আমি, বেগমসাহেবা, আমি!
আমি কে?
আমি গোলাম মোল্লা। সাহেবের নায়ের মাঝি।
নৌকোটা যেন ভীষণ দুলে উঠল বার দুই। তারপর অনেক লোকের হল্লা শোনা গেল।
মরালী দরজার পাল্লাটা খুলতেই গঙ্গার হাওয়ার ঝাপটা এসে লাগল তার গায়ে। একেবারে হু হু হাওয়া, ঝড়ের মতো সব ওলটপালট করে দিলে।
সব্বনাশ হয়েছে বেগমসাহেবা, মিরদাউদসাহেব হামলা করেছে আমাদের নৌকোর ওপর।
মিরদাউদ সাহেব কে?
আজ্ঞে রাজমহলের ফৌজদার। নবাব, বেগম, বাদি সবাইকে পাকড়েছে রাজমহলে। সঙ্গে মিরকাশেমসাহেব ভি আছে মুর্শিদাবাদ যাচ্ছে ওরা
তা আমাদের কাছে কী চায়?
গোলাম মোল্লা বললে–আমাকে জিজ্ঞেস করলে নায়ে কে আছে, আমি বলেছি মরিয়ম বেগমসাহেবা, তখন আপনাকে ডেকে দিতে বললে–
তা তুমি বললে–না কেন যে, আমরা ক্লাইভসাহেবের লোক।
বলেছি আজ্ঞে, কিন্তু শুনলে না কিছুতেই, ওই দেখুন না ফৌজের সেপাইরা দুখানা নৌকো ভরতি হয়ে ঘাটে লাগিয়েছে–
অল্প অল্প ঝাপসা অন্ধকারে মরালী চেয়ে দেখলে সেইদিকে। দুটো নৌকো পাশাপাশি লাগান। আর তার চারপাশে ফৌজের লোক দাঁড়িয়ে আছে।
মরালী জিজ্ঞেস করলে সামনে ও কে?
ওই তো রাজমহলের ফৌজদারসাহেব।
আর পাশে বুঝি মিরকাশিমসাহেব?
গোলাম মোল্লা বললে–আজ্ঞে হ্যাঁ—
মরালী বললে–ঠিক আছে, তুমি বলে দাও, আমি তৈরি হয়ে নিচ্ছি
মানুষের জীবনে এক-একটা সময় আসে যখন তাকে সন্ধিক্ষণ বলা চলে। সেই সন্ধিক্ষণে তার জীবন-মৃত্যু-উন্নতি-অবনতি-অ্যুদয়-পরাভব সবকিছু ওলটপালট হয়ে গিয়ে জীবনের অন্য একটা ভিন্ন অর্থ দাঁড়ায়। যে-অর্থ কোনওদিন কল্পনাও করেনি সে, তখন সেই অর্থই তার শেষ অর্থ হয়ে পড়ে। মরালীরও সেদিন সেই গভীর রাত্রে বোধহয় তাই-ই হল। মরালীর জীবনের সেইটেই হল মহা সন্ধিক্ষণ। ভাল করে তাকে ভাবতে সময়ও দিলে না কেউ। একটা মূহুর্ত মাত্র। সেই মুহূর্তের মধ্যেই ভেবে নিতে হবে তুমি কী করবে। তুমি গঙ্গার স্রোতে ঝাঁপ দিয়ে অতলে তলিয়ে যেতে পারো। আর নাহয় মিরদাউদের আর মিরকাশিমের হাতে ধরা দিতে পারো। দুটো পথ খোলা আছে তোমার সামনে।
কিন্তু সেদিন মরালীর মরতে ইচ্ছে হল না। মরতে ইচ্ছে করলে সে-পথও তার ভোলা ছিল। কিন্তু মরবেই যদি তবে সে আগে মরেনি কেন? যে-দিন হাতিয়াগড়ের বাড়িতে তার সঙ্গে উদ্ধব দাসের বিয়ে হল সেই দিনই তো মরতে পারত। তার পরে চেহেলসতুনে এসে সারাফত আলির তৈরি আরক খেয়েও তো সে মরতে পারত। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে মরালী ঠিক করে নিলে সে বাঁচবে।
আর মরালী সেদিন বাঁচার পথ বেছে নিয়েছিল বলেই তো উদ্ধব দাস এমন করে ‘বেগম মেরী বিশ্বাস’ কাব্য লিখতে পারলে।
.
