নজর মহম্মদ বললে–মিরনসাহেব হুকুম দিয়েছে, সব বেগমসাহেবাদের গ্রেফতার করে মতিঝিলে নজরবন্দি রাখতে হবে। নানিবেগমসাহেবা, ঘসেটি বেগমসাহেবা, আমিনা বেগমসাহেবা, ময়মানা বেগমসাহেরা, সবাইকে নজরবন্দি করে রাখবে।
কেন
? নজর মহম্মদ বললে–মোহনলালজি মুর্শিদাবাদ ছেড়ে পালিয়েছে। ওদিকে নবাব ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদ হামলা করতে আসছে…
আর কোনও কথা নয়। বোরখা পরাই ছিল। সেই অবস্থাতেই মহল থেকে বেরিয়ে আসতে হল কান্তকে। অন্ধকারের মধ্যে পালকি দাঁড়িয়ে ছিল। একটা পালকি নয়। সার সার অনেকগুলো পালকি। দু’পাশে কোতোয়ালের লোক। কান্ত একটাতে উঠতেই দু’পাশের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। তারপর দুলতে দুলতে চলতে লাগল বাইরের দিকে। নানিবেগমসাহেবার পালকি, ঘসেটি বেগমসাহেবার পালকি, তক্কি বেগম, বব্বু বেগম, পেশমন বেগম, গুলসন বেগম, আর মরিয়ম বেগমের পালকি। পালকিগুলো চেহেল্-সুতুনের ফটক পেরিয়ে সোজা রাস্তায় গিয়ে পড়ল। তারপর সোজা চলতে লাগল মতিঝিলের দিকে।
*
উমিচাঁদ সাহেবকে দেখে ক্লাইভের মুখখানা লাল হয়ে উঠল। কিন্তু সেটা সামলে নিয়ে বললে–কী, তুমি?
আজ্ঞে, সাহেব, জবর খবর শুনেছ?
শুনেছি। নবাব আর্মি নিয়ে মুর্শিদাবাদ অ্যাটাক করতে আসছে
আর শুনছি নাকি মহারাজ মোহনলালও পালিয়ে গিয়েছিল, সেও নবাবের সঙ্গে আছে। ল’সাহেবের ফৌজ আছে সঙ্গে।
ক্লাইভ বললে–তা তুমি কি আমাকে সেজন্যে ভয় পাওয়াতে চাও?
উমিচাঁদ বললে–সেকী কথা সাহেব! ভয় পাবে তুমি? তুমি কি ভয় পাবার ছেলে? তা নয়, তুমি জিতলে তো আমারই লাভ সাহেব। আমার তিরিশ লাখ টাকা পাওনার কথা আমি ভুলে যেতে পারি কখনও?
আর কিছু কথা আছে? আমি এখনই আমি নিয়ে মুর্শিদাবাদে যাচ্ছি, আমার এখন সময় নেই
উমিচাঁদ বললে–তা তো যাওয়াই উচিত। কিন্তু এদিকে শুনলাম নাকি একটা মেয়েমানুষ চরকে তুমি ধরে রেখেছিলে, সে হঠাৎ পালিয়ে গেছে?
ক্লাইভ বললে–হ্যাঁ
সর্বনাশ! তা হলে তো মহা মুশকিল হল? কিছু কাগজপত্র চুরি করে নিয়ে গেছে নাকি আবার? তোমার যেমন মেয়েমানুষের ওপর লোভ?
ওদিকে তখন সোলজাররা মাঠে বেরিয়ে পড়েছে। তারা তৈরি। বিউগল বেজে উঠল। নবকৃষ্ণ মুনশি দাঁড়িয়ে ছিল পেছনে। সে বললে–আমার মাইনের কথাটা মনে করিয়ে দিননা উমিচাঁদসাহেব
ক্লাইভ সাহেব চলে যাচ্ছিল ভেতরে। তার তখন দাঁড়াবার সময় নেই।
উমিচাঁদ বললে–তা হলে আমিও তোমার সঙ্গে যাব নাকি সাহেব?
তুমি আর কী করতে যাবে?
বাঃ বাঃ, কী যে বলেন, যখন মালখানার টাকার হিসেব হবে তখন আমাকে থাকতে হবে না? টাকাকড়ি ভাগাভাগির সময় আমি না-থাকলে চলবে কেন?
তা চলো।
নবকৃষ্ণ এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। সে বললে–আমিও যাব হুজুর?
