যেন নিজের কাছেও নিজের কীর্তিটা বিশ্বাস হচ্ছিল না ক্লাইভের। সত্যিই কি ক্লাইভ নিজের ফৌজ নিয়ে আজ মুর্শিদাবাদে হাজির হয়েছে? চারদিকের এই এত লোক কি সবাই তাকে দেখতেই এসেছে। তার জন্যেই এত শাঁখ বাজানো? এত উলু দেওয়া।
কিন্তু সবাই যদি একটা করেও ঢিল ছোড়ে তাদের দিকে। সঙ্গে তো মাত্র নিশো দিশি সেপাই, আর দু’শো ইংরেজ। মোটমাট পাঁচশো জন সোলজার তার দলে।
চেহেল্-সুতুনের সামনে আসতেই তার কানে ভেসে এল একটা বাজনা।
ওটা কী মুনশি?
আজ্ঞে হুজুর, আপনি এসেছেন বলে নহবত বাজছে নহবত-মঞ্জিলে! আপনাকে ওয়েলকাম করছে।
ইনসাফ মিঞা তখন নহবত-মঞ্জিলে জয়জয়ন্তী ধরেছে নিজের মনে। হুকুম পাঠিয়েছিল মিরজাফর সাহেব। বলে দিয়েছিল–ফিরিঙ্গি সাহেব আসবার সঙ্গে সঙ্গে যেন নহবত বাজে
ছোটে শাগরেদের ইচ্ছে ছিল না। বলেছিল–না ওস্তাদজি, মাত বাজাইয়ে, ও কৌন হ্যায়? মিরজাফরসাহেব হামারা কৌন হ্যায়? নবাব না নৌকর?
ইনসাফ মিঞার কথাটা ভাল লাগেনি। অনেক দিন ধরে দুনিয়াদারি দেখে আসছে ইনসাফ মিঞা। নবাবের নানা বড়েনবাবকেও দেখেছে ইনসাফ মিঞা। তারও আগে সরফরাজ খাঁ, আর তারও আগে নবাব সুজাউদ্দিন খাঁ-কেও দেখেছে। ইনসাফ মিঞা বুঝে নিয়েছে এরই নাম দুনিয়াদারি। এমনি করেই দুনিয়া চলে। এমনি করেই দুনিয়া চলবে। একজন ওঠে, আর একজন পড়ে। এ নিয়ে গোসা করতে নেই, এ নিয়ে মান-অভিমান করতে নেই। আজ যে নবাব কাল সে খিদমদগার।
ইনসাফ মিঞা বললে–দুর, যে মসনদে বসবে সেই নবাব। আমরা তো নৌকর, হুকুমের তামিলদার। নে, তবলা ধর
তারপর জয়জয়ন্তী রাগ ধরেছে ইনসাফ মিঞা অন্যবারের মতো। নবাব সিরাজউদ্দৌলা যেবার আজিমাবাদ থেকে শওকত জঙকে খুন করে শহরে ফিরে এসেছিল, সেবারও সে জয়জয়ন্তী বাজিয়েছিল। যখন আলিবর্দি খাঁ সাহেব সরফরাজ খা-কে খুন করে প্রথম মুর্শিদাবাদের মসনদে বসতে এসেছিল তখনও ইনসাফ মিঞা এইরকম করে জয়জয়ন্তী রাগ বাজিয়েছিল। ছোটে শাগরেদ ছেলেমানুষ, এখনও দুনিয়াদারি শেখেনি, দুনিয়াদারি জানে না। নে, তবলা ধর
ফিরিঙ্গি ফৌজ তখন আরও এগিয়ে গেছে। চকবাজারের সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকানের সামনে আসতেই হঠাৎ ক্লাইভের নজরে পড়ল।
মুনশি
হুজুর
ওই যে পোয়েট যাচ্ছে পোয়েট! পোয়েটকে একবার ডাকো তো!
পোয়েট?
মুনশি নবকৃষ্ণ বুঝতে পারলে না। বললে–কার কথা বলছেন হুজুর? পোয়েট? কবি? কবিয়াল?
