সামনে দরজার বাইরে পায়ের আওয়াজ হতেই মেহেদি নেসার সাহেব বললে–দে দে, শরবত দে
তারপর ভাল করে দেখে বুঝলে শরবত নয়, মনসুর মেহের আলি মোহরার এসে হাজির। সামনে এসে মাথা নিচু করে তিনবার হাত ঠেকালে মাথায়।
আমাকে ডেকেছেন হুজুর?
কী খবর পেলি তুই? মিরজাফর সাহেবের হালচাল কী? বশির কোথায়?
বশির মিঞা বোধহয় আড়ালেই ছিল। তার নাম উঠতেই সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঢুকে কুর্নিশ করলে হুজুর, খবর সব বিলকুল ঠিক হ্যায়। দেওয়ান-ই-আলা মিরজাফর সাহেব…
বাধা দিয়ে মেহেদি নেসার সাহেব বললে–দূর বেল্লিক, মিরজাফরকে আবার দেওয়ান-ই-আলা বলছিস কেন? ও তো বরখাস্ত হয়ে গেছে। এখন কী করছে তাই বল। কার সঙ্গে শলা-পরামর্শ করছে তাই স্রেফ বল? নজর রাখছিস?
হ্যাঁ জনাব, রাখছি? মিরজাফর খাঁ সাহেবের বাড়ির সামনে চর রেখেছি, জগৎশেঠজির বাড়ির সামনে ভি চর রেখেছি। কলকাতায় বেভারিজ সাহেবের বাড়ির সামনে ভি রেখেছি, উমিচাঁদের বাড়ির সামনেও নজর রাখবার জন্যে চর রেখেছি, আমি খুদ নিজে ভি ঘুমছি তামাম বাংলা মুলুক–
তারপর একটু থেমে বললে–কিন্তু হুজুর, একটা বাত আছে, ওই ভিখু শেখ শালা বেল্লিকের বাচ্চা বড় খতরনাক আদমি হুজুর, শালা হারামি আমাকে কুত্তার বাচ্চা বলে গালাগালি দেয়–
কে ভিখু শেখ? ভিখু শেখ কে?
আজ্ঞে হুজুর, ওই জগৎশেঠজির ফটকের সেপাই—
ওই পাঠানটা?
জি হাঁ, হুজুর!
আচ্ছা তুই যা,–
বলে মেহেদি নেসার সাহেব মোহরার মনসুর আলি মেহেরের দিকে চাইলে। তারপর হঠাৎ কী মনে পড়ে গেল। আবার ডাকলে–শোন বশির
বশির ঘুরে দাঁড়াল। মেহেদি নেসার সাহেব বললে–ারে, হাতিয়াগড়ের জমিদার কেন এসেছিল রে মুর্শিদাবাদে? আজ তার বজরা দেখলুম। মহিমাপুরের দিক থেকে আসছে। জগৎশেঠজির কাছে গিয়েছিল নাকি শল্লা করতে?
কই, না হুজুর, আমি তো জগৎশেঠজির বাড়ির সামনে নজর রাখার ইন্তেজাম করেছি, কেউ তো আসেনি সেখানে
কেউ আসেনি?
না হুজুর,–
মিরজাফর আলি, হলওয়েল, ওয়াটস, ব্যাটসন, কলেট, উমিচাঁদ, কি কোনও জমিদার, জায়গিরদার, পাট্টাদার, তালুকদার, কেউ না?
আজ্ঞে হুজুর, সে তো আসছে হুন্ডি কাটাতে। তারা তো হামেশা আসছে!
নিজামতের মহাফেজখানা কি সেরেস্তার কেউ যাচ্ছে?
না, কেউ যাচ্ছে না হুজুর!
তারপর আসল কথাটা মনে পড়ল এতক্ষণে। ভেতর থেকে মতিঝিলের খিদমদগার এক গেলাস ঠান্ডা শরবত এনে দিয়েছিল। তাতে একবার চুমুক দিয়ে বললে–আর সেই হাতিয়াগড়ের রানিবিবির কী হল? ডিহিদারের পরওয়ানা পৌঁছে গেছে।?
