উমিচাঁদ বললে–দেখবে সাহেব, কোটি কোটি টাকা তোমরা পাবে
কোটি টাকা পাই আর লাখ টাকাই পাই, তোমার যা শেয়ার তোমাকে তাই দেব।
আমার শেয়ার তো তিরিশ লাখ টাকা।
ক্লাইভের মুখ-চোখ দিয়ে আগুন বেরিয়ে আসছিল তখন! স্কাউড্রেলটা জানে না যে আমরা এখানে এসেছি পাউন্ড-শিলিং-পেন্স উপায় করতে, চ্যারিটি করতে আসিনি। আমরা দোকানদার, দরকার হলে ইনভেস্ট করব, দরকার হলে লোকসান দেব। যখন আবার দরকার পড়বে তখন প্রফিট করব। দরকার হলে আমরা শত্রুর সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ করব! এ কি ভেবেছে আমরা এই মশা আর জলাজমির দেশে এসেছি মরে যেতে? এই বদমাশদের হাতে প্রফিটের শেয়ার দিতে?
আচ্ছা, ঠিক আছে, তোমার সঙ্গে তো আমার কনট্র্যাক্ট হয়ে গেছে।
উমিচাঁদ বললে–না, তা তো আছে, তবু একবার তোমায় মনে করিয়ে দিচ্ছি সাহেব, শেষকালে যেন ভুলে যেয়ো না
যখন আর্মি মুর্শিদাবাদের দিকে যাচ্ছিল তখন উমিচাঁদের কথাগুলো মনে পড়ছিল ক্লাইভের। ময়দাপুরের ছাউনি তুলে দিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফৌজ চলেছে। দূর থেকে গাঁয়ের লোক রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে দেখছে। ভয়ে আনন্দে বিস্ময়ে তারা হতবাক হয়ে দেখছে ফিরিঙ্গিদের দিকে চেয়ে। তাদের যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। এরাই কি সেই ফিরিঙ্গি? এরাই কি সেই সাহেব, যারা সাত সাগর-তেরো নদী পেরিয়ে এই বাংলাদেশে ব্যাবসা করতে এসেছে? কী সব অদ্ভুত চেহারা এদের। লাল লাল মুখ। কাশিমবাজার কুঠিবাড়ির কাছে যারা থাকে তারা দেখেছে আগেই। মোমের মতন নরম আর আলতার মতো লাল চেহারা। মেমসাহেবদের দেখতে আরও ভাল। কটা কটা চোখ। চোখের মণি আর চোখের পাতা ভাসা-ভাসা। আগে সবাই ফিরিঙ্গিদের দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাত। যদি ধরে নিয়ে যায়? যদি ছুঁয়ে দেয়!
হাতির ওপর থেকে বসে বসে ক্লাইভ সব দেখছিল। পাশেই কিলপ্যাট্রিক চলছে। পেছনে পেছনে হাঁটতে হাঁটতে আসছে মুনশি নবকৃষ্ণ। কিন্তু সামনে চলেছে কয়েকটা কামান। লক্কাবাগের লড়াইতে কামান কটা ফেলে পালিয়েছিল নবাবের সেপাইরা।
কাশিমবাজার কুঠির কাছে আসতেই দেখা গেল ভাঙা বাড়িটা হাঁ হয়ে পড়ে আছে। ক্লাইভ সেইদিকে চেয়ে দেখলে। এই কাশিমবাজার কুঠি। এখান থেকেই নবাবের সঙ্গে যত কিছু ঝগড়া শুরু হয়েছিল।
হঠাৎ বড় গর্ব হল মনের ভেতর। এই সমস্ত লোক যারা দাঁড়িয়ে আছে, তারা সবাই তাকে দেখছে। ক্লাইভ আজ তাদের সকলের কাছে তাদের ভাগ্যবিধাতা।
কিন্তু মুর্শিদাবাদের কাছে আসতেই মনে হল যেন সামনে মানুষের সমুদ্র। উলু দিচ্ছে, শাঁখ বাজাচ্ছে সবাই।
মেজর কিলপ্যাট্রিকের দিকে চেয়ে দেখলে ক্লাইভ। কিলপ্যাট্রিকও চাইলে ক্লাইভের দিকে।
দেখা গেল দূর থেকে মিরজাফর আলি আসছে। পেছনে তার ছেলে মিরন। তার পেছনে আরও অনেক ঘোড়সওয়ার।
মুনশি!
