কত টাকা পেয়েছে?
সে জানবার উপায় নেই। ক্লাইভসাহেব হুকুম দিয়ে সেখানকার ফটকে সিলমোহর করে দিয়েছে।
জগৎশেঠজি খানিকক্ষণ ভেবে বললেন–আপনি একবার যান সেখানে, গিয়ে আমার নাম করে বলুন, নবাবকে যেন রাস্তা দিয়ে সকলের চোখের সামনে হাঁটিয়ে না নিয়ে আসে
কিন্তু মিরন কি আমার কথা শুনবে মহারাজ?
আপনার কথা না শুনুক, আমার কথা তো শুনবে, আমার নাম করে গিয়ে বলুন।
দেওয়ানজি বললেন–আপনি যখন বলছেন আমি নিশ্চয়ই যাব, তাতে আমাদের লাভটা কী হবে?
দেখুন দেওয়ানজি, সূর্য চব্বিশ ঘণ্টা আকাশে থাকে না, একসময় তাকে অস্ত যেতেই হয়, কিন্তু পরদিন ভোরবেলা আবার সে ওঠে, তখন নতুন করে নতুন তেজ নিয়ে সে উদয় হয়।
কিন্তু, নবাব কি বলতে চান আবার উঠতে পারবে? এর পরেও নতুন করে চেহেল্-সুতুনের মসনদে বসতে পারবে?
জগৎশেঠজি বললেন–এ নবাব না বসুক, অন্য কেউ বসবে। সিংহাসন কখনও খালি পড়ে থাকে না তা জানি, কিন্তু নবাবকে অপমান করলে যে সিংহাসনকেই অপমান করা হয়। মির্জা মহম্মদকে ওরা যত খুশি অপমান করুক, নবাবকে অপমান করতে নেই, তাতে মসনদের গৌরবকে খর্ব করা হয়। আপনি গিয়ে বলুন মিরনকে–
দেওয়ানজিকে চলে যেতেই হল। জগৎশেঠজির হুকুম। বৃদ্ধ মানুষ, মুর্শিদাবাদের অনেক নবাব দেখেছেন, অনেক নবাবকে কুর্নিশ করেছেন। অনেক নবাবের নিমক খেয়েছেন। সেই নবাবের এমন অপমান সহ্য করতে পারছেন না। রণজিৎ রায় মশাই বেরোলেন। মহিমাপুরের রাস্তায় মানুষের সমুদ্র বয়ে চলেছে। নবাবকে হাতকড়া পরিয়ে রাস্তা দিয়ে হটিয়ে নিয়ে আসছে, এমন ঘটনা রোজ রোজ ঘটে না। এ-দৃশ্য না দেখলে জীবনই ব্যর্থ। বাড়ির ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে ঘোমটার আড়াল দিয়ে উঁকি মারছে বুড়ি মেয়েমানুষরা। ঘুলঘুলি দিয়ে উঁকি দিচ্ছে কমবয়েসি মেয়েরা। ওই যে! ওই যে আসছে। ওই যে রে সামনের লোকটার খালি মাথা, ওই-তো নবাব! পেছনে পেছনে বেগম বাদির দল!
নবাবকে আগে অনেকবার দেখেছে সবাই। সে এ নবাব নয়। তার মাথায় তাজ ছিল, গায়ে জরির সাজপোশাক ছিল। হাতির পিঠে চড়ে আসত। সামনে কাড়া-নাকাড়া বাজাতে বাজাতে যেত বাজনাদাররা, তারপরে নবাবের সেপাইদের সর্দার, তারপর নবাব। সামনে-পেছনে সে-জাকজমক দেখে বোঝা যেত মুর্শিদাবাদের নবাব চলেছে। কিন্তু এবার তো সাধারণ মানুষ। তার মাথায় তাজ নেই, গায়ে জরির সাজপোশাক নেই। এর দু’হাত লোহার হাতকড়া দিয়ে বাঁধা। রোদের মধ্যে মাথা নিচু করে হাঁটছে।
ওরে, দেখছিস নবাব কাঁদছে?
