কেঁদো না তুমি!
মির্জা মহম্মদ লুৎফার চোখের জল দেখে সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে গেল!
কিন্তু কেন তোমাকে কেউ দেখতে পারে না? হাতিয়াগড়ের ছোটরানিরও তুমি ক্ষতি করতে চেয়েছিলে? কেউ তোমার হয়ে একটা ভাল কথা বলে না কেন?
ও আমার নসিব লুৎফা। ও নিয়ে তুমি আর এখন দুঃখ কোরো না। তুমি যদি এমন করে এখন কাঁদো তো আমাদের সকলের বিপদ ডেকে আনবে। আমার বিপদ ডেকে আনবে, তোমার নিজের বিপদ ডেকে আনবে, তোমার মেয়ের বিপদ ডেকে আনবে–চুপ করো, চোখের জল মোছ
লুৎফা বলতে লাগল–দেখো, আমি এ নিয়ে তোমাকে কখনও কোনওদিন কিছু বলিনি, আজও বলতাম না, কিন্তু তোমার নিন্দে শুনলে আমার যে বড় কষ্ট হয়।
সেও তোমার নসিব।
ততক্ষণে শিরিনার রান্না হয়ে গেছে। খিচুড়ির হাড়িটা নিয়ে সে গাছতলায় এনে রাখলে। ধুধুকরছে বালি চারদিকে। একটা আবরু নেই, একটা আড়াল নেই। একটা খিদমদগার নেই, একটা পেয়াদাবরকন্দাজ কিছু নেই। মাথার ওপর কেউ পাখার বাতাস করতে এল না। পাশে কেউ খাবার জলের গাগরি নিয়ে হুকুমে হাজির রইল না। মোরগ-মশল্লামের গন্ধে বাতাস ভুরভুর করে উঠল না। শুধু চালে-ডালে মেশানো খিচুড়ি। তারই সামনে বসল নবাব। আর পাশে লুৎফা।
তুমিও সঙ্গে খেতে বসলে কেন?
তুমি আগে খাও, তারপর আমি খাব—
কিন্তু হঠাৎ দূর থেকে যেন একটা শব্দ কানে এল। অনেক দূর থেকে। মির্জা মহম্মদ চেয়ে দেখলে। লুৎফাও চেয়ে দেখলে অনেক দূরে যেন ধুলো উড়ছে। ঘোড়া ছুটিয়ে কারা যেন আসছে।
তখনও খিচুড়িতে হাত দেওয়া হয়নি।
কারা আসছে এদিকে? ফৌজের নোক নাকি?
লুৎফা মুখখানা বোরখায় ঢেকে ফেললে। মির্জা মহম্মদ খানিকক্ষণ চেয়ে রইল সেই দিকে। তবে কি জেনারেল ল’সাহেব আসছে? টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল আজিমাবাদের খাজাঞ্চিখানা থেকে। এতদিনে বোধহয় টাকা পৌঁছেছে সাহেবের হাতে। তাই ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে যাচ্ছে। তুমি তো খুব লোক হে, এত দেরি করে আসতে হয়? আমি তো তোমাদের ভরসাতেই ঢাকার জাহাঙ্গিরাবাদে না গিয়ে আজিমাবাদের দিকে যাচ্ছি। আমি জানি তোমরা এই পথ দিয়েই আসবে! তা এত দেরি করে এলে কেন? তোমরা তো জানো ইংরেজদের। তোমাদের চিরকালের শত্রু। তোমরাই আমাকে কথা দিয়েছিলে তোমরা ইংরেজদের সঙ্গে লড়বে! তা এখন এত দেরি করে আসতে হয়?
কী হল, উঠলে যে?
মির্জা মহম্মদ বললে–জেনারেল ল’ আসছে, এখন কি আমার খাবার সময় আছে লুৎফা! এখন একেবারে মুর্শিদাবাদে গিয়ে খাব। আর একদিন না খেলে কীই বা ক্ষতি!
