মিরজাফর সাহেব বললে–না, এটা তোমাকে করতেই হবে। ক্লাইভসাহেব কড়া হুকুম দিয়েছে আমাকে–
কিন্তু মিরদাউদ শুনবে কেন? সে বেগমসাহেবাকে পাকড়ে নিয়ে এসেছে। ছেড়ে দিতে হয় আপনি ছাড়বেন। ক্লাইভসাহেব কে? এখন নবাব তো আপনি!
চুপ কর, বেল্লিকের মতো কথা বলিসনি। যা বলছি তাই কর তুই।
কিন্তু নবাব এখন আপনি না ফিরিঙ্গিবাচ্চা ক্লাইভ?
চোপরাও!
মিরন খানিকক্ষণের জন্যে চুপ করে রইল। তারপর একটু পরে মাথা উঁচু করে বললে–মরিয়ম বেগমসাহেবার ওপর কি ক্লাইভসাহেবের নজর পড়েছে?
নজর পড়লে তোর কী? তুই কেন গোঁসা করছিস? তোর বিবির ওপরে কি সাহেব নজর দিয়েছে?
তাও তো বটে! ফিরিঙ্গিবাচ্চা! যদি নবাবের বেগমের খুবসুরত জওয়ানির দিকে চেয়ে সাহেবের নজর বিগড়ে গিয়ে থাকে তো মিরনের কী আর নুকসান। নুকসান বেগমসাহেবাদের আর ক্লাইভ সাহেবের। সব তো ঝুটো মাল। ওদের আর কিম্মত কী?
আর শোন, আজ দরবারে ক্লাইভসাহেবের কাছে ইনাম দিতে হবে। সোনা চাদি হিরে মতি পান্না চেহেল-সুতুনের যা-কিছু আছে মালখানায় সব সাহেবদের সামনে বার করতে হবে। বেগমসাহেবাদের ভি নজরানা দিতে হবে
বেগমসাহেবাদের?
হ্যাঁ হ্যাঁ, উজবুগ! ফিরিঙ্গি সাহেব লক্কাবাগের লড়াই ফতে করে এসেছে। এখানে আমার মেহমান, নজরানা দিতে হবে না? ক’টা বেগম আছে?
মিরন বললে–গুনে দেখিনি। অনেক আছে–সবাইকে মতিঝিলে কয়েদ করে রেখেছি
সবগুলোকে সাহেবের সামনে নজরানা দিতে হবে।
নানিবেগমকে ভি নজরানা দেব?
দূর বেল্লিক, বুড়ি নিয়ে কী করবে সাহেব? মির্জার, বহ্নি, মাসি যারা আছে তাদের বাদ দিবি। ওদের নিয়ে ফিরিঙ্গি সাহেব কি ঘাস কাটবে? ওদের নজরানা দিলে যে সাহেব আমার মুখে থুতু দেবে রে!
ঠিক আছে। যেমন হুকুম হবে, তেমনই করতে হবে। নবাব যখন বাবা, তখন তার কথা শুনতেই হবে। ঘরের বাইরে আসতে আসতে মিরনসাহেব সেই কথাই ভাবছিল। নবাব হয়েও বাবার বড় ভয়। অত ডরপোক আদমি হলে কি নবাবি করা চলে!
সামনেই মেহেদি নেসার আর রেজা আলির সঙ্গে দেখা। মেহেদি নেসার আর ডিহিদার রেজা আলি সাহেব দু’জনেই আজ খুব ব্যস্ত। দুশো ফিরিঙ্গি আর তিনশো দিশি সেপাইদের খাওয়া-থাকার তদারকি করতে হচ্ছে সব কাজ ছেড়ে। সামনে মিরনসাহেবকে দেখে এগিয়ে এল।
কী সাহেব? নবাবকে তা হলে মিরদাউদসাহেব কয়েদ করেছে?
মিরন সাহেবের মুখের চেহারা দেখে ডিহিদার রেজা আলি সাহেব অবাক হয়ে গেল কী জনাব, মুখ গোমড়া করে আছ কেন? আজ তো তোমার ফুর্তির দিন,নবাব মির্জা মহম্মদ হেবাৎ জঙ আলমগির কয়েদ হয়েছে, আজ কি অমন মুখ করতে আছে?
মিরন বললে–আরে ভাইসাহেব, নবাব যে কে তারই এখনও ফয়সালা হয়নি, ফরমাশ দিচ্ছে সব ফিরিঙ্গিবাচ্চা ক্লাইভ।
ক্লাইভসাহেব? কেন?
