কিন্তু সে অনেক পরের কথা।
মরালীর শুধু একটা কথা মনে আছে, আসবার সময় ক্লাইভ সাহেব বলেছিল–চেহেল্-সুতুন থেকে তোমার মরিয়ম বেগমকে আমি উদ্ধার করব। তুমি কিছু ভেবো না।
তার পরেই নৌকোটা ছেড়ে দিয়েছিল।
*
মুর্শিদাবাদের সেদিনকার কথাও উদ্ধব দাস সবিস্তারে লিখে গেছে। সমস্ত শহরময় সবাই সেদিন খবর পেয়ে লাফিয়ে উঠেছিল–নবাব এসে গেছে–নবাব এসে গেছে
কিন্তু নবাবের সেই আসা যে এমন মর্মান্তিক আসা হবে, তাই-ই বা কে জানত? জেনেছিল শুধু রাজমহলের ফৌজদার মির দাউদ খাঁ।
ঘোড়সওয়ারের দল কাছে আসতেই নবাব চমকে উঠেছিল–ফৌজদার মিরদাউদ।
হ্যাঁ, আমি।
কিন্তু মিরদাউদের চোখের দৃষ্টি দেখে প্রথমে তেমন বুঝতে পারেনি। পেছনের একজনকে দেখে আরও চমকে উঠেছিল-মিরকাশেম আলি, তুমিও!
হ্যাঁ, আমি।
আশেপাশে সকলের দিকে চেয়ে তখন আর ভুল হবার কথা নয়। সুৎফা তখন বোরখার ভেতরে গয়নার বাক্সটা আঁকড়ে ধরে আছে। যে-লোকটা ফৌজদার সাহেবকে খবরটা দিয়েছিল সে তখন পেছনে আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল। সে জরিদার চটি দেখেছে, দুধ কেনবার জন্যে মোহর দেওয়া দেখেছে। এখন তার সন্দেহ ঠিক হওয়াতে তারই আনন্দটা বেশি। লোকটার একমুখ দাড়ির ভেতর থেকে দাঁতগুলো বেরিয়ে এল। হাসি আর ধরে না।
হঠাৎ সামনের দিকে নজর পড়তেই চেঁচিয়ে উঠল–ভাগ ভাগ হিয়াসে—
একটা কুকুর এই সুযোগে খিচুড়িটা চেটে চেটে খেতে লেগেছে
ভাগ ভাগ
মিরকাশেম সাহেবের নজর সব দিকে। লোকজন নিয়ে ততক্ষণ নবাবের দলের সবাইকে ঘেরাও করে ফেলেছে।
দুর্গা বললে–ওগো, আমরা কী দোষ করলুম–আমাদের ধরছ কেন?
ছোট বউরানিও তখন ভয়ে ভয়ে থরথর করে কাঁপছে
আর শুধু কি তাই, কেউই সেদিন জানতে পারলনা যে সেদিন সেই নির্জন রাজমহলের বালির চরের ওপর যেনবাবকে মিরকাশিম সাহেব গ্রেফতার করলে, সে শুধু তুচ্ছনবাবইনয়, তুচ্ছ হেবাৎ জঙ মির্জা মহম্মদ সিরাজ-উ-দ্দৌলা আলমগির বাহাদুরই নয়। সেনবাব বাংলাদেশ। সেদিনকার সেই বাংলাদেশের অনেক উত্থান-পতনের প্রতিভূ সেইনবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা। বাংলা মুলুকের ঘৃণার মানুষ সিরাজ-উ-দ্দৌলা, আবার বাংলা মুলুকের গৌরবের মানুষও সেই সিরাজ-উ-দ্দৌলা। মানুষের ভাল-মন্দ বিচার করবার সময় নেই ইতিহাসের। আজ যা ভাল কাল তা খারাপা আজকের ভাল-খারাপের সঙ্গে কালকের ভাল-খারাপের মেলে না। আজ তুমি দল বেঁধে রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করো, বিদ্রোহ করে সিংহাসন অধিকার করে, তখন তোমাকে আমরা ফুলের মালা গলায় দিয়ে তোমাকে দেবতা করে তোমার পূজা করব। মানুষের লেখা ইতিহাসের পাতায় তোমাকে প্রাতঃস্মরণীয় বীর বলে অভিহিত করব। কিন্তু যদি হেরে যাও? যদি তুমি ধরা পড়ো? তখন আবার তোমাকেই গ্রেফতার করে তোমার ফাঁসি দেব। তোমার মুখে থুতু দেব। তোমার মুখে চুনকালি মাখিয়ে তোমার নাম কেটে দেব ইতিহাস থেকে।
এ-সব জানত রবার্ট ক্লাইভ। রবার্ট ক্লাইভ জানত আসলে চাই সাকসেস। সাকসেস চাইলেই সব পাওয়া যায়। সাকসেসের সঙ্গে বন্ধু আসে, অর্থ আসে, প্রতিষ্ঠা আসে, খ্যাতি আসে। আমি হারব না। আমি হারলে আমার সব গুণ ধুয়ে মুছে নিঃশেষ হয়ে যাবে।
রাত্রেই টের পেয়েছিল মরালী। সেই রাত্রের অন্ধকারে যখন ঘুম আসছে না তার তখন হঠাৎ একটা শব্দ এসেছিল। কে? কীসের শব্দ পাশের ঘরে? ক্লাইভ সাহেব যেন পাশের ঘরে কথা বলছে! কিন্তু এত রাত্রে কার সঙ্গেই বা কথা বলছে?
