মিরন হাসি থামিয়ে গম্ভীর হয়ে গেল। বললে–তা আমি জগৎশেঠজির হুকুম মানব, না আমার বাবার হুকুম মানব? কোনটা মানব আপনিই বলুন?
বশির মিঞা বললে–না না হুজুর, আপনি মিরজাফর সাহেবের হুকুম মানুন। মিরজাফরসাহেবই তো নবাব হচ্ছেন হুজুর।
তুমি থামো! তুমি কে?
বশির মিঞা একটু থিতিয়ে গেল বকুনি খেয়ে। কিন্তু জবাবটা দিলে মিরন সাহেব। বললে–ওকে অমন করে বলবেন না দেওয়ানজি, ও আমার লোক–
কথাটায় অপমান বোধ হল দেওয়ানজির। ওসম্বন্ধে আর কিছু কথা বললেন না। আসল প্রসঙ্গ টেনে এনে বললেন–যা ভাল বোঝে করো মিরন, কিন্তু কাজটা ভাল হল না
ভাল হল কি খারাপ হল সে আপনি বাবাকে গিয়ে বলুন।
এর পর আর কোনও কথা বলা চলে না। দেওয়ানজির মুখটা কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেল। এমন করে দেওয়ানজিকে কেউ আগে অপমান করতে সাহস পায়নি। দেওয়ানজিকে অপমান করা মানেই জগৎশেঠজিকে অপমান করা। দেওয়ানজি আর সেখানে দাঁড়ালেন না। পালকিতে উঠে আবার চলতে লাগলেন।
মিছিল তখন এগিয়ে চলেছে। একেবারে চকবাজারের রাস্তায় সারাফত আলির দোকানের সামনে এসে পড়েছে। মিরদাউদ সাহেব এদিক-ওদিক চেয়ে দেখছে। দেখুক সবাই, ভাল করে চেয়ে দেখুক।
কিন্তু হঠাৎ কে যেন মিরন সাহেবকে ডাকলে। বশির মিঞাই প্রথমে শুনতে পেয়েছে। কে? কে ডাকে?
যে ডাকতে এসেছে সে একেবারে দৌড়োতে দৌড়োতে এসেছে। হাঁফাচ্ছে তখনও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। অত ভিড়ের মধ্যে একেবারে মিরন সাহেবের সামনে মুখোমুখি গিয়ে কথা বলতে পারেনি।
কাছে আসতেই বশির মিঞা চিনতে পেরেছে। আসগর আলি! আসগর আলি মিরজাফর খাঁ সাহেবের খাস খানসামা।
আসগর, তুমি?
মিরনসাহেবকে ডাকতে এসেছি। সাহেব এত্তেলা দিয়েছে।
তোমার সাহেব? মিরজাফর খাঁ সাহেব?
বশির মিঞা আর দাঁড়াল না। মিরন সাহেবকে গিয়ে খবরটা দিলে। মিরন সাহেব তখন ব্যস্ত। ভিড় সামনে এগিয়ে আসছে। তাদের সামলাতে সামলাতে তখন গলদঘর্ম। ঠিক সেই মুহূর্তে খবরটা পেতেই চমকে উঠল। আবার বাধা? ভাল কাজ একটা করতে গেলেই কোনও-না-কোনও বাধা এসে পড়ে।
ঠিক আছে। মিরন মাথার পাগড়িটা খুলে ফেলে ঘামটা মুছে ফেললে। তারপর মিরদাউদ সাহেবকে ডাকলে।
বললে–ফৌজদারসাহেব, কর্তার তলব এসেছে, আমি যাচ্ছি
কর্তা ডেকেছে? কোনও গলত নাকি?
কী জানি! একটু আগে জগৎশেঠজির দেওয়ান এসেছিল, বলছিল নবাবসাহেবকে রাস্তা দিয়ে হটিয়ে নিয়ে যাচ্ছি কেন! আরে বেত্তমিজ, নবাব যখন মসনদের ওপর বসত তখন আমাদের তকলিফ দেয়নি? কী বলল মিরদাউদসাহেব, তকলিফ দেয়নি?