হ্যাঁ, ওই যে একমাথা ঝাকড়া চুল, ওই তো পোয়েট।
উদ্ধব দাস ওই ভিড়ের মধ্যেই আপন মনে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে যাচ্ছিল। সাহেব ঠিক দেখতে পেয়েছে। কিন্তু তার কোনও দিকে খেয়াল নেই। একবার হাতিয়াগড়, একবার কেষ্টনগর, একবার মুর্শিদাবাদ। এমনি করেই তার দিন কাটে। এবার মোল্লাহাটি থেকে বেরোবার পথে হঠাৎ কী খেয়াল হল চলে এল মুর্শিদাবাদের দিকে। কিন্তু এখানে যে এমন কাণ্ড চলেছে তা কী করে জানবে।
হঠাৎ পেছনে কার হাতের ছোঁয়া লাগতেই পেছন ফিরেছে। কে?
তুমি কবি নাকি গো?
উদ্ধব দাস অবাক হয়ে গেল। বললে–তুমি কে প্রভু? তোমায় তো চিনতে পারছিনে?
সাহেব তোমায় ডাকছে।
কোন সাহেব?
মুনশি নবকৃষ্ণ তাজ্জব হয়ে গেল। সাহেবকে চেনে না লোকটা। এত লোক যাকে দেখবার জন্য রাস্তায় ভিড় করেছে, সেই ক্লাইভ সাহেবকেই চেনে না?
হঠাৎ ক্লাইভ সাহেবের দিকে নজর পড়তেই উদ্ধব দাস অবাক হয়ে গেল। আরে, ক্লাইভসাহেব এখানে কী করতে? সেই বাগবাজারের পেরিন সাহেবের বাগান ছেড়ে এখানে এসেছে তোমার সাহেব? তুমি সাহেবের কে প্রভু? মাথায় মস্ত বড় টিকি রেখেছ কেন?
আরে, আমি তো ক্লাইভসাহেবের মুনশি
আমিও তো হরির মুনশি, আমি তো টিকি রাখিনি।
মুনশি নবকৃষ্ণ উদ্ধব দাসের কথায় আরও অবাক হয়ে গেল। কিন্তু সেকথার উত্তর না দিয়ে বললে–চলো, সাহেব তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়, চলো
উদ্ধব দাস ভিড় ঠেলে এগিয়ে চলতে লাগল। নহবত-মঞ্জিলে তখন জয়জয়ন্তীর রাগ উদারা ছাড়িয়ে মুদারা অতিক্রম করে তারায় গিয়ে ঠেকেছে—
*
যে-মেয়ে একদিন অষ্টাদশ শতাব্দীর কাব্যের নায়িকা হবে, যাকে নিয়ে উদ্ধব দাস তার মহাকাব্য লিখবে, সে তখন নৌকোর ভেতর অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ময়দাপুরের ফিরিঙ্গি ছাউনি থেকে নৌকোয় উঠে খানিকক্ষণ বাইরের অন্ধকারের দিকে হা করে চেয়ে দেখেছিল। তারপর মাঝিরা যখন তাকে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে বলেছিল তখন ঘুমিয়েছে।
বুড়ো মাঝি নয়, জোয়ান মাঝি। বলেছিল–বেগমসাহেবা, আপনি শুয়ে পড়ুন, আমরা সময়মতো আমাকে ডেকে দেব
কোথায় কলকাতা। অথচ এককালে যখন হাতিয়াগড়ে থাকত তখন কলকাতার নাম শুনেছিল। তখন কলকাতা দেখবার আগ্রহ হয়েছিল। তারপরে এমন করে শুধু কলকাতা নয়, সমস্ত বাংলা মুলক দেখা হবে তা কল্পনাও করতে পারেনি তখন।
ঘুমোতে যাবার আগে মরালী মনে মনে হেসেছিল। এই মাঝিরা পর্যন্ত তাকে মরিয়ম বেগম বলে জানে। ক্লাইভ সাহেব হয়তো তাদের কাছে তার সেই পরিচয়ই দিয়েছে। তা দিক, এক-একটা করে নতুন নতুন পরিচয়েই চিনুক তাকে সবাই। কেউ জানুক সে রানিবিবি, কেউ জানুক সে নবাবের চর, কেউ জানুক সে মরালী, আবার কেউ জানুক সে মরিয়ম বেগম। বেঁচে থাকলে আরও কত নতুন নাম তার হবে, কে জানে।
হঠাৎ হাঁকাহাঁকিতে ঘুম ভেঙেছে মরালীর।
কে?
