ঘরের কোণের দিকে ওষুধের শিশি ছিল একটা। তার পাশেই একটা পাত্র। মরালী এমন ওষুধ আগে কখনও দেখেনি। বিলিতি ওষুধ। ওষুধটা নিতে গিয়ে ভাবছিল, আশ্চর্য, এই ফিরিঙ্গি মানুষটারও ঘুম হয় না? বাইরে থেকে মনে হয় কত বড় নিষ্ঠুর লোক। নাম শুনেই ভয় পায় কত লোক। এমনি করে মুর্শিদাবাদের নবাবেরও বদনাম আছে কত। অথচ সেই নবাবকেও তো মরালী কতবার ঘুম পাড়িয়েছে।
বেশি ঢেলো না যেন, বিষ ওটা। বিষ?
বিষ?
কথাটা শুনেই চমকে উঠেছিল মরালী। বিষ খাওয়াবে নাকি সে সাহেবকে?
এক দাগ খেলে বিষ নয়, কিন্তু একটু বেশি খেলে সে-ঘুম আর ভাঙবে না। আমাদের ডাক্তার সাবধান করে দিয়েছে।
মরালী ওষুধের শিশিটা নামিয়ে রেখে দিলে। বললে–তা হলে থাক—
কী হল? ওষুধ দিলে না?
মরালী বললে–কিন্তু আমার হাতে তুমি খাবে এ-ওষুধ?
কেন? খাব না কেন?
যদি আমি বেশি দিয়ে ফেলি?
ক্লাইভ হো হো করে হেসে উঠল। বললে–ভাবছ তোমার হাতে বিষ খেতে ভয় হচ্ছে কিনা? না, সে ভয় নেই। তা হলে তোমাকে আমি ওষুধ দিতে বলতুম না ।
কিন্তু আমি তো তোমাকে বিষ খাওয়াতেও পারি! আমি নবাবের বেগম, নবাব তোমার শত্রু, আমাকে এত বিশ্বাস করা কি ভাল?
ক্লাইভ বললে–না, সে-ভয় আমার নেই–দাও, ওষুধটা ঢালো
না-হয় আর একবার ভাল করে ভেবে দেখো, তোমার চাকরটাকেই ডাকো।
না না, তাকে ডাকলে আগেই ডাকতুম, তোমাকে বলতুম না। আর তা ছাড়া আমি এতগুলো দেশ জয় করলুম, এর পরেও মানুষ চিনতে পারব না?
তখনও মরালী চুপকরে দাঁড়িয়ে ছিল, কী করবে বুঝতে পারছিল না। একদিন মুর্শিদাবাদের নবাবও তাকে এমনি করে বিশ্বাস করেছিল। আবার এই সাহেবটাও তাকে তেমনি করে বিশ্বাস করছে। তা হলে কি দুজনেই এক রকম। কোনও তফাত নেই এদের মধ্যে।
বললে–তোমার ঘুম হয় না কেন?
ক্লাইভ বললে–ঘুম হয় আমার, কিন্তু স্বপ্ন দেখি আমি
স্বপ্ন তো সবাই দেখে।
সেরকম স্বপ্ন নয়, আমার ঘরে কে যেন ঢোকে ঘুমের ঘোরে, ঢুকে আমাকে একটা তাস দেখায়, কুইন অব স্পেডস, ইস্কাবনের বিবি! তাসটা দেখিয়ে সাবধান করে দেয়-আজকেও সে এসেছিল–
কে সে? কে এসেছিল?
