বড় মুশকিলে পড়ল নবকৃষ্ণ। কী বলবে বুঝতে পারলে না।
ক্লাইভ আবার বললে–তুমি কত টাকা পেলে খুশি হবে বলো?
নবকৃষ্ণ বললে–টাকার লোভ আমাকে দেখাবেন না হুজুর, আমি আপনার শ্রীচরণের সেবা করতে পারলেই খুশি হব, আর কিছু চাই না
ক্লাইভ সাহেব বললে–ঠিক আছে, টাকার কথা আমি বুঝব; এখন একটা অন্য কথা বলি, যে-খবরটা আনতে বলেছিলুম, সে-খবরটা কিছু পেলে?
হ্যাঁ হুজুর। চেহেল্-সুতুনে কোনও বেগমসাহেবা নেই। সকলকে ধরে মতিঝিলের মধ্যে গ্রেফতার করে রেখেছে মিরনসাহেব।
ক্লাইভ বললে–সে আমি জানি। কিন্তু মরিয়ম বেগমসাহেবা’ বলে কোনও বেগমসাহেবা তার মধ্যে আছে কিনা, তা খোঁজ নিয়েছ?
নিয়েছি হুজুর, আছে।
দেখা হয়েছিল তার সঙ্গে?
না হুজুর, দেখা করিনি। আপনি যদি মঞ্জুরি দেন তা দেখা করতে দেবে। তাকে গিয়ে কী বলতে হবে হুকুম করুন।
দরজার বাইরে কড়া নাড়ার শব্দ হল। ক্লাইভ সাহেব বললে–ওই বোধহয় আবার উমিচাঁদটা এসেছে, বলো এখন দেখা হবে না
নবকৃষ্ণ উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখলে উমিচাঁদ সাহেব নয়। দু’জন অন্য লোক।
চিনতে পারলে ক্লাইভ। সেই গোলাম মোল্লা আর তার সঙ্গী।
হুজুর, সব্বনাশ হয়েছে। ভয়ে ভয়ে লোক দু’জন কাঁপতে লাগল ক্লাইভ সাহেবের সামনে দাঁড়িয়ে। তারপর অচেনা মুখ দেখে কথা বলতে গিয়েও থেমে গেল।
ক্লাইভ সাহেব আড়ালে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলে কী হয়েছে বলো? বেগমসাহেবাকে কলকাতায় পৌঁছে দিয়ে এসেছ?
না হুজুর।
কেন?
নফরগঞ্জের কাছে মিরদাউদ সাহেব বেগমসাহেবাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে!
হোয়াই? কেন?
আমরা কবুল করলুম হুজুর, ইনি কর্নেল সাহেবের লোক, তবু কথা শুনলে না। সঙ্গে মিরকাশিমসাহেবও ছিল, ওনাকে ধরে নিয়ে গেল।
আচ্ছা তোমরা যাও
ক্লাইভ নিজের জায়গায় ফিরে এসে গম্ভীর মুখে কিছুক্ষণ বসে রইল। মুনশি সাহেবের মুখের দিকে
চেয়ে বললে–কিছু বিপদ-আপদ হয়েছে নাকি হুজুর?
ক্লাইভ বললে–আচ্ছা মুনশি, তোমাকে সেই যে পোয়েটকে ডাকতে বলেছিলাম, সে তো কই এল না। কখন আসবে সে?
মুনশি বললে–হুজুর, সে একটা বদ্ধ পাগল মানুষ, আমাকে বলে কিনা আমার মাথায় টিকি কেন? দেখুন তো তাজ্জব কথা। হিন্দুর ছেলে টিকি রাখব না? আমি কি মোছলমান?
তা হোক পাগল, তুমি এক্ষুনি একবার তাকে ডেকে নিয়ে এসো, আমার জরুরি দরকার, এখন রাস্তায় কিংবা ঘাটে কোথাও নিশ্চয়ই আছে, যাও। আমি ততক্ষণ একটু রেস্ট নিই–
জগৎশেঠজির বাড়ির ভেতর দেওয়ানজি রণজিৎ রায় তখন খবরটা দিলে গিয়ে। জগৎশেঠজিরও কদিন ধরে ঘুম হচ্ছে না। আসলে জগৎশেঠজি জানতেন, এ সমস্তকিছুর দায় এসে পড়বে তাঁরই মাথায়। টাকার দরকার হলেই তাঁর কাছে হাত পাততে হবে সবাইকে। সাত লাখ টাকা ফরাসিদের কাছে লগ্নি করা ছিল, সে টাকাটার আর কোনও আশা নেই। সেটা বেবাক জলে গেছে।
খবরটা শুনে জগৎশেঠজি বললেন–নবাবকে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে আসছে?