ঘোড়ার খুরের আওয়াজে তখন দুর্গা, ছোট বউরানি তারাও ভয় পেয়ে গেছে। আবার কাদের ফৌজ আসছে এখানে। নৌকোর মাঝিমাল্লা তারাও তখন খেতে বসেছিল। ফৌজের আসার শব্দ শুনে তারাও সেই দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইল।
*
ময়দাপুরে একটা রাত কেটেছিল মরালীর। ছাউনির সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়েছে তখনও মরালী জেগে জেগে ভাবছিল। বাইরে নিঝুম রাত। হাতিয়াগড়ে এমনি নিঝুম রাতে সেই ছোটমশাইয়ের রাজবাড়িতেও মরালী এমনি করে জেগে কাটিয়েছিল। সেই সিঁড়ির তলার ঘরখানাতে বসে বসে অন্ধকারে কত রাত আকাশ-পাতাল করেছে। মাঝরাত্রে শুধু এক-একবার দুর্গা এসে দরজা খুলে খবর। নিত লুকিয়ে লুকিয়ে।
তারপর কত দিন কেটে গেল, আরও কত বিচিত্র মানুষদের মধ্যে জীবন কাটাতে হল। কত বিভিন্ন সমাজ, কত বিচিত্র পরিবেশ। কোথায় হাতিয়াগড়, সেখান থেকে রানিবিবি সেজে চেহেল্-সুতুন, চেহ্নে-সুতুন থেকে পেরিন সাহেবের বাগান, সেখান থেকে হালসিবাগান, তারপর সেখান থেকে মতিঝিল। তারপর মতিঝিল থেকে এই ময়দাপুরের ফিরিঙ্গিদের ছাউনি।
সন্ধেবেলা ক্লাইভ সাহেব হঠাৎ ঘরে এসেছিল।
কিছু খবর পেলেন?
ক্লাইভ সাহেব বলেছিল–হ্যাঁ, তোমার কথাই ঠিক, চেহেল্-সুতুনেও আর একজন মরিয়ম বেগমসাহেবা আছে।
তা আপনি কি ভেবেছিলেন আমি মিথ্যে কথা বলেছিলাম?
কিন্তু দু’জন মরিয়ম বেগমসাহেবা কী করে হল? সে-ই বা কে, আর তুমিই বা কে?
মরালী বলেছিল–আমিই আসল মরিয়ম বেগম
আর সে?
সে আমার চেনা লোক।
চেনা লোক মানে?
সে আমার নিজের কেউ নয়। কিন্তু আমার নিজের লোকের চেয়েও আপন।
স্পষ্ট করে বলো! তোমাদের দুজনের নাম এক হল কী করে?
তার নাম মরিয়ম বেগম নয়, আমার নামও আসল মরিয়ম বেগম নয়।
তুমি দেখছি এখনও আমার সঙ্গে চালাকি করতে শুরু করেছ। বলল, তুমি কে? তোমার আসল নাম কী?
আমার আসল নাম বলতে গেলে অনেক কথা বলতে হবে সাহেব। অত কথা শোনবার সময় হবেনা আপনার। আমি কেন যে নবাবের চেহেলসূতুনে এসেছি, কেন আবার সেখান থেকে পালিয়েছি, কেন আমার বদলে আর একজন মরিয়ম বেগম সেজে চেহেল্-সুতুনে রয়ে গেল, সব বলতে গেলে রাত কাবার হয়ে যাবে। আপনারও সে শুনতে হয়তো ভাল লাগবে না। তাই, আপনি শুধু আমার একটা উদ্ধার করুন, মুর্শিদাবাদে গেলে মরিয়ম বেগমসাহেবাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে আনবেন–
সাহেব বলেছিল। কিন্তু আমি যে মুর্শিদাবাদে যাব তা তোমায় কে বললে?
আপনি মুর্শিদাবাদে যদি না যাবেন তো এত কাণ্ড করতে গেলেন কেন?
তুমি তা হলে টের পেয়েছ যে নবাব পালিয়েছে?
শেষপর্যন্ত নবাব যে পালাবেন তা আমি জানতুম। নবাবের ভাল কেউ চাইত না। নবাবকে কেউ ভালবাসত না। নবাবের নিজের মা-মাসি তারাও নবাবের সর্বনাশ চাইত।
