রাজমহল থেকে নৌকো দুটো ছেড়েছিল। দিন পেরিয়েছে, রাতও পেরোচ্ছে, হঠাৎ এক জায়গায় এসে নৌকোটা যেন ঠোক্কর খেল।
মিরদাউদ একটা সেলাম পর্যন্ত করেনি। না করুক। মসনদের সঙ্গে সঙ্গে কুর্নিশ পাওয়ার অধিকারটুকুও যে হারিয়েছি তা জানি। তবু তো একদিন আগেও আমি বাংলা মুলুকের নবাব ছিলাম। এমন করে রাতারাতি সব গৌরব মুছে যায় নাকি?
তোমরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ মিরদাউদ?
মিরদাউদ গম্ভীর গলায় বলেছিল–মুর্শিদাবাদে।
মুর্শিদাবাদে নিয়ে গিয়ে কী করবে? আমাকে বন্দি করে রাখবে? ফাটকে পুরে রাখবে? কোতল করবে?
কোনও উত্তর দেয়নি মিরদাউদ এ-কথার। মিরকাশেমের দিকেও চেয়েছিল নবাব।
আচ্ছা মিরকাশিম, আমি যদি তোমাদের টাকা দিই তোমরা আমাকে ছেড়ে দেবে?
এর পরে মিরদাউদ আর মিরকাশিম ভেতরে আসেনি। দরজায় তালা লাগিয়ে দিয়ে বাইরে চলে গিয়েছিল। যেন নবাব পালিয়ে না যেতে পারে। যেন নৌকো থেকে গঙ্গায় ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরুদ্দেশ না হতে পারে। তা তোমরা কি চাও আমি তোমাদের পায়ে ধরে তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইব? এই যে তুমি রাজমহলের ফৌজদার হয়েছ, এ তো আমিই তোমাকে এ-চাকরি করে দিয়েছি। আমি সিলমোহর না করলে তো তুমি এ-চাকরি পেতে না। তোমাদের পায়ে ধরে আমি কী করে ক্ষমা চাই মিরদাউদ! আমারও তো একটা মান-মর্যাদা, মান-অভিমান আছে। তোমরা না-হয় বিশ্বাসঘাতকতা করে আমাকে লড়াইতে হারিয়ে দিয়েছ, কিন্তু আসলে তো বাংলার নবাব এখনও আমিই। এখনও তো মুর্শিদাবাদে আমার মসনদ আমারই রয়েছে।
পাশে এক কোণে লুৎফা চুপ করে বসে ছিল। শুরু থেকে একটা কথাও বলেনি সে। মিরকাশিম যখন তার হাত থেকে গয়নার বাক্সটা কেড়ে নিয়েছিল তখনও একবার চিৎকার করেনি।
জানো, ওরা কেউ আমার কথা শুনলে না।
মির্জা মহম্মদ আবার বললে–তুমি কথা বলছ না যে?
যেন লুৎফা কথা বললে–সমস্ত দুঃখ ঘুচে যাবে নবাবের। তবে আজকেই না-হয় কথা বলছে না লুৎফা, কিন্তু কবেই বা সে কথা বলেছে? কবে কথা বলবার জন্যে এমন করে পীড়াপীড়ি করেছ তুমি? সেদিন তো তোমার মনে ছিল না? সেদিন তো তুমি ডেকে খবর নাওনি লুৎফার?
মির্জা মহম্মদ আবার জিজ্ঞেস করলে হাতিয়াগড়ের রানিবিবিরা কি আমাদের সঙ্গেই আছে বেগমসাহেবা?
লুৎফা ছোট করে জবাব দিলো হ্যাঁ
কোথায়? পাশের নৌকোয়?
লুৎফা আবার তেমনি করে বললে–হ্যাঁ।
তা তুমি কি আমার সঙ্গে কথা বলবে না ঠিক করেছ?
লুৎফা বললে–কী কথা বলব?