আরে ভাইসাহেব, ক্লাইভসাহেব ফরমাশ দিয়েছে মরিয়ম বেগমসাহেবাকে খালাস করে দিতে হবে।
মরিয়ম বেগমসাহেবা? তার ওপর নেকনজর পড়ল কী করে ফিরিঙ্গিবাচ্চার?
কী জানি ভাইসাহেব, মরিয়ম বেগমসাহেবাকে নিয়ে নবাব মির্জা মহম্মদ পালাচ্ছিল, রাজমহলে সবাইকে পাকড়েছে, বাঁদি-বেগম সবাইকে। আভি হুকুম হয়েছে ফিরিঙ্গিবাচ্চার, ওই মরিয়ম বেগমসাহেবাকে ছেড়ে দিতে হবে
মেহেদি নেসার তাজ্জব হয়ে গেল। চোখ বড় বড় করে বললে–মরিয়ম বেগমসাহেবা? তুমি ঠিক শুনেছ জনাব?
আরে, তাই শুনেই তো মেজাজ বিগড়ে গেছে আমার।
তা মরিয়ম বেগমসাহেবাকে মির দাউদ পাকড়েছে কে বললে তোমাকে?
আরে, এই তো বাবার কাছে শুনে আসছি। ক্লাইভসাহেব খবর পেয়েছে যে মির্জা মহম্মদের দলে মরিয়ম বেগমসাহেবাও আছে–
গলত, গলত! গলত বাত। সব ভুল।
মিরন অবাক হয়ে গেল-ভুল?
আরে হ্যাঁ জনাব, মরিয়ম বেগমসাহেবা তো মতিঝিলে! সব বেগমদের তো মতিঝিলে কয়েদ করে রাখা আছে। মরিয়ম বেগমসাহেবা ভি ওখানে আছে। কিন্তু ক্লাইভসাহেবের নেনজর ওই বেগমসাহেবার ওপর পড়ল কী করে?
তা তো আন্দাজ করতে পারছি না ভাইসাহেব!
তা হলে এক কাজ করো জনাব, সবাইকে মতিঝিল থেকে হটিয়ে দাও।
মিরন বললে–হটিয়ে দেব কী করে? নবাবের যত বেগমসাহেবা আছে সকলকে যে ফিরিঙ্গিবাচ্চার কাছে নজরানা দিতে হবে। আবার জওয়ানি-বেগম ছাড়া যে ক্লাইভ সাহেব ছোঁবে না। আর হটাবই বা কোথায়?
কেন? জাহাঙ্গিরাবাদে! ঢাকায়।
মিরনের যেন কথাটা বড় পছন্দ হল। হাঁ করে চেয়ে রইল মেহেদি নেসার সাহেবের দিকে। বুদ্ধিটা তারিফ করবার মতো!
হাঁ করে দেখছ কী জনাব, সব হটিয়ে দাও। নানিবেগম, ঘসেটি বেগম, আমিনা বেগম, ময়নামা বেগম সবাইকে। ওই মরিয়ম বেগমসাহেবাকে ভি দুরে হটিয়ে দাও, ফিরিঙ্গিবাচ্চার এক্তিয়ারের বাইরে।
মরিয়ম বেগমসাহেবাকেও?
মেহেদি নেসার বললো জনাব, হ্যাঁ, মরিয়ম বেগমসাহেবা কি সোজা চিজ নাকি? ওই-ই তো সফিউল্লা সাহেবকে খুন করেছিল, ইয়াদ নেই?
মনে পড়ল মিরন সাহেবের।
ওই মরিয়ম বেগমসাহেবাই তো কলকাতার পেরিন সাহেবের বাগানে গিয়ে ক্লাইভসাহেবের দফতর থেকে উমিচাঁদ সাহেবের চিঠি চুরি করে নবাব মির্জা মহম্মদকে দেখিয়েছিল ওকে আগে হটাও
মিরনের কানে সব কথা যাচ্ছিল এতক্ষণ, কিন্তু তবু যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না। বললে–তুমি ঠিক জানো ভাইসাহেব, মরিয়ম বেগমসাহেবা মতিঝিলে আছে?
আরে হ্যাঁ জনাব, হ্যাঁ, আমি জানি না? আমি নিজে মরিয়ম বেগমসাহেবাকে কয়েদ করে রেখেছি। আমি জানব না তো কে জানবে।