না না, কাঁদছে না
ওই তো কাঁদছে, দেখছিস না টপ টপ করে জল পড়ছে বুকের ওপর
না না, ও তো ঘাম–রোদ লেগে ঘামছে
তা সত্যিই তখন মাথার ওপর রোদ ঝাঁঝাঁ করছে। ঘেমে নেয়ে উঠেছে সবাই। রাস্তার দুপাশে সারবন্দি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পঁড়িয়ে ঝুঁকে দেখছে। মিরদাউদ সাহেব সামনে আসছে বুক ফুলিয়ে। তার পাশে মিরকাশিম সাহেব। কড়া নজর তার চারদিকে। আর সেপাইরা ঘিরে রেখে দিয়েছে সকলকে। আসামি না পালিয়ে যায়।
মিরন সাহেবেরই সর্দারিটা বেশি। একবার পেছনে যাচ্ছে, একবার সামনে। খুব হুঁশিয়ার। খবরটা পেয়েই সেপাই তৈরি রেখেছিল মুর্শিদাবাদের ঘাটে। তারপর নিজেই সব তদারক করছে। নিজেই ভিড় সরাচ্ছে, নিজেই হুশিয়ার করে দিচ্ছে সকলকে। একদিন এই মিরন নবাবের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহস পায়নি। একদিন এই মিরনকেই অপমান করে তাড়িয়ে দিত দরবারের খিদমদগার। ভাগিয়ে দিত মতিঝিলের ফটকের পাহারাদার! আর আজ সেই মিরন সকলের ওপর হুকুম চালাচ্ছে। আর দুদিন বাদে আবার এই মিরন সাহেবকে কুর্নিশ করে তবে দরবারে মিরজাফর সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যেতে হবে। এই হচ্ছে নসিবের খেল। এই হচ্ছে তকদির।
আর এসেছে বশির। বশির মিঞা। বশির মিঞার হাঁক-ডাক দেখে কে! কোথা থেকে একটা লাঠি জোগাড় করেছ। বলে–হটো, হটো হিয়াসে।
যারা বশির মিঞার ইয়ার তারা ভেবেছিল, এই সময়ে বশিরের কাছ থেকে একটু খাতির পাবে। কিন্তু কোথায় কী। তাদের চিনতেই পারে না বশির মিঞা। বলে, সরকারি কাজে খাতিরটাতির নেই ইয়ার যাও যাও, হটো
কিন্তু ওদিক থেকে জগৎশেঠজির দেওয়ান আসতেই ভিড় একটু রাস্তা করে দিলে।
কে?
হুজুর, জগৎশেঠজির দেওয়ানজি আপনার সঙ্গে বাত করতে এসেছেন
মিরনের যেন তবু গ্রাহ্যই নেই। বললে–বলল, এখন ফুরসত নেই আমার
আজ্ঞে, জরুরি কাম।
মিরন বললে–বলল, এটা আরও জরুরি কাম–এখন ফুরসত হবে না—
কিন্তু রণজিৎ রায় মশাই এ রকম উত্থান-পতন অনেক দেখেছেন। বললেন–আমি দেখা করবই—
বলে একেবারে সোজা এগিয়ে গেলেন সামনের দিকে।
অন্য সময় দেওয়ানজি কথা বললে–মিরন কৃতার্থ হয়ে যায়। কিন্তু আজ যেন অন্য রকম। বললে–তা আমি কী করতে পারি?
দেওয়ানজি বললেন–জগৎশেঠজি বলছেন সকলের চোখের সামনে এভাবেনবাবের লাঞ্ছনা করা কি ভাল?
নবাব? নবাব কাকে বলছেন জনাব? মির্জা মহম্মদ কি এখনও মুর্শিদাবাদের নবাব আছে?
তবু বুঝলে না, একদিন তো নবাব ছিলেন উনি। নবাবকে অপমান করলে মুর্শিদাবাদের মসনদকে যে অপমান করা হয়।
হা হা করে হাসিতে ফেটে পড়ল মিরন সাহেব।
বশির মিঞা হাসি শুনে কাছে সরে এল। বললে–কী হয়েছে হুজুর?
এই দেখ না বশির, দেওয়ানজি কী বলছেন।
দেওয়ানজি বললেন–আমি বলিনি মিরন, জগৎশেঠজি যা বলে পাঠিয়েছেন তাই আমি তোমাকে বলছি