আবার এসেছ? বি অফ, বেরিয়ে যাও!
চমকে উঠে বিছানায় খানিকক্ষণ চুপ করে বসে ছিল মরালী। ময়দাপুরের সেই ফিরিঙ্গি ফৌজের ছাউনির ভেতরে শুয়ে সেদিন প্রথম-প্রথম একটু ভয় পেয়েছিল। কিন্তু তখন তো মরালী জানত না যে রাত্রের অন্ধকারে স্বপ্ন দেখে সাহেব চেঁচিয়ে ওঠে? তখন তো জানত না, স্বপ্নে কে একজন সাহেবের ঘরের মধ্যে ঢোকে আর সাবধান করে দেয়।
সেদিন শুধু মনে হয়েছিল, সাহেবের বোধহয় কোনও রোগ আছে।
মনে আছে, মরালী খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল প্রথম। তারপর দরজা খুলে পাশের ঘরে গিয়ে দেখেছিল বিছানার ওপর ছটফট করছে সাহেব। আর মুখ দিয়ে কী যেন বিড়বিড় করে বলছে। প্রথমে মনে হয়েছিল অসুখ হয়েছে কিছু। কাছে গিয়ে ডেকেছিল–সাহেব, সাহেব
একটু ডাকতেই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল সাহেবের। তারপর সামনে মরালীকে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল।
তোমার কী হয়েছিল? তুমি চিৎকার করে উঠলে কেন?
সেদিন ক্লাইভ সাহেব লজ্জায় একটু জড়োসড়ো হয়ে পড়েছিল। তাড়াতাড়ি উঠে বসেছিল। সারা ম্যাড্রাস, সারা চন্দননগর, সারা বেঙ্গল কনকার করার পর তার দুর্বলতা ধরা পড়ে যাওয়ার লজ্জা! বলেছিল–ও কিছু না
বলে ক্লাইভ সাহেব বিছানার ওপর উঠে বসতে যাচ্ছিল।
মরালী বললে–না না, উঠতে হবে না, শুয়ে থাকো আমি যাচ্ছি
কিন্তু ঘর থেকে চলে যেতে গিয়েও চলে যেতে পারেনি৷ সাহেবের যদি সত্যি-সত্যিই অসুখ হয়ে থাকে তো তাকে একলা ছেড়ে চলে যাওয়াটা কি উচিত?
তোমার ওই চাকরটাকে ডেকে দিয়ে যাব?
ক্লাইভ বলেছিল–না, ও ঘুমোচ্ছে এখন, ঘুমোক–
কিন্তু তোমার কি শরীর খারাপ?
ক্লাইভ বলেছিল–না–তুমি যাও, আমার কিছু হয়নি।
হয়নি মানে? মুখ দেখে বুঝতে পারছি শরীরটা খারাপ তোমার! দেখি, জ্বর হয়েছে নাকি?
বলে ক্লাইভের কপালটা হাতের পাতা দিয়ে ছুঁলে।
ক্লাইভ বললে–না, জ্বর নেই, তুমি বরং ওই ওষুধটা দাও আমাকে, ঘুমের ওষুধ, ওর থেকে এক দাগ ঢেলে দাও
