মরালী মনে মনে হাসল। এই মাঝিরা পর্যন্ত তাকে মরিয়ম বেগম বলেই জানে! সাহেব হয়তো তাদের কাছে সেই পরিচয়ই দিয়েছে। তা দিক, এক-একটা করে নতুন নতুন পরিচয়েই তাকে চিনুক সবাই। কেউ জানুক সে মরিয়ম বেগম। বেঁচে থাকলে আরও কত নতুন নাম তার হবে, কে জানে!
*
মিরদাউদ রাজমহলের ফৌজদার। মিরজাফর আলির ভাইও বটে। তারই হুকুম তামিল করত মিরকাশিম সাহেব। ফৌজদারের ফৌজের কর্তা। মিরদাউদের দাদার জামাই। নিকট সম্পর্ক।
কিন্তু শুধু ফৌজদার হয়ে সুখ নেই। মিরজাফর সাহেব নবাবের বিষনজরে পড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে মিরজাফরের যারা রিস্তাদার তাদের ওপরেও নবাবের বিষনজর।
রাজমহলের ফৌজদারের হাবেলিতে বসে আফশোস করত মিরদাউদ। আর শুনত মিরকাশিম।
মিরদাউদ সাহেব বলত–খোদাতালার দুনিয়ায় আসলি চিজের কোনও কদর নেই ভাই
মিরকাশিম বলত–খাঁটি বাত বলেছেন জনাব
শ্বশুর-জামাইয়ের খেদ খোদাতালার কানে পৌঁছোত কি না কে জানে। দুনিয়ার মানুষের সব খেদ যদি খোদাতালার কানেই পৌঁছোবে তো খোদাতালা মিছিমিছিই খোদাতালা হয়েছে। হাজার মানুষের হাজার আর্জি, হাজার ফরিয়াদ। সব খেদ শুনতে গেলে কি খোদাতালাগিরি চলে?
কিন্তু দেখা গেছে দৈবাৎ এক-একটা আর্জি খোদাতালার কানে পৌঁছেও যায়।
যখন চারদিকে লোক ছুটেছে নবাবকে খোঁজবার জন্যে তখন মিরদাউদ সাহেবের কাছেও খবরটা গেছে। কিন্তু তখন কে জানবে কোন সড়ক দিয়ে নবাব পালিয়েছে? সড়ক তো আর একটা নয়। মুর্শিদাবাদ থেকে সোজা হাটাপথে ভগবানগোলার দিকে যাওয়া যায়। সেখান থেকে পদ্মা নদী ধরে। একেবারে জাহাঙ্গিরাবাদে। যদি পালিয়েই গিয়ে থাকে নবাব তো এদিকে আসবে কেন? এই রাজমহলের দিকে, যেখানকার ফৌজদার মিরজাফর সাহেবের ভাই, যেখানকার মিরবকশি মিরজাফর সাহেবের জামাই? অত দোয়া কি খোদাতালা করবে? তবু চেষ্টা করতে কসুর করলে চলবে না। চেষ্টা চলল খুব। কিন্তু নবাবের পাত্তা নেই।
শেষকালে একদিন দুপুরবেলা খবর এল। জোর খবর। মানুষটা ফকির। রাজমহলের ঘাটের কাছে একটা মসজিদ বানিয়ে থাকে।
বললে–আমার হুজুর সন্দেহ হচ্ছে লোকটা নবাব
মিরদাউদ খাঁ জিজ্ঞেস করলে-কীসে সন্দেহ হচ্ছে?
হুজুর, লোকটার পায়ে সোনার জরিদার চটি
জরিদার চটি তো খানদানি সওদাগররাও পরতে পারে।
হুজুর, দুধ কিনতে একটা মোহর দিলে মবলক
তাও রেইস আদমিরা দিতে পারে। সঙ্গে কে কে আছে?
