হঠাৎ যেন তুমুল ঝড় উঠল। মানুষের ভিড় চকবাজারের রাস্তা পেরিয়ে স্রোতের মতো এগিয়ে চলল গঙ্গার ঘাটের দিকে।
ও দাদা,কী হল? কোথায় যাচ্ছ?
সামনে যাকে পায়, তাকেই জিজ্ঞেস করে সবাই।
শোনোনি,নবাবকে গ্রেফতার করেছে যে!
ঠিক বলছ?
শুনছি তো, তাই দেখতে যাচ্ছি
ঊর্ধ্বশ্বাসে সবাই ছুটছে সেই দিকে। কথা বলবার সময় নেই কারও। মনসুরগঞ্জের ফটকের সামনের লোকগুলোও তখন দৌড়োতে আরম্ভ করেছে। নবাবকে গ্রেফতার করেছে। নবাবের হাতে হাতকড়া দিয়েছে। এমন তাজ্জব কাণ্ড আর কখনও দেখেনি কেউ। বাপ-খুডোর চোদ্দোপুরুষও এমন ঘটনার কথা কানে শোনেনি! চলল ইয়ার, জলদি চলো
বাংলা মুলুকের একদিন যারা মালিক হবে, আর শুধু বাংলা মুলুকই বা কেন, সারা হিন্দুস্থানের মাথায় উঠে বসবে, তারা সেদিন মুর্শিদাবাদের মনসুরগঞ্জ গদির ভেতরে চুপ করে বসে ছিল। এক এক করে সব খবরই কানে এসেছে। সবাই এসে দেখা করে গেছে। জগৎশেঠজি এসে ক্লাইভ সাহেবের সঙ্গে কথা বলে গেছে। পাশে বসে ছিল উমিচাঁদ সাহেব, আর নবকৃষ্ণ মুনশি।
খানিক পরে উমিচাঁদকেও উঠে যেতে বললে–ক্লাইভ। বললে–তুমি এখন যাও উমিচাঁদ—
উমিচাঁদ বললে–আমার কী হবে তা হলে সাহেব?
ক্লাইভ বললে–যা হবে, তা দেখতে পাবে। টাকা তো এখনও পাইনি।
শেষকালে কলা দেখাবে না তো সাহেব?
কলা? হোয়াট ইজ কলা?
বলে মুনশির দিকে চাইলে ক্লাইভ। নবকৃষ্ণ বুঝিয়ে দিলে। বললে–হুজুর, কলা মানে প্ল্যানটেন
ও, ব্যানানা? তা ব্যানানা আমি কোথায় পাব?
নবকৃষ্ণ বললে–না, হুজুর, উমিচাঁদসাহেব তা বলছেন না। বলছেন ওকে ফাঁকি দেবেন না তো আপনি?
ক্লাইভ বললে–ফাঁকি দেব কেন আমি? দলিলে যদি লেখা থাকে তো নিশ্চয়ই টাকা পাবে তুমি!
লেখা নেই মানে?
ক্লাইভ বললে–ঠিক আছে, আমি যখন চেহেল্-সুতুনে যাব, তখন দেখা যাবে; এখন তুমি যাও এখান থেকে, আমার মুনশির সঙ্গে আর্জেন্ট কথা আছে।
ঠিক আছে। আমি তোমার মুনশিকে জোগাড় করে দিলাম, আর এখন আমি কেউ নই, মুনশি নবকৃষ্ণই হল তোমার সব! ঠিক আছে। আমার টাকা নিয়ে সম্পর্ক! ফেলো কড়ি মাখো তেল, তুমি কি আমার পর?
রাগে গজরাতে গজরাতে উমিচাঁদ ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে গেল। বাইরে বেরিয়েই লম্বা বারান্দা। বাইরে ফিরিঙ্গিদের ফৌজের লোকজন ঘোরাফেরা করছে। বিরাট হাবেলি। ফৌজের লোকের মধ্যে দিশি-বিলিতি সবাইকে মিরজাফর এই বাড়িতে থাকতে দিয়েছে।
উমিচাঁদ মিরজাফর সাহেবের মহলের দিকে গেল। মহলের বাইরে পাহারা দিচ্ছিল সেপাই।
কোথায়, মিরজাফরসাহেব কোথায়?
বাইরে গেছে হুজুর!
ও, তা তার ছেলে মিরনসাহেব? মিরনসাহেব কোথায় গেল?