উমিচাঁদ সাহেব খেঁকিয়ে উঠল–তুমি আবার কী করতে যাবে শুনি? তোমার তোভারীছ’টা টাকা, আর আমার যে লাখ লাখ টাকার ব্যাপার
ক্লাইভ বললে–না, মুনশিও যাবে আমার সঙ্গে
কিন্তু আর কিছু কথা হবার আগেই একজন ঘোড়সওয়ার দৌড়োতে দৌড়োতে এসে হাজির। ঘোড়া থেকে নেমেই কর্নেলকে কুর্নিশ করলে। তারপর একটা চিঠি এগিয়ে দিলে ক্লাইভের দিকে। চিঠিটা ফার্সিতে লেখা। চিঠিখানা মুনশির দিকে বাড়িয়ে দিলে ক্লাইভ।
নবকৃষ্ণ চিঠিখানা নিয়ে পড়তে লাগল। চিঠি লিখেছে মিরজাফর সাহেব।
পড়তে পড়তে নবকৃষ্ণর মুখখানা হাসিতে ভরে গেল।
বললে–হুজুর, নবাব ধরা পড়েছে—
কোথায়? হোয়ার?
রাজমহলে। নবাবের সঙ্গে আরও তিন-চারজন জেনানা ছিল চেহেল্-সুতুনের, তাদেরও ধরেছে রাজমহলের ফৌজদারসাহেব। আর এদিকে ভগবানগোলার কাছে মহারাজ মোহনলালও পালাচ্ছিল, তাকেও বন্দি করে রাখা হয়েছে রায় দুর্লভজির বাড়িতে।
আর কী লিখেছে?
আর লিখেছে চেহেল্-সুতুনের যত বেগম আছে সকলকে ধরে পুরে রেখেছে মতিঝিলে।
সকলকে?
হ্যাঁ, হুজুর, সকলকে।
মরিয়ম বেগমকেও ধরেছে?
নবকৃষ্ণ বললো, হুজুর, সব, সবাইকে ধরে মতিঝিলে পুরে রেখেছে, আপনাকে উপহার দেবার জন্যে।
রবার্ট ক্লাইভ নিজের মনেই একবার নিজের দায়িত্বের কথাটা ভেবে নিলে। শুধু নিজের দায়িত্ব নয়, সকলের দায়িত্ব। আর্মির দায়িত্ব, কোম্পানির দায়িত্ব। একদিন নিজের মাইনে এক টাকা বাড়লেই নিজেকে ভাগ্যবান মনেকরত যে-লোক, প্রতিষ্ঠা আর প্রতিপত্তি বাবার সঙ্গে সঙ্গে সকলের সব দায়িত্ব তার মাথাতেই এসে পড়ল। এখন শুধু আর নিজের দায়িত্বটার কথা ভাবলেই চলে না। কোম্পানির প্রফিট আর লস এর কথাও ভাবতে হয়। সঙ্গে সঙ্গে ভাবতে হয় আর্মির এতগুলো লোকের সেফটির কথা। এমনকী ওই নবকৃষ্ণ মুনশির কথাও ভাবতে হয়। আর উমিচাঁদ?
উমিচাঁদের দিকে চেয়ে ঘৃণায় কুঁচকে এল চোখ দুটো।
অলরাইট, চলো মুর্শিদাবাদ!
আর বিশেষ করে যখন মিরজাফর আলি আছে। সব ব্যবস্থাই করে রেখেছে তারা, বলেছে–কোনও ভয় নেই, আপনি এখানে এলে সবাই আপনাকে শাঁখ বাজিয়ে ওয়েলকাম করবে। দেখবেন, নবাব ধরা পড়েছে শুনে সবাই কত খুশি হয়েছে। আর শুধু নবাব নয়, নবাবের গ্রেটেস্ট ফ্রেন্ড মহারাজ মোহনলালও ধরা পড়েছে।
মেজর কিলপ্যাট্রিকও সামনে এসেছিল। সেও সব শুনল।
উমিচাঁদ খবরটা পেয়েই লাফিয়ে উঠেছে। আমি বলেছিলুম সাহেব, আমি বলেছিলুম তোমাদের হেলপ করব। আমি কথা রেখেছি
কিলপ্যাট্রিক বললে–যদি আমরা নবাবের মালখানা খুলে টাকা পাই তখন সকলের সব শেয়ার আমরা দিয়ে দেব