কী জানি। সে বলে তার নাম সাকসেস
মরালী সেই-ই প্রথম জেনেছিল সাহেবের রোগের কথা। এ এক অদ্ভুত রোগ। এত প্রভাব, এত প্রতিপত্তি, এত প্রতিষ্ঠা, এত ক্ষমতা নাকি ভাল নয়। দূর দেশ থেকে সাত টাকা মাইনের চাকরি করতে এসে একেবারে ফিরিঙ্গি কোম্পানির মাথায় উঠে বসা, এটা আবার নাকি একটা রোগ।
ক্লাইভ সাহেব সেই রাতে গড়গড় করে সব কথা বলে গিয়েছিল মরালীকে। লোকে জানে ক্লাইভ সেন্ট ফোর্ট ডেভিডের কম্যান্ডার, লোকে জানে ক্লাইভ চন্দননগরের কনকারার, কিন্তু আমি আসলে এখানে এসেছিলাম মরতে। আমি দু’বার মরতেই চেয়েছিলাম, কিন্তু দেখেছি মরাই সবচেয়ে শক্ত। আমার স্ত্রী আছে, ছেলে-মেয়ে আছে, বাবা আছে, মা আছে, তবু পৃথিবী আমার কাছে পর। আমার আপন বলতে কেউ নেই–
কথাগুলো শুনতে শুনতে সেদিন অবাক হয়ে গিয়েছিল মরালী। ময়দপুরের সেই ফিরিঙ্গি ছাউনিতে ক্লাইভ সাহেবের আর-এক রূপ দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল। কত রকম মানুষই যে আছে পৃথিবীতে, কত রকম মানুষই যে দেখলে মরালী। সেই হাতিয়াগড় থেকে শুরু করে চেহেতুন হয়ে এই ময়দাপুর পর্যন্ত সারি সারি যেন মানুষের মিছিল চলেছে। কেউ নবাব, কেউ আমির, কেউ মিরবকশি, কেউ খিদমদগার, কেউ বেগম, কেউ বাঁদি! তাদের বাইরেটাই শুধু আলাদা, ভেতরে সবাই যেন এক। সবাই একাকার হয়ে যেন অখণ্ড রূপ নিয়ে মরালীর জীবনে আবির্ভূত হয়েছিল।
সেরাত্রের মতো সেই-ই শেষ। খানিক পরে মরালী নিজের ঘরে ঘুমোত চলে এসেছিল। কিন্তু ঘুম কি অত সহজে আসে। আর আশ্চর্য, খানিক পরে সাহেবও তার ঘরে এসে তাকে ডেকেছিল। বলেছিল–তোমাকে কলকাতায় যেতে হবে।
তা সেই থেকেই বলতে গেলে মরালীর মেরী হওয়া শুরু। কেমন করে যেন ফিরিঙ্গি মানুষটার আসল পরিচয় পেয়েছিল সে সেইদিনই রাত্রে।
সাহেব বলেছিল-আমি এখানকার সকলকে বলব তুমি পালিয়ে গেছ
মরালী বলেছিল–আমি পালিয়ে গিয়েছি বললে–কি তোমার সুবিধে হবে?
হ্যাঁ, সুবিধে হবে। তোমাকে আমি আমার ক্যাম্পে রেখেছি এটা এখানকার কেউ পছন্দ করছে না। অথচ তোমার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে, তোমাকে দূরে পাঠাতেও ইচ্ছে করছে না
মরালী জিজ্ঞেস করেছিল–কী কথা?
সেকথা কলকাতাতে গিয়েই বলব।
তবু শুনি কী কথা?
জিজ্ঞেস করতে চাই, দু’জনের নাম এক হল কী করে? তা ছাড়া পোয়েটের সঙ্গে বিয়ে হবার পর তুমি কেমন করে চেহেসতুনে গেলে। আবার তোমার নাম যদি মরালীবালা দাসী হয় তো সেই মরালীবালা দাসী কে? আমি ইন্ডিয়াতে এসে পর্যন্ত তোমাদের দেখে কেবল অবাক হয়ে যাচ্ছি। এ এক বিচিত্র দেশ তোমাদের
তখন আর বেশি কথা বলার সময় ছিল না। একটু থেমে সাহেব বলেছিল–তারপর মুর্শিদাবাদ থেকে ফিরে তোমাকে তোমার বাবার কাছে আমি ফিরিয়ে দিয়ে আসব
.
অন্ধকার চারদিক। নদীর জল চিকচিক করছে। নৌকোর ভেতরে মরালী চুপ করে বসে ছিল। সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে সাহেব। কোনও অসুবিধে হবার কথা নয়। আসবার সময় সাহেব ঘাটে নেমে বলেছিল–চেহেসতুনের কথা আমার মনে আছে, তুমি কিছু ভেবো না ।
একজন মাঝি বললে–বেগমসাহেবা, আপনি শুয়ে পড়ুন, আমরা সময়মতো আনাকে ডেকে দেব–
