তবু কিছুতেই জমেনি মহফিল। মির্জা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে গেছে। নবাবের আবার অত বেগমের ওপর টান কেন? নবাব তো নবাব সুজাউদ্দিন খাঁ, নবাব তো নবাব সরফরাজ খা। ফুর্তি করতে জানত, মহফিল করতে জানত। সেসব দিনের কথা শুনেছে মেহেদি নেসার। নবাব সুজাউদ্দিন বুড়ো বয়েস। পর্যন্ত ফুর্তি করে গেছে নবাবের বাচ্চার মতো। হ্যাঁ, জানত কাকে বলে হররা। ইরান তুরান থেকে জেনানারা আসত সুজাউদ্দিনের ফররাবাগে হোলির দিন। নবাব মসনদ ফেলে রেখে হোলি খেলত সুন্দরীদের সঙ্গে। সঙ্গে থাকত বেগমরা। দুনিয়ার সেরা সব রূপসি। নবাবি দেখত দেওয়ানই আলা, দেওয়ান-খালসা-শরিফা আর নায়েব সুবাদাররা। যেদিন নবাবের জন্মদিন পড়ত, সেদিন তুলট হত। সেদিন ইয়ারবকশিরা ইনাম পেত, খেলাত পেত, বকশিশ পেত। আর সরফরাজ খা? সরফরাজ খা তো। গদি পেয়েই ফররাবাগে হররা উড়িয়ে দিয়েছিল। নিজের মেয়েমানুষের অসুখ হলে সরফরাজ রোজা রেখে মাথায় কোরান নিয়ে টাটা রোদের তলায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকত। আর তুই নবাব হয়েছিস কি লড়াই করবার জন্যে? লড়াই-ই যদি করবি তো বাংলার মসনদ নিয়ে কেন?
হঠাৎ পালকিটা দুলে উঠতেই মেহেদি নেসার চমকে উঠেছে কে?
পালকি-বেহারারা পালকি থামিয়ে বললে–খোদাবন্দ
আর দেখতে হল না। একেবারে চকবাজারের মধ্যিখানের রাস্তা। চার দিকে প্রজাদের ভিড়। একটা কসাইখানার পাশে মস্ত গর্ত। তারই ওপর পায়ে হোঁচট খেয়ে একজন বেহারা পড়ে গেছে। পা ভেঙে গেছে। বোধহয়। আর উঠতে পারছে না। পালকিটা আর-একটু দুললেই মেহেদি নেসারের পালকি উলটে যেত।
ক্যা হুয়্যা?
হুজুর খোদাবন্দ, পা ভেঙে গেছে ওর, উঠতে পারছে না–
উঠতে পারছে না মানে? তা হলে কি পালকি চলবে না? মেহেদি নেসার এই বাজারের ময়লা গলির মধ্যে আটকে পড়ে থাকবে? ওঠ উল্লকা-পাটঠা! ওঠ–চল জলদি
লোকটা হাত জোড় করে কাদো কাদো হয়ে ক্ষমা চাইল।
মেহেদি নেসার রেগে তখন টং। একে কাল রাতে মহফিল জমেনি, তার ওপর এই ছোটলোকের দিগদারি। চাবুকটা পালকি থেকে নিয়ে এসে পিঠের ওপর সপাং-সপাং করে বসিয়ে দিতে লাগল।
সপাং সপাং সপাং
হুজুর খোদাবন্দ
আর কোনও কথা নয়। মেহেদি নেসারের সঙ্গে দিল্লাগি। আবার সপাং সপাং সপাং।
আশেপাশে রাস্তার লোকের অনেক ভিড় জমেছিল। মেহেদি নেসার একজনের গর্দানটা খপ করে ধরে ফেললে। তারপর জোর করে পালকিতে জুতে দিয়ে বললে–চল, লে চল–
মানুষ নয় তো সব। শুয়োরের বাচ্চা। শুয়োরের বাচ্চার মতো রাস্তার ওপর পিলপিল করে পয়দা হচ্ছে সব। রেইস আদমিদের নড়বার জায়গা নেই, রাস্তায় চলবার পর্যন্ত উপায় নেই। রাস্তায় সবাই হাঁ করে মজা দেখতে বেরিয়েছে। নতুন লোকটা মামলার নথি নিয়ে কানুনগো কাছারিতে এসেছিল দরবার করতে। তিন দিন ধরে হেঁটে হেঁটে সদর কাছারিতে এসেছিল। হঠাৎ মামলা করা ঘুচে গেল, পালকি বয়ে নিয়ে যেতে হল।
নটবর!!