তারপর মরালী এক মুহূর্তেই ঠিক করে নিলে যে তাকে বাঁচতে হবে, তাকে জীবন দেখতে হবে। যে-জীন চেহেল্-সুতুনে ঢুকেও শেষ হল না, সেই জীবনেরও শেষটা দেখতে হবে।
একদিন বাংলা মুলুকের একটা কোণে এক মেয়ের জন্ম হয়েছিল ঘর-সংসার রান্নাঘর দেখতে আর সন্তানের জন্ম দিতে। কিন্তু সে-মেয়ে নিজের চেষ্টাতেই একটা সাম্রাজ্যের পতন নিজের চোখে দেখে নিলে। দেখে নিলে আর একটা সাম্রাজ্যের উত্থান। উত্থান-পতনের সাক্ষী হয়ে, দর্শক হয়ে, একেবারে সেই উত্থান-পতনের কেন্দ্রস্থলে গিয়ে হাজির হল।
মিরদাউদ খাঁ জানত সফিউল্লা সাহেবের খুন হওয়ার কথা। জানত মরিয়ম বেগমসাহেবার ওপর নবাবের দুর্বলতার কথা। মেহেদি নেসার সাহেবের কাছ থেকে অনেকবার সে কথা শুনেছে খাঁ সাহেব। তাই যখন মাঝিদের কাছে নৌকোর ভেতর মরিয়ম বেগম রয়েছে শুনলে, তখন হাজার উপরোধ-অনুরোধেও কান দিলে না।
মিরকাশিম বললে–ওকে ভি নিয়ে চলুন জনাব
সত্যিই বড় জ্বালিয়েছে মেয়েটা। মেয়েটা জেনেছে যে নবাব পালিয়েছে, তাই সঙ্গে সঙ্গে নিজেও চেহেলসূতুন থেকে পালাবার চেষ্টা করেছে।
গোলাম মোল্লা বলেছিল–না হুজুর, আমরা ক্লাইভসাহেবের লোক, ক্লাইভসাহেব বেগমসাহেবাকে নিয়ে কলকাতার দমদমের বাগানবাড়িতে পৌঁছিয়ে দিতে হুকুম দিয়েছে আমাদের।
মিরকাশিম সাহেব ধমক দিয়ে উঠল–ফিন ঝুট বাত?
ভেতরে একটা নৌকোতে তখন নবাব মির্জা মহম্মদ নীরব নিথর হয়ে ভাগ্যের পরিহাসের কথা ভাবছিল। এই মসনদ। এই মসনদের জন্যেই তাকে এতদিন এত লোক কুর্নিশ করেছে, আর আজ এই মসনদের জন্যেই এতগুলো মানুষের এই দুর্দশা। হায় আল্লাতালাহ্, তুমি আমাকে অনেক দিয়েছ, আবার অনেক দিয়েও অনেক কেড়ে নিয়েছ। তোমার দেওয়ারও যেমন কোনও মর্যাদা আমি দিইনি, তোমার কেড়ে নেওয়ার জন্যেও তোমাকে আজ আমি দোষ দেব না। আমাকে সুখ দাওনি বলে আমি অনেক অভিযোগ করেছি, আজ চরম দুর্দশা দিয়েছ বলে যদি অভিযোগ করি তা হলে কি তুমি শুনবে? একদিন তোমাকে আমি অস্বীকার করেছি, সে-অপরাধ আমার ক্ষমা করো। তারপর যখন কোরান পড়েছি তখন আমি সুখ না পাই শান্তি পেয়েছি। আমি মসনদ পেয়ে যা না পেয়েছি, কোরান পড়ে তাই পেয়েছিলাম। কিন্তু যদি শান্তিই দিলে তো মসনদ কেড়ে নিলে কেন? আর মসনদ যদি কেড়েই নিলে তো এমন করে মসনদের নীচে মাটির ধুলোয় নামিয়ে দিলে কেন? কোন পাপের প্রায়শ্চিত্তের এমন। বিধান যে মসনদ পেলেই তাকে অপমানের নরকে নেমে যেতে হবে? যদি সে আমার অপরাধ হয় তো আমি তার শাস্তি মাথা পেতেই নেব। কিন্তু যদি আমার মসনদের অপরাধ হয় তো আর কোন নবাব ইতিহাসে এমন করে প্রায়শ্চিত্ত করেছে?
