দুর্গা বলেছে–তুমি থামো তো, ছোটমশাই তেমন বেটাছেলে নয়
কিন্তু ছোট বউরানির সেকথায় বিশ্বাস হয় না। পুরুষমানুষ যে কী জিনিস, তা জানতে ছোট বউরানির বাকি নেই। যখন যেখানে তখন সেখানে।
আর ছোট বউরানিরই বা দোষ কী? দুর্গাও তো সেকথা জানে। দুর্গা যেমন জানে, তেমনই দুর্গার মা, মাসি, ঠাকুমা, দিদিমা সবাই জানত। পুরুষমানুষকে বিশ্বাস নেই। তারা মেয়ে পেলেই বিয়ে করে বসে। আর বাংলাদেশও যে মেয়ের দেশ। বাড়িতে বাড়িতে পাল পাল মেয়ে। আর যারা ইরান-তুরান থেকে এসেছিল এই হিন্দুস্থানে, তারাও তো কিছুটা এসেছিল এখানকার মেয়েমানুষের লোভেই। পৃথ্বীরাজকে হারিয়ে যে-মহম্মদ ঘোরি দিল্লি দখল করেছিল, সে তো আর দেশে ফিরে গেল না। হিন্দুস্থানের মতো এমন মজার দেশ কোথায় পাবে? এখানকার গাছের ফল, মাঠের ধান, গোয়ালের গোরু, আর পুকুরের মাছ, এ যে স্বর্গ! তার ওপর আছে এখানকার মেয়েরা! এত মিষ্টি, এত নরম, এত বাধ্য, এত সুন্দর বেগম আর কোথায় পাব? সূতরাং থাকো এখানে। এই দেশটাকেই নিজের দেশ বানিয়ে নাও। এমনি করেই চলছিল বাদশা আওরঙ্গজেব পর্যন্ত। তোমরা যে-যার এলাকায় স্বাধীন হয়ে রাজ্য চালাও, গ্রাম-পঞ্চায়েত গড়ো, লাঠি-সড়কি-বন্দুক-গোলাবারুদ নিয়ে চোর-ডাকাত-মারামারি ঠেকাও, আমাকে বিরক্ত কোরো না। আমি দিল্লির তকত-তাউসে বসে আয়েশ করে বেগমখাদি নিয়ে ফুর্তি করি। কিন্তু সাম্রাজ্য অত সহজ জিনিস নয় জাঁহাপনা। সম্পত্তিও অত সহজ জিনিস নয়। সম্পত্তি থাকলেই তোমার রাতের ঘুম আর দিনের বিশ্রাম গেল। তাই ওদিক থেকে উঠল মারাঠি আর শিখ। তারা বাদশা আওরঙ্গজেবের ঘুম কেড়ে নিলে, বিশ্রাম কেড়ে নিলে। আর বাদশা যখম মারা গেল, তারপর থেকে আগুন জ্বলে উঠল চারদিকে। সবাই স্বাধীন তখন। তুমি দিল্লির নবাব, কিন্তু আমিও হায়দরাবাদের নিজাম, আমিও হায়দার আলি; আর বাংলা মুলুকের নবাব আমিই। আমার নাম মুর্শিদকুলি খাঁ। পাঁচ-পাঁচবার মুর্শিদাবাদের নবাবি মসনদ হাত বদলাল, তবু হিন্দুস্থানের মানুষের দুঃখ ঘুচল না। তারা বললে–ফিরিঙ্গি, ফিরিঙ্গিই সই, ফিরিঙ্গিরাই যদি নবাবের হাত থেকে আমাদের বাঁচায় তো আমরা না-হয় ফিরিঙ্গিই হব, আমরা জাত দেব, জাত গেলেও জান তো তবু বাঁচবে।
হঠাৎ সামনে কাকে দেখে থমকে গেল দুর্গা। অন্ধকারে ভাল করে চেনাও যায় না। ওমা, কে তুমি? কাদের মেয়ে?
মূর্তিটা ততক্ষণে ঢিপ করে দুর্গার পায়ে একটা পেন্নাম ঠুকে দিয়েছে। ছোট বউরানির পা ছুঁয়েও মাথায় ঠেকিয়েছে। বললে–আমি মরালী, দুগ্যাদিদি
ওমা, মুখপুড়ি তুই? তুই কোত্থেকে এখেনে এলি? তুই তো মোছলমান হয়েছিস? মরিয়ম বেগম নাম হয়েছে তো তোর?