নটবর বেহারাদের সর্দার। মেহেদি নেসারের তলব পেয়েই পালকির দরজার মুখে এসে দাঁড়াল।
ও ছুকরিটা কে রে? জানিস?
কোন ছুকরিটা হুজুর?
ওই যে চৌকের পাশে একটা বাড়ির ঘুলঘুলি দিয়ে এদিকে চেয়ে দেখছিল? খোঁজ নিস তো কার মেয়ে! ওর বাপ কী করে?
এসব ইঙ্গিত বুঝতে পারে নটবর। বললে–হুজুর, বলেন তো কালকে মতিঝিলে হাজির করব?
পারবি?
বান্দা কী না পারে!
মির্জা মহম্মদ বড় মুষড়ে পড়েছে কদিন। আবার নয়া দাওয়াই দিতে হবে। নবাবজাদাদের এই মুশকিল। গদিতে বসবার পর থেকে কেবল ভাবছে কোথায় কী হচ্ছে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও স্বপ্ন দেখছে, কে বুঝি চাকু মারল কলিজায়। কোথায় মহম্মদাবাদ, বাংলা, ঘোড়াঘাট, সোনারগাঁতে কী ঘটছে, অমনি টনক নড়ে ওঠে। সেই জন্যেই তো মেহেদি নেসার ফুর্তির মধ্যে ডুবিয়ে রাখতে চায় মির্জাকে। এত ভাবলে মারা যাবি যে! সে কথা বুঝত নবাব সুজাউদ্দিন খাঁ, সরফরাজ খাঁ। নবাব আলিবর্দি খাঁ বোঝেনি, তাই জিন্দগি-ভর কেবল লড়াই করতে হয়েছে। লড়াই করতে করতেই জওয়ানি বরবাদ হয়ে গেছে।
বাজার পেরিয়েই গঙ্গা। পালকির দরজার ফাঁক দিয়ে গঙ্গা দেখা যায়। গঙ্গায় নৌকো চলেছে দাঁড় বেয়ে বেয়ে। হঠাৎ একটা নৌকোর দিকে চেয়েই কেমন চমকে উঠল মেহেদি নেসার সাহেব। চেনা চেনা যেন নৌকোটা। ছাড়ের নৌকো। ময়ূরপঙ্খীর গলুই। তার লাগোয়া ছইঢাকা ঘর। তার সামনেই একজন বসে আছে।
নটবর।
নটবর আবার সামনে এল। মেহেদি নেসার জিজ্ঞেস করল–ওটা কার বজরা যায় রে নটবর? হাতিয়াগড়ের জমিদার না?
আজ্ঞে হ্যাঁ হুজুর, আপনি ঠিক বলেছেন।
মেহেদি আবার ভাবতে লাগল। রাত্রে এসেছে, সকালবেলা চলে যাচ্ছে। সব ওই জগৎশেঠজির কাণ্ড! জগৎশেঠজির কাছে দরবার করতে এসেছিল। বাংলা মুলুকের যত জমিদার সব জগৎশেঠজির দলে। সবাই নিমকহারামি করতে চাইছে।
পালকিটা মতিঝিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। যথারীতি যারা ফটকে পাহারা দিচ্ছিল তারা হাত তুলে আদাব করল। পালকি আরও ভেতরে চলল। লম্বা ঝিল। ঝিলের শেষে শ্বেতপাথরে বাঁধানো চবুতর। মেহেরুন্নিসা বেগম বানিয়েছিল। জাহাঙ্গিরাবাদের টাকা দিয়ে জলের মতো খরচ করেছে মতিঝিল বানাতে, রাজবল্লভ পেছনে আছে। শালারা ভেবেছিল মির্জা ছেলেমানুষ, কিছু বোঝে না। সামনের সিংফটক দিয়ে ঢুকেই বড় দোতলা কুঠি। মাথার ওপর নহবতখানা। কাল অনেক রাত পর্যন্ত এখানেই মহফিল হয়েছিল মেহেদি নেসারদের। মেহেদি নেসার সিঁড়ি দিয়ে সোজা ওপরে উঠতে লাগল। বড় ঘরটার মাথায় আলোর ঝড় ঝুলছে। কালকের মহফিলের সব চিহ্নই সাফ করে ফেলেছে বান্দারা। মেহেদি নেসার সাহেব আবার তাকিয়া-ফরাসের ওপর কাত হয়ে পড়ল। হুজুতেই কাটল ক’টা দিন।