ফকিরটা বললে–আজ্ঞে বিবি আছে, লেড়কি আছে, বহিন আছে, বাঁদি আছে দুজন, মাঝিমাল্লা আছে দুটো নৌকোয়। দুটো নৌকোই ঘাটে বাঁধা আছে লাগোয়া। সবাই খিচুড়ি বানিয়ে খাচ্ছে–আমি দেখে এসেছি ।
মিরকাশিম সাহেবও শুনছিল। বললে–চলুন না জনাব, দেখে আসি খোদাতালার মর্জি থাকলে মাল মিলতেও পারে
তা এই-ই হল সূত্রপাত। সামান্য সন্দেহ, সন্দেহ থেকে একেবারে গ্রেফতার। আর তারপর থেকেই হুলস্থুল কাণ্ড বেধে গেল মুর্শিদাবাদে। খবরটা যখন মনসুরগঞ্জ হাবেলিতে গিয়ে পৌঁছোল তখন সবাই চমকে গিয়েছে। এই খবর এল নবাব আসছে ল’সাহেবকে নিয়ে, আবার এই উলটো খবর এল।
কেমন উলটোপালটা সব খবর। চেহেল্-সুতুনে যখন খবর এল ফৌজ নিয়ে নবাব মুর্শিদাবাদের দিকে আসছে, তখন ধরপাকড়ের পালা শুরু হয়ে গেছে। সারা মুর্শিদাবাদে তখন শোরগোল চলেছে। নবাবের সেরা ভক্ত মোহনলাল। মোহনলাল লঙ্কাবাগ থেকে এসে নিজের বাড়িতেই ছিল। কোথাও বেরোচ্ছিল না, কারও সঙ্গে দেখা করছিল না। কথাটা তার কানেও গিয়েছিল যে নবাব আসছে।
সেখানেও মিরজাফরের লোক গিয়ে হাজির।
মহারাজ কোথায়?
বাড়ির লোক বেরিয়ে এসে বললে–মহারাজ বাড়িতে নেই—
আলবাত বাড়িতে আছে।
বলে সেপাইরা জোর করে বাড়িতে ঢুকে পড়ল। তন্ন তন্ন করে দেখলে সব ঘর, সব গলিখুঁজি। কিন্তু কোথাও পাওয়া গেল না মোহনলালকে। তা হলে মোহনলালও কি নবাবের মতো পালিয়েছে?
মিরজাফরের লোক তাকেও খুঁজতে বেরোল মুর্শিদাবাদের বাইরে। যাবে কোথায়? বাংলা মুলুক ছেড়ে যেখানে যাবে সেখানেই বিশ্বাসঘাতকরা ওত পেতে আছে। দুনিয়ায় বিশ্বাসঘাতকের কখনও অভাব হয়েছে, ইতিহাসে এমন নজির কোথাও পাওয়া যায়নি।
ততক্ষণে মিরনের লোক চেহেলসূতুনেও ঢুকে পড়েছে। পিরালি খাঁ’র ওপর হুকুম হয়ে গেল। নজর মহম্মদ,বরকত আলির ওপরেও হুকুম হয়ে গেল। সব বেগমসাহেবাদের নজরবন্দি করে রাখতে হবে।
মরিয়ম বেগমসাহেবা! মরিয়ম বেগমসাহেবা!
কান্তর তন্দ্রা এসেছিল একটু। কদিন থেকে নিজের মহল থেকে বেরোয়নি একবার। মেহেদি নেসার সাহেব সেই যে তাকে মতিঝিল থেকে এনে এখানে পুরে রেখেছে সেই থেকে নিজের ঘরের মধ্যে বসে বসেই দিন কাটিয়েছে, রাত কাটিয়েছে। বাইরে যাবার ক্ষমতাও নেই, অন্ধকার ঘরের ভেতরে বসে একমনে শুধু প্রার্থনা করেছে, যেন মরালী আরও দূরে চলে যেতে পারে। বারবার ভগবানকে ডেকেছে। বিশ্বভুবনের সমস্ত দেবতাকে উদ্দেশ করে তার অন্তরের আকুতি জানিয়ে বলেছে–মরালীকে তুমি দেখো ভগবান, সে যেন নিরাপদে থাকে, সে যেন এই পাপের ছোঁয়াচ থেকে অনেক দূরে থাকে, সে যেন সুখী হয়, সে যেন শান্তি পায়…
মরিয়ম বেগমসাহেবা, মরিয়ম বেগমসাহেবা!
ঝনঝন করে দরজায় শেকল খোলার শব্দ হল।
কান্ত বললে–কে?
আমি নজর মহম্মদ, বেগমসাহেবা। আমার সঙ্গে চলুন। মিরন সাহেবের হুকুম!
কোথায়?
