যাতে আর কখনও কেউ মুর্শিদাবাদের মসনদের ওপর হাত বাড়াতে না পারে।
তারপর তিনজনেই মনসুরগঞ্জ থেকে বেরোল। বড় শক্ত কাজ। শুধু জাহাঙ্গিরাবাদে পাঠালেই হল । নৌকোর ব্যবস্থা করতে হবে, বজরার ব্যবস্থা করতে হবে। সব বেগমসাহেবাদের ভুলিয়ে-ভালিয়ে পটিয়ে-পাটিয়ে পাঠাতে হবে।
চলো, জনাব, তাই চলো। ও রোগের জড় না রাখাই ভাল।
.
মুর্শিদাবাদের ইতিহাসে সে একদিন গেছে বটে। সে এক মহা দুর্দিন। হাটে দোকানিরা আসেনি। দোকানপাট বন্ধ করে রাস্তায় তামাশা দেখতে বেরিয়েছে। তামাশাই বটে। রাষ্ট্র নিয়ে তামাশা, জীবন মৃত্যু নিয়ে তামাশা। একদিন সামান্য একটা ছোট্ট স্ফুলিঙ্গ কেমন করে কোন ফাঁকে উড়ে এসে পড়েছিল মুর্শিদাবাদের নবাবি মসনদে, আর সেইটুকুই সেদিন সকলের অজ্ঞাতে হঠাৎ দাউদাউ করে সারা শহরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
মিরন সাহেব সব ব্যবস্থাই করে রেখেছিল। কোথায় নবাব মির্জা মহম্মদকে এনে রাখা হবে, কোথায় তার বেগম বাদিদের রাখা হবে তারও ব্যবস্থা আগে থেকে করে রেখেছিল মিরন সাহেব। ভারী পাকা লোক মিরজাফর আলি সাহেবের ছেলে। অনেকদিন পরে সুযোগ এসেছে এমন। এমন সুযোগ দৈবাৎ কখনও আসে আল্লার দোয়ায়। আল্লা সুযোগ দেয়, কিন্তু বুদ্ধিমানেরা সে-সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। যে সদ্ব্যবহার করে সেই-ই পুরুষসিংহ। চুপ করে ঘরে বসে থাকলে কেউ তোমার মুখে ভাত তুলে দেবে
এতদিন পরে সেই সুযোগই এসেছে।
বিকেলবেলা দরবার বসবে চেহেলসূতুনে। সেখানে মুর্শিদাবাদের আমির-ওমরাওরা সব আসবে। লোক পাঠিয়ে সব খবর দেওয়া হয়ে গেছে। ক্লাইভ সাহেব তৈরি হয়েই ছিল। অনেকবার মিরজাফর সাহেবের কাছে তোক গেছে খবরটা আনতে। শেষকালে আর থাকতে পারলে না। আবার লোক পাঠালে। সেবার মিরজাফর সাহেব নিজে এসে হাজির।
আমি ছেলেকে পাঠিয়েছি হুজুর, ছেলে ফিরে আসেনি।
ক্লাইভ বললে–সেই মরিয়ম বেগমসাহেবার কী হল?
মিরজাফর বললে–তার ব্যবস্থা করতে বলেছি
কী ব্যবস্থা?
বলেছি তাকে ছাড়িয়ে এনে আপনার কাছে হাজির করতে।
ক্লাইভ বললো, হ্যাঁ তাকে আমার কাছে এনে হাজির করা চাই-
-শেষকালে অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করে করেও যখন মরিয়ম বেগমসাহেবার কোনও খবর এল তখন আর অপেক্ষা করা চলল না। ক্লাইভের মনে হল নিশ্চয় এদের কোনও মতলব আছে। শুধু মতলব নয়, একটা কিছু ষড়যন্ত্রও হয়তো চলছে তার বিরুদ্ধে। মেজর কিলপ্যাট্রিক এসেছিল একবার। তাকেও জিজ্ঞেস করলে–কী রকম হালচাল বুঝছ কিলপ্যাট্রিক?
কিলপ্যাট্রিক বললে–আমি কিছু বুঝতে পারছি না–
তা হলে যদি তেমন বোঝো তুমি তৈরি হয়ে থাকো। দরকার হলে আমাদের আর্মিকেও রেডি রাখতে হবে। মিরজাফরকে বিশ্বাস নেই। ওর ছেলেটা আরও শয়তান, সে মনে করে আমরা বুঝি ওদের কান্ট্রিতে ট্রেসপাস করেছি, ওদের থ্রোন কেড়ে নিতে এসেছি
কিন্তু অতটা সাহস কি হবে ওদের?
কাইভ জিজ্ঞেস করলে চেহেল্-সুতুনের হারেমের মালখানার চাবিটা কোথায়? মিরন তোমায় দিয়েছে?—
কিলপ্যাট্রিক বললে–হ্যাঁ, এই যে
চাবিটা নিজের কাছে রেখে দিলে ক্লাইভ। তারপর বললে–দেখো, এখন কাউকেই বিশ্বাস নেই। সবাই জেনে গেছে যে, মঁসিয়ে ল’ আর্মি নিয়ে রাজমহল পর্যন্ত এসেছিল, তারপর যখন দলে যে, নবাব অ্যারেস্টেড হয়ে গেছে, তখন আবার ফিরে গেছে। উমিচাঁদ কোথায়?
কিলপ্যাট্রিক বললে–আমার কাছে এসেছিল, টাকা চাইছিল
বেশি আমল দিয়ো না ওকে। লোকটা স্কাউড্রেল। আমি ঘর থেকে বার করে দিয়েছি। তোমার স্পাইদের বলে দাও যেন জগৎশেঠ, ইয়ার লুৎফ খাঁ আর দুর্লভরামের বাড়ির সামনে নজর রাখে।
কিলপ্যাট্রিক চলে যাচ্ছিল। ক্লাইভ আবার ডাকলে। বললে–মুনশি আসছে না কেন? মুনশি কোথায় গেল একবার টাউনে খোঁজ নিতে লোক পাঠাও তো? তাকে একটা কাজে পাঠিয়েছি–
হঠাৎ বাইরে মুনশির গলা শোনা গেল। মুনশি এসেছে। একগাল হাসিমুখে।
কী হল? তোমার কথাই এইমাত্র বলছিলাম।
মুনশি বললে–আমার কথা ভাবছিলেন? তা হলে অনেক দিন বাঁচব হুজুর। পাগলটাকে অনেক কষ্টে খুঁজে বার করেছি–
বলে বাইরের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললে–এসো হে
উদ্ধব দাস ঢুকল। ক্লাইভ বললে–কী হল পোয়েট, তোমাকে খবর পাঠালাম, তুমি আসবে বললে, তবু যে এলে না?
উদ্ধব দাস বললে–আজ্ঞে আপনার বাড়ির প্রহরীরা যে ঢুকতে দেয় না। আপনাদের কাছে আসা বড় ল্যাঠা হুজুর, আমার হরির সঙ্গে দেখা করতে গেলে এত ঝামেলা নেই, হরির দেউড়িতে দারোয়ান থাকে না
ক্লাইভ সেকথায় কান না দিয়ে নবকৃষ্ণের দিকে চেয়ে বললে–তুমি এখন একটু বাইরে যাও তো, পোয়টের সঙ্গে আমার একটা প্রাইভেট কথা আছে