আলবাত দিয়েছে। একশো বার, হাজার বার তকলিফ দিয়েছে। বেশ করেছি হটিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
তবে? সেসব কথা কি আমি ভুলে গেছি?
তারপর চারদিকে দেখে নিয়ে বললে–আমি চললাম, দেখি কর্তার কী হুকুম হয়!
মিরদাউদ বললে–যদি কর্তা বলেন নবাবকে পালকিতে উঠিয়ে আনতে, তাহলে যেন রাজি হবেন না মিরনসাহেব।
না না, বাবার ভয়-ডর আছে বলে আমি তো ডরপোক আদমি নই, আমি বাঘের বাচ্চা, আমি কাউকে পরোয়া করি না ফৌজদারসাহেব!
বলে মিরন চলে গেল। যাবার আগে বলে গেল একটু ভাল করে নজর রাখতে বলবে ফৌজদারসাহেব, যেন আসামিরা না ভাগে
তখন জলুস আরও এগিয়ে চলেছে। আরও ভাল করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে সবাই আসামিদের। ইতিহাসের পরিহাসে একদিনের নবাব আজ ইনসানের দরবারে আসামি হয়ে দাঁড়িয়েছে হাতে হাতকড়া পরে। তোমরা সবাই আমার প্রজা ছিলে এতদিন, আজ আর-একনবাবের প্রজা হতে চলেছ। তোমরাই ফিরিঙ্গিদের শাঁখ বাজিয়ে উলু দিয়ে এই শহরে অভ্যর্থনা করেছিলে, আর এখন আমাকে অভ্যর্থনা করছ। চোখের জল দিয়ে। ভাইসব, তোমরা এক বিচিত্র জীব। আজ আমাকে হাতকড়া দিয়ে গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে দেখেও তোমরা একবার মুখের কথাতেও প্রতিবাদ জানাচ্ছ না। তোমরা যদি একটু প্রতিবাদ করতে, একটু বিদ্রোহ করতে, তা হলে আর আমাকে এমন রাস্তার ওপর দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যেত না ওরা। পালকিতে করে তুলে নিয়ে গিয়ে কোথাও বন্দি করে রাখত। কিন্তু কেনই বা তোমরা প্রতিবাদ করবে? আমি তো কোনওদিন তোমাদের কোনও উপকার করিনি। উপকার করবার সুযোগ পেলে তোমাদের উপকার করতাম কি না তাও তোমরা ভেবে দেখোনি। আমি হেরে গেছি, সেইটেই আমার বড় অপরাধ। সেই অপরাধেই তোমরা আমাকে অপরাধী করেছ। যে হেরে যায়, তার দলে কে থাকে বলো? কে এমন নির্বোধ আছে দুনিয়ায়? যে জেতে তারই তো জয়জয়কার। এ সংসারে বিজয়ীর গলাতেই তো সবাই জয়মাল্য দেয়। সেই জয়মাল্য দেবার সময় তো ন্যায়-অন্যায় বিচার করতে নেই। তাই ভাইসব, ন্যায়-অন্যায়ের কথা আজ আমি তুলছি না। আমি একটা কথা শুধু বলি, তোমরা চোখের জল ফেলে আমাকে আর হাসিয়ো না। আমি তোমাদের চিনে নিয়েছি। তোমরা চোখ মুছে ফেলল। যদি পারো আর একটু এগিয়ে গিয়ে আমার মনসুরগদির সামনে গিয়ে আরও জোরে উলু দাও, আরও জোরে শাঁখ বাজাও
ওদিকে মনসুরগদির ভেতরে তখন মিরন সাহেবের মাথা গরম হয়ে গেছে। হাবেলির ভেতরে ফিরিঙ্গি ফৌজের দলের পাঁচশো সেপাই হইহল্লা করছে। তাদের সকলকে খাওয়ানো, তাদের তদারক করা সোজা কথা নয়। একটা কোনও ত্রুটি হলে ক্লাইভ সাহেব রেগে যাবে। তাদের জামাই আদরে রাখতে হয়েছে। হড় হড়া পোলাউ রান্না হচ্ছে, হড় হড়া গোস রান্না হচ্ছে।