মরালী বললে–কেমন আছ ছোট বউরানি?
দুর্গা বললে–মরতে এখন ছুঁয়ে দিলি তো, রাত-বিরেতে এখন কাপড় কাঁচতে হবে আবার
ছোট বউরানি বললে–এখন কী হবে আমাদের রে, আমরা যাচ্ছিলম হাতিয়াগড়ে–কেষ্টনগরের মহারাজা আমাদের লোকজন সঙ্গে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিল, হঠাৎ এ কী বিপদ হল বল দিকিনি
দুর্গা বললে–নবাবকেও ধরে রেখেছে পাশের কোঠাতে হারামজাদাকে ধরেছে বেশ করেছে, কিন্তু আমরা কী দোষ করলুম মা?
কিন্তু দুগ্যাদি, তোমাদের বাঁচাবার জন্যেই আমি এত কাণ্ড করলুম, এবার দেখি তোমাদের জন্যে আর কী করতে পারি?
তুই আর কী করবি এখন? তোর নবাবকে তো এখন ধরে রেখেছে।
না দুগ্যাদি, তুমি আমাকে যেকরে বাঁচিয়েছ, তোমাদের জন্যে আমি সব করতে পারি, তুমি কিচ্ছু ভেবো না। আমি নবাবের সঙ্গে দেখা করে আসছি
বলে বাইরে যেতেই ফৌজদারের সেপাইরা আটকাল।
মরালী বললে–আমি নবাবের নৌকোতে যাব, আমি নবাবের বেগম
মিরদাউদ সাহেবের কানে কথাটা গেল। মিরকাশিম সাহেবও পাশে ছিল। বললে–যানে দেও—
নবাবের নৌকোটা পাশে আসতেই মরালী লাফিয়ে সেই নৌকোতে গিয়ে উঠল।
*
সেদিন মুর্শিদাবাদ শহরে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। একদিন এই মুর্শিদাবাদেই নবাব লড়াইতে ফিরিঙ্গিদের হারিয়ে বুক ফুলিয়ে ঢুকেছিল। তাও বেশিদিন আগের কথা নয়। আর আজ সেই ফিরিঙ্গিরাই আবার মুর্শিদাবাদ শহরের রাস্তা দিয়ে বুক ফুলিয়ে হাঁটছে। সঙ্গে দিশি সেপাই আর ফিরিঙ্গি ফৌজের লোক। শহরের লোকেরা উলু দিয়েছে, শাঁখ বাজিয়েছে। তবু যেন তাদের আশ মেটেনি। বারবার দেখতে চায় ক্লাইভ সাহেবকে। মনসুরগঞ্জের হাবেলির সামনে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
পাহারাদাররা এক-একবার তাড়া দেয় আর তারা দৌড়ে দুরে পালায়। কিন্তু আবার আস্তে আস্তে সামনে সরে আসে। আবার হাঁ করে উঁচু অলিন্দটার দিকে চেয়ে থাকে। যদি একপলক দেখা যায় সাহেবকে।
কিন্তু হঠাৎ কোথা থেকে উড়ো খবর এসে পৌঁছোল নবাব এসেছে রে, নবাব এসেছে–
কেউ বিশ্বাস করে না। বিশ্বাস করতে যেন ভরসা হয় না কারও। দুর, নবাব কেন আসতে যাবে? নবাব কেমন করে আসবে?
আরে, দেখে আয় গিয়ে গঙ্গার ঘাটে, মিরদাউদ সাহেব নবাবকে হাতকড়া পরিয়ে নৌকো থেকে নামাচ্ছে!
কথাটা যেন চাবুকের মতো বিঁধল সকলের মনে।
একজন বললে–তামাশা করার আর জায়গা পাওনি দাদা
যে-লোকটা কথাগুলো বললে, সে ততক্ষণ এগিয়ে গিয়েছে। তার আর তখন উত্তর দেবার সময় নেই। কদিন ধরে শহরে ঝাড়ু পড়ছে না, রাস্তায় আলো জ্বলছে না। কদিন ধরে চেহেল সূতুনের নহবত-মঞ্জিলে নহবত বাজছে না। ক’দিন ধরে বাজারে কেনা-বেচা হচ্ছে না। সকালবেলা এক রকম খবর আসে, আবার বিকেলবেলা সে-খবর উলটে যায়।