একেবারে ভুলে গিয়েছিল বশির মিঞা একথাটা। ইস! লজ্জায় মাথা কাটা গেল বশির মিঞার। তামাম বাংলা মুলুকের জাসুসি কাজ একলা বশির মিঞার মাথার মধ্যে। দুনিয়ার কাজ সব তার ঘাড়ে। ক’টা দিকে দিকদারি করবে সে। সেই কবেকার ব্যাপার। এখনও কোনও বন্দোবস্ত করা হয়নি। তখন বুড়ো নবাব বেঁচে। মির্জা মহম্মদের শাদির সময় মুর্শিদাবাদের ভিড় ছিল দেখবার মলে। জলের মতো টাকা উড়িয়েছিলেন আলিবর্দি খাঁ। সারা মুলুক ঝেটিয়ে জমিদাররা এসেছিল এখানে। জিন্নতাবাদ, চাঁড়া, ফতেবাদ, মহম্মদাবাদ, বাকলা, পূর্ণিয়া, তাজপুর বাজুহা, হাতিয়াগড়–সব সরকারের জমিদাররা এসে জুটেছিল এখানে। মুর্শিদাবাদের ঘাটে বজরার গাদি লেগে গিয়েছিল। মেহেদি নেসার তখনই প্রথম দেখেছিল হাতিয়াগড়ের রানিবিবিকে। নয়া জওয়ানি মেয়ে। চোখ দুটো যেন আসমানের জমিন। মেঘ-মেঘ রোদ-রোদ। বজরার খিড়কির ভেতর দেখা। মির্জাকেও দেখিয়েছিল। বলেছিল–ইয়া আল্লা, ওকে চাই ইয়ার। খোঁজ নাও কে ও! মেহেদি নেসারও সব খোঁজখবর নিলে। জানা গেল হাতিয়াগড়ের দোসরা তরফের রানিবিবি। আগের রানির বাচ্চা পয়দা হয়নি বলে দোসরা বিবি ঘরে এনেছে। তা হোক, তাতে মির্জার ইয়ারের কোনও লাভলুকসান নেই। আরে, আওরতের আবার জাত-বিচার কী! যেমন মসনদ হল মসনদ, তেমনি আওরত হল আওরত। মসনদ কেড়ে নিতে পারলেই নিজের। আলিবর্দি খাঁ মুর্শিদাবাদের মসনদ কেড়ে নিতে পেরেছিল সরফরাজ খাঁকে খুন করে। তাই তা তার নিজের হয়েছে। মেয়েমানুষও তেমনি। কেড়ে নিতে পারলে আমি তোমার। আবার আমাকে যে কেড়ে নেবে আমি তার হব। মসনদ মেয়েমানুষ টাকা–এদের তো এই-ই কানুন।
মনসুর আলি মেহের সাহেব তখনও দাঁড়িয়ে ছিল।
তুই আবার ঝুটমুট দাঁড়িয়ে কেন?
আজ্ঞে, আপনি কিছু ফরমায়েশ করুন
মেহেদি নেসার বললে–সেরেস্তায় যা-কিছু শুনবি, সব আমাকে বলে যাবি। মোহনলাল দেওয়ান-ই-আলা হয়েছে বলে সকলের বুক জ্বলছে খুব, না?
আজ্ঞে, না হুজুর।
হলে বলে যাবি আমাকে। রাজবল্লভটা কাফের বাচ্চা, ওটাকেও শায়েস্তা করতে হবে। আর ওই বাঁদির বাচ্চা, মেহেরুন্নিসা, ঘসেটি বেগম! সকলকে শায়েস্তা করে তবে দেওয়ানি কাবিল করব। তুই যা–
ততক্ষণে একটু নেশার ঘোর লেগেছে নেসারের মগজে। একটু একটু করে লাল হয়ে আসছে চোখ। এমনি লাল আরও লালচে হবে। যত বেলা বাড়বে তত মেহেদি নেসার সাহেব রঙিন হয়ে উঠবে। সারা মতিঝিলে তখন রোশনাই জ্বলে উঠবে। মতিঝিল যেন বুঝতে পারে সব। মতিঝিলেরও যেন প্রাণ আছে। এই মতিঝিলে কত রোশনাই হয়েছে একদিন। এখানেই রাজবল্লভ এসে চুপি চুপি বুড়ো নবাবের বড় মেয়ে ঘসেটি বেগমের সঙ্গে রাত কাটিয়েছে। আবার সেই বিছানা থেকেই ঘসেটি বেগম মাঝরাতে উঠে গিয়ে শুয়েছে হুসেনকুলি খাঁ’র ঘরে। এখানকার প্রতিটি পাথরে যেন আলিবর্দির পাপের দাগ লেগে আছে। তুমি একদিন তোমার অন্নদাতাকে মেরেছ, তোমার অন্নদাতার একমাত্র ছেলে সরফরাজকে খুন করেছ। তোমার পাপের কি শেষ আছে জাঁহাপনা! তুমি কেবল রাজনীতিই মেনেছ, আর কোনও নীতিই তো মানোনি। তাই চোখের সামনে দেখেছ তোমার মেয়েদের কীর্তি-কেচ্ছা। তারপর আরও কিছুদিন বেঁচে থাকলে আরও দেখে যেতে পারতে! দেখে যেতে পারতে নজর আলির কীর্তি। তখন ঘসেটি বেগমের এই মতিঝিল তোমার নাতির অত্যাচারে থরথর করে কাঁপছে। তোমার বড় আদরের মির্জা মহম্মদ হুকুম দিয়েছে মতিঝিল লুট করে যা পাবে নিয়ে আসবে। ঘসেটি বেগমের অনেক টাকা, অনেক দৌলত, অনেক ঐশ্বর্য। জাহাঙ্গিরাবাদের সব টাকা নিয়ে এখানকার সিন্দুকে লুকিয়ে রেখেছে। একদিন রাত থাকতে নবাবি ফৌজ গিয়ে সকালবেলা মতিঝিল ঘিরে ফেললে।
