আর তুমি?
আমি তো বলেছি, আমার কথা আলাদা।
কেন, তোমার কথা আলাদা কেন?
চেহেল্-সুতুনে না এসে আমার কোনও উপায় ছিল না। চেহেল্-সুতুন ছাড়া আমার কোনও গতিও ছিল না।
তা হলে কেন সেদিন তুমি আমার দফতর থেকে আমার চিঠি চুরি করেছিলে?
চুরি করেছিলাম, কারণ আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম। আমি দেখতে পেয়েছিলাম নবাবের অনেক শত্রু। ভেবে দেখেছিলাম নবাবের যদি ক্ষতি হয় তো চেহেল্-সুতুনেরও ক্ষতি হবে। আর চেহেলসূতুনের যদি ক্ষতি হয় তো আমি কোথায় থাকব? কিন্তু শেষপর্যন্ত আমি তা পারিনি, আমি চেহেলসুতুনকে বাঁচাতে পারিনি!
তা হলে এখন কোথায় যাবে বলে বেরিয়েছিলে?
হাতিয়াগড়ে!
হাতিয়াগড়? হাতিয়াগড়ে তোমার কে আছে?
মরালী বললে–আমার বাবা। জানি না এতদিন আমার বাবা বেঁচে আছে কিনা। কিন্তু বাবা ছাড়া আমার আর কেউ নেই পৃথিবীতে, যার কাছে গিয়ে দাঁড়াতে পারি আমি–
ক্লাইভ যেন কী ভাবলে। তারপর বললে–তুমি হিন্দু?
আগে হিন্দু ছিলাম, মুসলমান হয়েছি।
তোমার হিন্দু বাবা তোমাকে ঘরে নেবে?
নিলে নেবে, না নিলে আবার রাস্তায় বেরিয়ে পড়ব!
ক্লাইভ বললে–সত্যি কথা বলছ তো? তোমাকে বিশ্বাস করতেও ভয় হয়।
কিন্তু আজকেই তো আমার কথা যাচাই করে দেখলেন, এখনও বিশ্বাস হয়নি?
তা হলে তোমার বাবার নাম বলল, আমি লোক পাঠিয়ে খবর নিয়ে আসছি।
মরালী বললে–আমার বাবার নাম শোভারাম বিশ্বাস।
আর তোমার নাম?
মরালীবালা দাসী!
নামটা বলবার সঙ্গে সঙ্গে ক্লাইভ সাহেব লাফিয়ে উঠেছে।
মিথ্যে কথা! মরালীবালা দাসী কক্ষনও তোমার নাম নয়। মরালীবালা দাসীকে আমি চিনি। আমার পেরিন সাহেবের বাগানের ছাউনিতে তারা ছিল। আমার দিদি ছিল তার সঙ্গে। তারা খুব ভাল লোক। তাদেরও বাড়ি হাতিয়াগড়ে। তার বিয়ে হয়েছিল একজন পোয়েটের সঙ্গে। সে-পোয়েটটা খুব ভাল গান গায়। সে ওয়ার্লড সিটিজেনতুমি আমার সঙ্গে মিথ্যে কথা বলছ তুমি লায়ার, মিথ্যেবাদী।
মরালী বললে–না সাহেব, আমি মিথ্যেবাদী নই, তারাই মিথ্যেবাদী!
কী? তারা মিথ্যেবাদী? তারা নিজেরা আমাকে বলেছে আর তুমি বলছ তারা মিথ্যেবাদী?
হা সাহেব, আমিও তাদের চিনি। তারা প্রাণের দায়ে মিথ্যে কথা বলেছে।
তা হলে অ্যাডমিরাল ওয়াটসন যা বলে তাই-ই ঠিক? ইন্ডিয়ানরা সবাই মিথ্যেবাদী?
মরালীর মুখ দিয়ে হাসি বেরোল এবার। বললে–সাহেব, তুমি জানো না কিছু, আমি সব কথা খুলে বললে–তখন সব বুঝতে পারবে। আমরা কেউই মিথ্যে কথা বলিনি। কিন্তু মিথ্যে কথা না বললে–আমাদের সর্বনাশ হত, তাই প্রাণের দায়ে আমরা মিথ্যে কথা বলতে বাধ্য হয়েছি
কিন্তু সেই পোয়েট? তার সঙ্গে কার বিয়ে হয়েছিল? তোমার না তার?