কোনও কথাই কি তোমার বলতে ইচ্ছে করছে না? কথা বলবার জন্যে যে আমার প্রাণটা ছটফট করছে। একটা কিছু কথা বলো, নইলে মনে হচ্ছে আমার যেন কেউ নেই
তবু লুৎফা কিছু কথা বললে–না। তেমনি চুপ করেই রইল।
মির্জা বলতে লাগল জানো লুৎফা, সত্যিই এখন দেখছি আমার কেউ নেই। এতদিন যারা আমায় কুর্নিশ করেছে, যারা আমার কাছ থেকে মাইনে নিয়েছে, তারা দেখলাম সবাই পর। এখন গলা ছেড়ে ডাকলেও কেউ আর সাড়া দেবে না। এমন হবে আমি ভাবিনি লুৎফা
হঠাৎ বাইরে যেন মিরদাউদের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। মিরকাশিমও যেন কার সঙ্গে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলছে।
ওদিকে মরালীও তখন তৈরি হয়ে নিয়েছে। মিরদাউদ খাঁ সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। তার পাশেই মিরকাশিম সাহেব। মিরকাশিম সাহেব একটু সামনের দিকে এগিয়ে এল। বোধহয় দেখতে চাইছিল বেগমসাহেবার কাছে কোনও গয়নার বাক্স আছে কিনা।
আপনিই মরিয়ম বেগমসাহেবা?
মরালী বললো –হ্যাঁ
আপনি কোথায় চলেছেন চেহেল্-সুতুন ছেড়ে?
মরালী বললে–চেহেল্-সুতুন নয়, ক্লাইভসাহেবের ময়দাপুরের ছাউনি থেকে আসছি।
মিরদাউদ খাঁ চাইলে মিরকাশিমের দিকে। অর্থাৎ বেগমসাহেবা মিথ্যে কথা বলছে। ক্লাইভ সাহেবের আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই, মরিয়ম বেগমসাহেবাকে পাঠিয়ে দিচ্ছে নৌকো করে।
আপনার সঙ্গে কী কী আছে?
কিছুই নেই।
লোকের সন্দেহ হবে বলে কিছুই আনেননি সঙ্গে করে?
মরালী বললে–আমার কিছুই নেই তাই সঙ্গে কিছু আনিনি।
কিন্তু বেগমসাহেবা, ভেবেছিলেন পোশাক বদলালে কেউ আপনাকে চিনতে পারবে না, সহজেই লোকের চোখ এড়িয়ে যাবেন, না?
মরালী সেকথার উত্তর না দিয়ে বললে–আপনারা কি আমাকে ধরে নিয়ে যেতে চান?
মিরকাশিম সাহেব বললে–নবাবকে যখন ধরেছি, তখন তার বেগমসাহেবাকে তো ছেড়ে দিতে পারি না। আমাদের সঙ্গে যেতে হবে আপনাকে।
কোথায় নিয়ে যাবেন আমাকে?
মুর্শিদাবাদে।
কিন্তু এর জন্যে ক্লাইভসাহেবের কাছে আপনাদের জবাবদিহি করতে হবে, তা বলে রাখছি
সেকথা মিরজাফর আলি সাহেবকে বলবেন, তিনিই তার জবাব দেবেন।
কিন্তু যদি আমি না যাই?
মিরদাউদ খা’র হাতের তরোয়ালটা জলের ছায়া লেগে চকচক করে উঠল।
চলুন, কোথায় নিয়ে যাবেন চলুন, আমি যাচ্ছি।
*
পাশের নৌকোর ভেতরে তখন দুর্গা আর ছোট বউরানি চুপ করে সব শুনছিল। তাদেরও ঘুম নেই সারারাত। সেই আগের দিন দুপুরবেলা তাদের নৌকোর ভেতর ঠেসে পুরে দিয়েছে। এক ফোঁটা জল। পর্যন্ত কারও মুখে পড়েনি। ছোট বউরানি কেবল কেঁদেছে আর দুর্গা সাহস দিয়েছে। আর সাহস দিয়েই বা কী করবে। আর স্তোক দিয়ে কতদিনই বা বোঝাবে তাকে। একদিন-দুদিন তো নয়, মাসের পর মাস চলে গেছে। এক ঘাট থেকে আর-এক ঘাটে ঘুরে বেড়িয়েছে কেবল। হাতিয়াগড়ের মানুষ বোধহয় ধরে নিয়েছে তারা মরে গেছে। হয়তো ছোটমশাই আবার ফিরে গেছে হাতিয়াগড়ে। সেখানে ফিরে গিয়ে হয়তো আবার নতুন করে একটা বিয়ে করেছে।