মুনশি নবকৃষ্ণ সাহেবের ডাক শুনেই কাছে এল–হুজুর!
ওরা ওরকম করছে কেন মুনশি?
মুনশি কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু সামনে মিরজাফর সাহেব এসে পড়ায় যেন একটু স্বস্তি পেলে সাহেব মনে মনে। এই এরাই এদের নবাবকে তাড়িয়েছে। অথচ শেষপর্যন্ত ক্লাইভের সঙ্গে স্পষ্ট কথা বলেনি। কিন্তু মনে মনে ক্লাইভ নিজেকেই তারিফ করতে লাগল। মানুষ চিনতে ভুল করেনি ক্লাইভ। ইয়ার লুক্ত খা, দুর্লভরাম আর মিরজাফরের মধ্যে মিরজাফরকে চিনে নিতে ভুল করেনি। আমার চোখের সামনেই দাঁত বার করে হাসছে। এত বড় ট্রেটর, এত বড় নিমহকারাম। এত বড় স্কাউড্রেল কি ভেবেছে আমি তাকে বিশ্বাস করব? যে-লোক নিজের রিলেটিভদের সঙ্গে নিমকহারামি করেছে, সে যে আমার সঙ্গেও নিমকহারামি করবে তা কি বুঝতে পারি না মনে করেছে ও?
সেলাম আলেকুম কর্নেল!
গুড মর্নিং জেনারেল!
মুনশি দাঁড়িয়ে ছিল পাশে। এ-সুযোগ সে ছাড়লে । বললে–আলেকুম সেলাম মিরজাফরসাহেব
মিরজাফর চোখ ফিরিয়ে দেখলে নবকৃষ্ণের দিকে।
আমাকে চিনতে পারছেন না মিরবকশিসাহেব, আমি কর্নেল সাহেবের মুনশি। আপনার যত চিঠি সব তো আমিই তর্জমা করে বুঝিয়ে দিই সাহেবকে। কেমন আছেন?
ক্লাইভ জিজ্ঞেস করলে কী খবর মিরজাফর?
মিরজাফর বললে–সব ঠিক আছে কর্নেল।
নবাব কোথায়? তোমার প্রিজনার?
তাকে আনা হচ্ছে মুর্শিদাবাদে। সঙ্গে তার বেগম আছে, বাঁদিরা আছে, সবাই আসছে। রাজমহলের ফৌজদার মিরদাউদ আর আমার জামাই তাদের ধরে আনছে, আমিও এখান থেকে ফৌজ পাঠিয়েছি।
আর, দ্যাট জেনারেল মোহনলাল?
তাকেও গ্রেফতার করেছি। রায় দুর্লভের হাবেলিতে তাকে আটক করে রাখা হয়েছে। বেগমদেরও সবাইকে গ্রেফতার করে রেখেছি মতিঝিলে। আর কোনও ভয় নেই।
মেজর কিলপ্যাট্রিক বললে–আর মুর্শিদাবাদ সিটি? সিটিতে কোথাও গোলমাল নেই তো?
না মেজর। কোনও গোলমাল নেই। সবাই খুব খুশি। দেখছেন না চারদিকে কত লোকের ভিড়।
ওরা ওরকম শব্দ করছে কেন? হোয়াট ডু দে মিন?
আজ্ঞে, কাফেররা ওইরকম করে। ওদের যখন খুব আনন্দ হয় তখন ওইরকম শব্দ করে। উলু দেয়, শাঁখ বাজায়। আপনি এসেছেন তাই ওদের খুব আনন্দ হয়েছে
ক্লাইভ মুনশির দিকে চাইলে। মুনশি মাথা নাড়তে লাগল। বলতো হুজুর, মিরবকশিসাহেব ঠিক বলেছে। আমিও তোত কাফের, আমরাও ওইরকম করি
আর তারপর? তারপর যখন প্রথম মুর্শিদাবাদে ঢুকল সে এক দৃশ্য! ফিরিঙ্গিরা এসেছে, ফিরিঙ্গিরা এসেছে। চকবাজার থেকে মহিমাপুর পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে লোকে লোকারণ্য! ক্লাইভ চারদিকে চেয়ে দেখতে লাগল। লন্ডনের মতোই যেন মুর্শিদাবাদ শহরটা চারদিকে ছড়িয়ে আছে। লন্ডনের মতোই বড় বড় বাড়ি। বড় বড় রাস্তা। লন্ডনের মতোই শহরের কাছ দিয়ে নদী চলে গেছে একটা।