আমার।
তোমার? তোমার বিয়ে হয়েছিল পোয়েটের সঙ্গে?
মরালী বললে–সাহেব, তুমি নতুন এ-দেশে এসেছ, তাই তুমি কিছু জানো না। আর কিছুদিন থাকলে সব জানতে পারবে। এ-দেশে মেয়েমানুষ হয়ে জন্মানো এক পাপ। সুন্দরী হয়ে জন্মানো আরও বড় পাপ।
সাহেব বললে–আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
তুমি কিছু বুঝতে পারবেও না। আমাদের দেশে মেয়ে হয়ে জন্মালে তুমি বুঝতে পারতে।
নিশ্চয় বুঝতে পারব। আমি এতগুলো কেল্লা জয় করলাম। ফ্রেঞ্চদের হারালাম,নবাবকে হারালাম, আর তোমার সামান্য কথা বুঝতে পারব না?
এই পর্যন্ত কথা হয়েছিল, তার পরেই বুঝি বাইরে কে ডেকেছিল সাহেবকে। সাহেব বাইরে চলে গিয়েছিল। তার সঙ্গে কথা বলে ফিরে এসেছিল যখন তখন অন্য চেহারা। এতক্ষণ যে-লোকটা তার সঙ্গে সহজভাবে কথা বলেছিল তখন যেন আর সে-মানুষ নয়। মরালীর মনে হয়েছিল বাইরে যেন ফৌজের লোকেরা সবাই দলে দলে জড়ো হয়েছে। তখুনি যেন তারা লড়াই করতে যাবে কোথাও।
সাহেব বলেছিল তোমাকে আমি এখন ছাড়ব না,নবাব আবার মুর্শিদাবাদে আসছে আমি নিয়ে, এখনই খবর পেলাম
তা হলে আমি কী করব?
সাহেব বলেছিল–এখানকার কাউকে জানতে দিতে চাই না যে, তুমি এখানে আছ। তোমাকে আমি এখান থেকে অনেক দূরে পাঠিয়ে দেব
কোথায়?
কলকাতা। দমদম-হাউসে। তোমার কোনও ভয় নেই। আমার লোকের সঙ্গে তুমি চলে যাও। আমি এখন মুর্শিদাবাদ অ্যাটাক করব। তারপর কলকাতায় ফিরে গিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করব। ততদিন তুমি সেখানে একলা থাকবে।
এখানে কেউ যদি আমার কথা জিজ্ঞেস করে আপনি কী বলবেন?
বলব তুমি নবাবের চর, আমার হেফাজত থেকে পালিয়ে গিয়েছ। তুমি তৈরি হয়ে থাকো। আমরা শেষরাত্রের দিকে রওনা দেব। তার আগেই তোমাকে আমি লোক দিয়ে এখান থেকে পাঠিয়ে দেব।
তারপর রাত যখন অনেক হয়েছিল ঠিক সেই সময়ে ক্লাইভ সাহেব মরালীকে ডেকে দিয়েছিল। সাহেবের সঙ্গে কেউ ছিল না। রাত তখন ক’প্রহর কেউ জানে না। ময়দপুরের আকাশে কয়েকটা তারা শুধু সাক্ষী ছিল সেই যাত্রার। একটা নৌকো হাজির ছিল সাহেবের ছাউনির নীচেই। আর দুজন মাঝি। ছাউনির অন্য সব লোক যখন অন্যদিকে লড়াইতে যাবার তোড়জোড় করছে তখন মরালী ঘোমটা ঢাকা দিয়ে গিয়ে উঠেছিল নৌকোর ভেতরে।
দমদমার যে বিরাট বাড়িটা ক্লাইভ সাহেব বানিয়েছিল, সেটা তখনও পুরো হয়নি। তার জায়গায় ছিল একটা ছোট বাড়ি। বেগম মেরী বিশ্বাসকে যারা জানত তারা দেখেছে সেই বাড়িটা। একদিন শেষরাত্রির দিকে সেখানেই মরালীকে নিয়ে এসে থেমেছিল একটা পালকি। কেউ টের পায়নি, কেউ জানতেও পারেনি কে সে, কোথা থেকে এসেছে, কেন এসেছে।