রণজিৎ রায় মশাই বললো হ্যাঁ
খানিকক্ষণ গম্ভীর হয়ে রইলেন জগৎশেঠজি।
দেওয়ানজি বললে–আমার একটু মায়া হল দেখে, হাজার হোক নবাব তো? অনেকে দেখলাম কাঁদছে। সঙ্গে আরও ক’জন বেগমসাহেবাও রয়েছেন। তারাও হেঁটে আসছেন পেছন পেছন
আর নবাব?
দেওয়ানজি বললেন–নবাব মুখ নিচু করে হেঁটে হেঁটে আসছেন, কোনও দিকে দৃষ্টি নেই, হাতকড়া বাঁধা–
জগৎশেঠজি উত্তেজিতভাবে বলে উঠলেন–তা নবাবের জন্যে পালকির ব্যবস্থা করলে কী এমন লোকসানটা হত? এ কি মিরজাফরের হুকুম, না মিরদাউদের বদমায়েসি? ৭১২
কথাটা বলে জগৎশেঠজি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তার চোখের সামনে দিয়ে পুরনো দিনগুলোর ছবি ভেসে যেতে লাগল। সেই ছোট বয়েসের নবাবজাদার দুষ্টমিটাও মনে পড়ল। আস্তে আস্তে সে বড় হল। নবাব আলিবর্দি কতদিন দরবারে বসে বলতেন–জগৎশেঠ, আমার নাতিটাকে নিয়েই ভাবনা, ওর কথা ভেবে মরে গিয়েও আমি সুখ পাব না
সেদিন জগৎশেঠজি নবাবকে আশা দিয়েছিলেন, সান্ত্বনা দিয়েছিলেন কিছু ভাববেন না নবাব, আমি তো আছি
বুড়ো নবাব আলিবর্দি জগৎশেঠজি কথা শুনে বোধহয় শেষ জীবনে ভরসা পেয়েছিলেন। কিন্তু সেকথা জগৎশেঠজি রাখেননি। রাখতে পারেননি।
হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন–লোকে কাঁদছিল?
দেওয়ানজি বললেন–হ্যাঁ, সবাই নয়, অনেকেই কাঁদছিল।
জগৎশেঠজি বললেন–দেখুন দেওয়ানজি, এই এরাই সকালবেলা ক্লাইভসাহেবকে দেখে শাক বাজিয়েছে, উলু দিয়েছে, আবার এরাই এখন নবাবকে দেখে কাঁদছে–আশ্চর্য! অথচ আমি কী করতে পারি। আমি আলিবর্দি খাঁ-কে কথা দিয়েছিলাম তার মির্জা মহম্মদকে আমি দেখব। আমি কথা রাখতে পারলাম না। আমার কী দোষ!
না না মহারাজ, আপনিই বা কী করবেন?
সত্যিই হাতকড়া লাগিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে আসছে নবাবকে?
শুধু নবাব নয়, মহারাজ, সকলকে। সঙ্গে বেগমদেরও হাঁটিয়ে নিয়ে আসছে মিরদাউদসাহেব। চারপাশে সেপাইরা ঘিরে রয়েছে।
জগৎশেঠজি বললেন–কোথায় রাখবে নবাবকে? মতিঝিলে, না মনসুরগদিতে?
রণজিৎ রায় বললেন–মতিঝিলে তো বেগমদের সবাইকে নজরবন্দি করে রেখেছে, সেখানে কি আর রাখবে? মিরনসাহেব যেখানে বলবে সেখানেই রাখবে।
এখন বুঝি মিরনই সর্বেসর্বা?
দেখছি তো তাই। লক্কাবাগের লড়াইয়ের পর থেকে তো দেখছি সব ব্যাপারে হুকুম চালাচ্ছে। মিরজাফরসাহেব তো এখন কেবল নিজের টাকাকড়ি-লাভ-লোকসান নিয়ে পাগল, চেহেল্-সুতুনের মালখানাতে কত টাকা আছে, তাই নিয়েই ব্যস্ত