আজ্ঞে, কেউ নেই হাবেলিতে।
দুর ছাই, সবাই যে-যার কাজে বেরিয়ে গেছে। সবাই টাকার ধান্দায় বেরিয়েছে হয়তো।
নন্দকুমারকে সেইজন্যেই একদিন উমিচাঁদ বলেছিল–যা পারো টাকা কামিয়ে নাও নন্দকুমার, লড়াইতে কে জেতে কে হারে ঠিক নেই, দু’দলের কাছেই টাকা খাও। শেষে যার জিত হবে, তার দলেই ভিড়ে যাবে
বারান্দা দিয়ে চলতে চলতে গুরু নানকের উদ্দেশে একটা নমস্কার করে নিলে উমিচাঁদ সাহেব। জয়। গুরুজি, গুরুজি কি ফতে!
বলে আর দাঁড়াল না সেখানে। সামনের দিকে এগোতেই বাইরের ফটকের দিক থেকে একটা আওয়াজ এল। সকাল থেকেই সেখানে ভিড় জমেছিল মানুষের। ক্লাইভ সাহেব এখানে আসবার সঙ্গে সঙ্গেই। এখন আবার নতুন করে কীসের আওয়াজ এল!
কীসের আওয়াজ? কে?
কে একজন যাচ্ছিল, তাকে ডেকে উমিচাঁদ সাহেব জিজ্ঞেস করলে।
লোকটা ফৌজের দলের। বললে–নবাবকে ধরে এনেছে গ্রেফতার করে
তাই নাকি?
হঠাৎ যেন উমিচাঁদ সাহেবের রক্ত চনমন করে উঠল। জয় গুরুজি, তা হলে গুরুজিকে নমস্কার করার ফল হাতে-হাতেই ফলল সত্যি সত্যি! এই মনসুরগদি তো নবাবেরই তৈরি। বাংলা মুলুকের মানুষের কাছ থেকে আবওয়াব আদায় করে এই গদি নবাব আলিবর্দি খাঁ সাহেব মির্জা মহম্মদের জন্যে বানিয়ে দিয়েছিলেন। আর তারই ভেতরে আজ বসে আছে ফিরিঙ্গি সাহেব রবার্ট ক্লাইভ! জয় গুরুজি, এ সবই তোমার মেহেরবানি, এ সবই তোমার মর্জি!
ক্লাইভ সাহেব বললে–এবার দরজাটা বন্ধ করে দাও মুনশি, নইলে উমিচাঁদ আবার ঢুকে পড়বে কোন সময়
মুনশি নবকৃষ্ণ উঠে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এল। তারপর সাহেবের পায়ের কাছে এসে বসল। বললে–হুজুর, আমার একটা আর্জি আছে হুজুরের শ্রীচরণে।
ক্লাইভ বললে—বলো
নির্ভয়েই বলি হুজুর, আমি গত মাসের মাইনে পাইনি!
কেন? মাইনে পাওনি কেন? কত টাকা মাইনে তোমার?
নবকৃষ্ণ বললে–হুজুর, মাত্তর ছটাকা
ক্লাইভ হাসল। বললে–মুনশি, একদিন আমারও মাইনে ছিল তোমার মতো ছ’ টাকা। কিন্তু আজ আমি ইস্ট-ইন্ডিয়া-কোম্পানিতে সবচেয়ে বেশি মাইনে পাই। কী করে এমন হল জানো?
মুনশি বললে–হুজুরের গুণপনার জন্যে! হুজুরের গুণের কি সীমা আছে?
ক্লাইভ বললে–না, তা নয় মুনশি। এই সবকিছু হয়েছে তোমাদের জন্যে! তোমরাই আমার মাইনে বাড়িয়ে দিয়েছ মুনশি। তোমাদের জন্যেই আমি আজ কর্নেল!
মুনশি কৃতার্থ হয়ে সাহেবের পা ছুঁয়ে মাথায় ঠেকাল। বললে–কী যে বলেন হুজুর
না, আমি ঠিক বলছি মুনশি। তোমরা যদি বিশ্বাসঘাতকতা না করতে তো আমি কোথায় থাকতুম? তোমাদের ছটাকা কেন, ছ’হাজার টাকা করে দিলেও কোম্পানি তোমাদের বিশ্বাসঘাতকতার দেনা শোধ করতে পারবে না। টাকার জন্যে তুমি ভেবো না মুনশি, তুমি কত টাকা পেলে খুশি হবে?
